রবিবার, ২ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ রাত
MENU
#
তৈরি পোশাকে বাংলাদেশকে টেক্কা দিতে দুই মুক্তবাণিজ্য চুক্তিতে নজর ভারতের
daily-fulki

তৈরি পোশাকে বাংলাদেশকে টেক্কা দিতে দুই মুক্তবাণিজ্য চুক্তিতে নজর ভারতের


ফুলকি ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক হ্রাস এবং ভারত-যুক্তরাজ্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) রপ্তানিকারকদের জন্য শক্তিশালী পূর্বাভাস দিয়েছে। আর এ কারণে ভারতের পোশাক খাত আগামী ২৭-অর্থবছরের প্রথমার্ধে এক শক্তিশালী সূচনার অপেক্ষা করছে। পাশাপাশি প্রস্তাবিত ভারত-ইইউ এফটিএ-ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির পথ সুগম করছে। কিন্তু এসব পদক্ষেপ কি ভারতীয় পোশাক রপ্তানিকারকদের বিশ্ববাজারে শেয়ার বাড়াতে সাহায্য করতে পারবে?

ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান মতিলাল ওসওয়ালের তথ্যানুসারে, যুক্তরাষ্ট্রে শুল্ক টানা চার মাস ধরে ৫০ শতাংশের চড়া হার থেকে কমে ১০ শতাংশে নামায় বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের শুল্ক ব্যবধান অনেকটাই কমে এসেছে।

তারা জানিয়েছে, প্রতিযোগিতা তবুও তীব্রই থাকবে। বিশেষ করে, বাংলাদেশের সঙ্গে। কম মজুরির কারণে বাংলাদেশে উৎপাদন খরচে বেশ কিছু কাঠামোগত সুবিধা রয়েছে, যার ওপর ভিত্তি করে বছরের পর বছর বৈশ্বিক পোশাক রপ্তানিতে তারা নিজেদের এক শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছে।


মার্কিন শুল্কনীতির স্পষ্টতায় স্বস্তি
মার্কিন পোশাক বাজারে চাহিদা এখনো যথেষ্ট চাঙ্গা এবং তা নতুন রপ্তানি আদেশ পেতে সাহায্য করবে বলে আশা করা হচ্ছে। মতিলাল ওসওয়াল উল্লেখ করেছে, ‘মার্কিন শুল্ক কাঠামোর এই স্পষ্টতা পোশাক খাতের ব্যবসায়ীদের মনে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক ও আনুষঙ্গিক দোকানের বিক্রি জুনে আগের মাসের তুলনায় দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেড়েছে, যা শক্তিশালী গতি নির্দেশ করে।’


খুচরা বিক্রির মধ্যে ক্রীড়াসামগ্রী ও ইলেকট্রনিকসের পাশাপাশি পোশাক খাত অন্যতম সেরা পারফর্ম করেছে। এই খাতগুলো একত্রে বার্ষিক ১৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে চড়া মার্কিন শুল্কের কারণে ভারতের পোশাক রপ্তানি মারাত্মক ধাক্কা খেয়েছিল এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতারা ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়েছিল। এত সব প্রতিকূলতার মধ্যেও গ্রাহকদের দিক থেকে এই শক্তিশালী চাহিদা বজায় রয়েছে।

ভারত-যুক্তরাজ্য এফটিএ থেকে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সুযোগ
ভারতের পোশাক খাতের প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করার মতো আরেকটি বড় অনুঘটক হলো গত ১৫ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া ভারত-যুক্তরাজ্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ)। মতিলাল ওসওয়ালের বিশ্বাস, এটি টেক্সটাইল শিল্পের জন্য এক দীর্ঘমেয়াদি ও কাঠামোগত চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, ‘স্বল্পমেয়াদে এর প্রভাব কিছুটা ধীরে দেখা গেলেও আগামী কয়েক বছরে যুক্তরাজ্যের বাজারে ভারতের শেয়ার ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে দুই অঙ্কের ঘরে নিয়ে যাওয়ার এক চমৎকার সুযোগ এনে দিয়েছে এই চুক্তি।’ এই চুক্তির ফলে ভারতীয় পোশাকের ওপর যুক্তরাজ্যের ৮ থেকে ১২ শতাংশ আমদানি শুল্ক উঠে গেল। এতে বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান ও তুরস্কের বিপরীতে ভারতের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা অনেকখানি বাড়বে।

