বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ রাত
MENU
#
চাকরিদাতা ও প্রত্যাশীদের যুক্ত করতে আসছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম
daily-fulki

চাকরিদাতা ও প্রত্যাশীদের যুক্ত করতে আসছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম


দেশে ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের প্রেক্ষাপটে চাকরিদাতা ও চাকরিপ্রত্যাশীদের একই প্ল্যাটফর্মে আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ সেন্টার’ স্থাপনের পাশাপাশি এই কেন্দ্রীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

এর মাধ্যমে চাকরিপ্রত্যাশীরা অনলাইনে নিবন্ধন করতে পারবেন। অন্যদিকে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের শূন্যপদের তথ্য আপলোড করবে। পরে দক্ষতা, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে উভয় পক্ষের মধ্যে সংযোগ তৈরি করা হবে। প্রয়োজনে দক্ষতার ঘাটতি থাকা চাকরিপ্রত্যাশীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হবে। ক্ষমতাসীন বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী এ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

 

প্রস্তাব আছে টেকনিক্যাল কমিটি পর্যায়ে

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য কর্মসংস্থান অধিদপ্তর গঠনের প্রস্তাব বর্তমানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের টেকনিক্যাল কমিটি বা ‘প্রাক-নিকার’ পর্যায়ে রয়েছে। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী প্রস্তাবটি সংশোধন করে পুনরায় পাঠানো হবে। এরপর অনুমোদনের জন্য তা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে যাবে।

মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন আগে থেকেই কর্মসংস্থান অধিদপ্তর গঠনের প্রক্রিয়া চলে আসছিল। বিভিন্ন প্রক্রিয়া এবং আলাপ-আলোচনার পর অধিদপ্তরের একটি কাঠামো তৈরি করা হয়। প্রাথমিক প্রস্তাবে জনবল ছিল দুই হাজারেরও বেশি। এ জনবলসহ অধিদপ্তর গঠনের প্রস্তাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে গেলে সেখান থেকে তা অনুমোদন না দিয়ে এটি আরও পর্যালোচনা করার নির্দেশনা দেয়। মূলত প্রাক-নিকার কমিটি জনবলের সংখ্যা আরও কমিয়ে প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য বলে।

 

প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি বা নিকার নতুন কোনো দপ্তর বা অধিদপ্তর গঠনের প্রস্তাব অনুমোদন দিয়ে থাকে। কর্মসংস্থান অধিদপ্তরের ক্ষেত্রে প্রাক-নিকার নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা নির্ধারণ করে দেয়নি। তবে যতটা সম্ভব জনবল কমিয়ে বাস্তবসম্মত কাঠামো তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়।

এখন বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কর্মসংস্থান অধিদপ্তরের কাঠামো সাজানোর পরিকল্পনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

 

তারা বলছেন, কর্মসংস্থান অধিদপ্তর এবং এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ সেন্টার মূলত একই উদ্যোগ। শুধু নামকরণ এবং কাজের ধরনে কিছু সমন্বয় আনা হচ্ছে। আগের উদ্যোগে কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিল। কিন্তু এখন মূল লক্ষ্য হচ্ছে একটি এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ গড়ে তোলা, যেখানে চাকরিদাতা ও চাকরিপ্রত্যাশীদের একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা যাবে।

 

চলছে পর্যালোচনা ও পরিমার্জন

শ্রম মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, সরকার নতুন হওয়ায় কর্মসংস্থান অধিদপ্তর গঠনের বিষয়টি আরও পর্যালোচনা করছে। একাধিক বৈঠকে প্রস্তাবটি পরিমার্জন করা হচ্ছে। ফলে চূড়ান্ত কাঠামো, নাম কিংবা কার্যপরিধি সম্পর্কে এখনই নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, কর্মসংস্থান অধিদপ্তর গঠনের লক্ষ্যে গত ২৮ জুন দেশের বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের নিয়ে তৃতীয় পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় পাওয়া মতামত ও সুপারিশের ভিত্তিতে প্রস্তাবটি সংশোধনের কাজ চলছে। একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ সেন্টার প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও প্রস্তাবে রাখা হয়েছে। সব প্রক্রিয়া শেষ হলে প্রস্তাবটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হবে।

 

বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দল ভোটের আগে যে নির্বাচনি ইশতেহার দেয় তাতে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ঘোষণা রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, বেকার ও চাকরিপ্রত্যাশীদের জন্য স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য কর্মসংস্থান প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা হবে। চাকরিপ্রত্যাশীরা সেখানে নিবন্ধন করবেন এবং তাদের দক্ষতা ও যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শূন্যপদে নিয়োগের জন্য সহায়তা দেওয়া হবে।