ভারত-ইইউ এফটিএ উন্মোচন করতে পারে আরেক বড় বাজার
অনুমোদনের পর ২০২৭ সালে কার্যকর হতে যাওয়া ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিও ভারতের জন্য প্রবৃদ্ধির আরেকটি বিরাট দুয়ার খুলে দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। চুক্তিটি কার্যকর হলে ইউরোপে ভারতীয় পোশাক রপ্তানির ওপর থাকা বর্তমান ১০ থেকে ১২ শতাংশ আমদানি শুল্ক উঠে যাবে। ফলে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান ও তুরস্কের সমকক্ষ হয়ে উঠবে ভারত।

মতিলাল ওসওয়াল জানিয়েছে, ইউরোপের ব্র্যান্ডগুলো এখন চীন ও বাংলাদেশ থেকে তাদের কেনাকাটার নির্ভরতা কমিয়ে বৈচিত্র্য আনতে চাইছে, যা ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্য এক নতুন সম্ভাবনার জন্ম দিচ্ছে। তারা বলছে, ‘ইইউ বর্তমানে প্রধানত চীন ও বাংলাদেশ থেকেই পোশাক সংগ্রহ করে, আর ভারত থেকে কেনে খুবই সামান্য—যা মূলত কয়েক দশকের শুল্ক-সংক্রান্ত স্থবিরতারই ফল। ইউরোপীয় ব্র্যান্ডগুলো যখন চীন ও বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে চাইছে, তখন এই এফটিএ বাড়তি রপ্তানির বড় সুযোগ এনে দিচ্ছে। তবে আমেরিকার মতো একক কাঠামোর বাজারের তুলনায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিছুটা খণ্ড-বিখণ্ড হওয়ায় এই বৃদ্ধির গতি হবে ধীর ও ধারাবাহিক।’

সমন্বিত সরবরাহ ব্যবস্থার সুবিধা পাচ্ছে ভারত
মতিলাল ওসওয়ালের মতে, ভারতের সবচেয়ে বড় শক্তিমত্তা হলো তার নিজস্ব ও সুসংগঠিত টেক্সটাইল ইকোসিস্টেম বা পরিবেশ। ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তুলা উৎপাদনকারী দেশ এবং সুতা কাটার (স্পিনিং) সক্ষমতায়ও বিশ্বমঞ্চে তাদের অবস্থান দ্বিতীয়। ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজে বাংলাদেশের সামর্থ্য বেশ সীমিত; তবে তার বিপরীতে ভারতের রয়েছে এক সম্পূর্ণ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ সরবরাহ ব্যবস্থা—তুলা উৎপাদন থেকে শুরু করে সুতা কাটা, কাপড়ের বয়ন ও পোশাক তৈরি পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি তারা নিজেরাই করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রচুর মূলধনের প্রয়োজন এবং সে তুলনায় মুনাফা কম হওয়ায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তান ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজে (এটি হলো এমন একটি ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান তার উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল বা উপকরণ সংগ্রহ করতে নিজস্ব দেশের বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে) বিপুল বিনিয়োগে বরাবরই অনাগ্রহী থেকেছে। অন্যদিকে চীন তাদের স্পিনিং সক্ষমতা কমিয়ে কৃত্রিম তন্তুর দিকে ঝুঁকছে এবং ভিয়েতনামও ক্রমেই ইলেকট্রনিকস ও সেবা খাতের দিকে তাদের মনোযোগ সরিয়ে নিচ্ছে।