যাদের দক্ষতার ঘাটতি থাকবে, তাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থাও করা হবে। একই সঙ্গে চাকরিপ্রার্থীদের ডোপ টেস্ট চালুর কথাও ইশতেহারে উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া শিক্ষিত তরুণদের জন্য নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বেকার ভাতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।

ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়, বর্তমানে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখের বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৯ লাখ স্নাতক ডিগ্রিধারী। এছাড়া ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের প্রায় ২২ শতাংশ কোনো শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। এই বাস্তবতায় ‘করবো কাজ, গড়বো দেশ’ নীতির ভিত্তিতে দেশব্যাপী এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।

 

অধিদপ্তর গঠনের উদ্যোগ নতুন নয়

২০২০ সালের আগেই এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছিল শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। সে সময় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরি, কর্মসংস্থানবিষয়ক গবেষণা, জাতীয় ডাটাবেজ তৈরি, শ্রমবাজারের চাহিদা বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা তৈরির জন্য একটি পৃথক অধিদপ্তর গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

তৎকালীন পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকায় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের পাশাপাশি বিভাগীয় পর্যায়ে অফিস ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং পরে জেলা পর্যায়ে অফিস স্থাপনের কথা ছিল। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তখন বলেছিলেন, দেশের কোন খাতে কত জনবল প্রয়োজন, কোথায় কত পদ শূন্য রয়েছে ও ভবিষ্যতে কোন ধরনের দক্ষতার চাহিদা বাড়বে, সে বিষয়ে একটি সমন্বিত জাতীয় ডাটাবেজ গড়ে তুলবে কর্মসংস্থান অধিদপ্তর। পাশাপাশি চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রেক্ষাপটে শ্রমবাজারের পরিবর্তন নিয়েও গবেষণা করবে প্রতিষ্ঠানটি। তবে বিভিন্ন প্রশাসনিক ধাপ পেরোতে না পারায় সেই উদ্যোগ আর বাস্তবায়িত হয়নি।

 

অন্তর্বর্তী সরকারেরও কর্মসংস্থান অধিদপ্তর গঠনের বিষয়টি আলোচনায় এসেছিল। শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন কর্মসংস্থান অধিদপ্তর গঠনের প্রক্রিয়া চলমান থাকার বিষয়টি জানিয়েছিলেন।

একই উদ্যোগ নতুন কাঠামোতে সামনে এসেছে। তবে এবার গুরুত্ব পাচ্ছে প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান সেবা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্রস্তাবটি অনুমোদন পেলে চাকরিদাতা ও চাকরিপ্রত্যাশীদের মধ্যে সরাসরি সংযোগ তৈরির পাশাপাশি দেশের কর্মসংস্থান বাজার সম্পর্কে একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার গড়ে উঠবে। এর মাধ্যমে চাকরি খোঁজা, উপযুক্ত প্রার্থী নির্বাচন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শ্রমবাজারের পরিকল্পনা প্রণয়নে সরকারের জন্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল অবকাঠামো তৈরি হবে।

 

মন্ত্রণালয় থেকে যা বলা হচ্ছে

অধিদপ্তর গঠনের বিষয়ে কথা হলে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন অনুবিভাগ) অ স ম আশরাফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রাক-নিকার থেকে মূলত লোকবল কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আগে যে প্রস্তাব ছিল, সেটি অনেক বড় ছিল। এখন সেটিকে সংক্ষিপ্ত করা হচ্ছে। সংশোধনের কাজ শেষ হলে আগামী সপ্তাহের মধ্যে বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে বলা সম্ভব হবে।’

 

আশরাফুল ইসলাম জানান, এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ সেন্টার হবে সম্পূর্ণ ডিজিটালভিত্তিক একটি ব্যবস্থা। চাকরিপ্রত্যাশীরা নিজেদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার তথ্য আপলোড করবেন। অন্যদিকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের জনবল চাহিদা ও শূন্যপদের তথ্য আপলোড করবে। এরপর দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের চাহিদার মিল করিয়ে দেওয়া হবে।

তার ভাষ্য, যাদের দক্ষতার ঘাটতি থাকবে, তাদের উপযুক্ত কারিগরি বা অন্যান্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর ব্যবস্থাও থাকবে। অর্থাৎ শুধু চাকরির তথ্য দেওয়াই নয়, কর্মসংস্থানের উপযোগী দক্ষ জনশক্তি তৈরিতেও ভূমিকা রাখবে নতুন এই ব্যবস্থা।

 

অতিরিক্ত সচিব উল্লেখ করেন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ সেন্টার স্থাপনের বিষয়টি সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকারের অংশ। তবে এটি বাস্তবায়নের আগে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদন সম্পন্ন করতে হবে।

সর্বাধিক পঠিত