ফলে একমাত্র ভারতই এখন বিশ্বমঞ্চে এমন এক প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা মানসম্মত কমপ্লায়েন্স বজায় রেখে টানা স্পিনিং সক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে। এটি আন্তর্জাতিক খুচরা বিক্রেতাদের কাছে ভারতকে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও আকর্ষণীয় উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত করছে।

বাংলাদেশের কি এখনো ভারতের চেয়ে বাড়তি সুবিধায় আছে
তবে শুল্ক ছাড় পাওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ তার উৎপাদন খরচ কম হওয়ার দরুন কাঠামোগতভাবে এখনও ভারতের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে শ্রমিকদের মজুরি ভারতের তুলনায় প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ কম, অথচ পোশাক তৈরিতে মোট খরচের প্রায় ৩০ শতাংশই যায় মজুরি বাবদ। এটি বিশ্ববাজারে, বিশেষ করে নিটওয়্যার খাতে, বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের দামে বেশ খানিকটা বাড়তি সুবিধা বা ছাড় দেওয়ার সুযোগ করে দেয়।

ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানটির মতে, ভারতে শুল্ক সুবিধা মিললেও কম উৎপাদন খরচের দরুন প্রতিযোগিতা বেশ কঠিনই থেকে যাবে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বৈশ্বিক ক্রেতারা এখন তাদের সরবরাহকারীর সংখ্যা কমিয়ে আনছে এবং বড় পরিসরে কাজ করতে সক্ষম এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকেই বড় মাপের অর্ডার দিচ্ছে। এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আধিপত্য সুস্পষ্ট। বাংলাদেশের শীর্ষ ১০টি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেকটির বার্ষিক আয় ৩৫ কোটি ডলারের বেশি এবং অন্তত ১৫টি প্রতিষ্ঠানের আয় ২৩ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

তুলনামূলকভাবে ভারতের পরিধি ছোট; সে দেশে মাত্র ৫টি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ৩৫ কোটি ডলার আয়ের মাইলফলক পার হতে পেরেছে। মতিলাল ওসওয়ালের অভিমত, বাজারে এই ঝোঁকের কারণে গোকালদাস এক্সপোর্টস, অরবিন্দ এবং পার্ল গ্লোবালের মতো ভারতের বড় তালিকাভুক্ত রপ্তানিকারকরাই বেশি সুবিধা পাবে, কারণ বড় অর্ডারের জোগান দেওয়ার মতো সক্ষমতা মূলত তাদেরই রয়েছে।

ভারত-যুক্তরাজ্য এফটিএ, মার্কিন বাজারে চাহিদার পুনরুত্থান এবং পরবর্তীতে ভারত-ইইউ চুক্তির কল্যাণে ২০২৬ থেকে ২০২৮ অর্থ বছরের মধ্যে ভারতের বেশিরভাগ টেক্সটাইল রপ্তানিকারকের রাজস্ব বার্ষিক প্রায় ১৫ শতাংশের কাছাকাছি হারে বাড়বে বলে ধারণা করছে মতিলাল ওসওয়াল।

ভারতের সমন্বিত সরবরাহ ব্যবস্থা, ক্রমবর্ধমান স্পিনিং সক্ষমতা ও নতুন বাণিজ্য চুক্তির সুযোগ মধ্য থেকে দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ববাজারে দেশের অবস্থান শক্ত করবে ঠিকই, তবে বাংলাদেশের কম উৎপাদন খরচ এবং বড় আকারের রপ্তানি সক্ষমতা ভারতের সামনে কঠিন লড়াই বজায় রাখবে। ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানটি আরও সতর্ক করে দিয়ে জানিয়েছে, ভারতে এখনো পর্যন্ত উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর বড় কোনো দৃশ্যমান ঘোষণা আসেনি। বাংলাদেশের সঙ্গে পরিধির এই ব্যবধান কমাতে হলে ভারতের বিপুল নতুন বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে।
 

সর্বাধিক পঠিত