বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ রাত
MENU
#
সাভারে খাস পুকুর খনন ও সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পের নামে লক্ষ লক্ষ টাকার মাটি বিক্রির অভিযোগ
daily-fulki

সাভারে খাস পুকুর খনন ও সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পের নামে লক্ষ লক্ষ টাকার মাটি বিক্রির অভিযোগ

সাভারে খাস পুকুর খনন ও সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পের নামে লক্ষ লক্ষ টাকার মাটি বিক্রির অভিযোগ
স্টাফ রিপোর্টার : সাভার উপজেলার বিভিন্ন খাস জলাশয়সমূহ খনন, সংস্কার, ব্যবহার উপযোগীকরণ ও সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পের নামে লক্ষ লক্ষ টাকার মাটি বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পে ৪টি প্যাকেজে ১৮টি পুকুরের কাজ পেয়েছে ৩টি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। তবে ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে কমপক্ষে ৬টি পুকুরের মাটি গভীরভাবে কেটে অন্যত্র বিক্রি করে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। 


এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, একাধিক ঠিকাদার কাজগুলো সাব-ঠিকাদারের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। জলাশয়সমূহ খনন, সংস্কার, ব্যবহার উপযোগীকরণ ও সৌন্দর্যবর্ধন না করে ঠিকাদারের মাটি বিক্রিই মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এবং ব্যবসা বলে মনে করেন স্থানীয়রা।


এছাড়া অনেক পুকুরের খনন কাজ শুরুই বরা হয়নি। একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের মালিক জানিয়েছেন, মাটি বিক্রির টাকা নিয়ম অনুযায়ী জেলা প্রশাসকের অনুকূলে চালানের মাধ্যমে জমা দেয়া হয়েছে। তবে চালান পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মাটি বিক্রির তুলনায় ব্যাংকে জমা দেওয়ার অংক খুবই কম।

ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ৪টি প্রকল্পে মোট ২ কোটি ৬১ লক্ষ ৭১ হাজার ৩৬০ টাকা বরাদ্দ করে কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। কাজ শুরুর কথা ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর। আর কাজ শেষ করার ধার্যদিন ১৬ জুন ২০২৬ ইং। কিন্তু এ ১৮টি পুকুরের একটির কাজরও শেষ হয়নি। 


মাটি কাটা পুকুর পারের মানুষের বাড়ি-ঘর, মসজিদ ভাঙ্গনের কবলে পড়ায় এলাকাবাসীর তোপের মুখে পড়ে খনন কাজ বন্ধ রেখে ঠিকাদারকে ফিরে আসতে হয়েছে।


সরকারি খাস পুকুর খনন ও সৌন্দর্যবর্ধনের প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ১২ জুন। কিন্তু কার্যাদেশের মেয়াদ শেষ হলেও একটি পুকুরও ব্যবহার উপযোগীকরণ ও সৌন্দর্যবর্ধন কাজ সম্পন্ন হয়নি। এছাড়াও প্রকল্পের আওতাধীন একাধিক এলাকায় পুকুরের পার কেটে লক্ষ লক্ষ টাকার মাটি বিক্রির অভিযোগ উঠেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। ফলে প্রকল্পের স্বচ্ছতা, কাজের মান ও সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

জেলা প্রশাসনের বাস্তবায়নে এবং বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের অর্থায়নে ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় সাভার উপজেলা এলাকার ১৮টি ইজারাবিহীন খাস পুকুর ও জলমহালসমূহের সংস্কার, উন্নয়ন, সৌন্দর্যবর্ধন ও পরিবেশ সংরক্ষণ প্রকল্প (১ম পর্যায়)’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় সাভার উপজেলায় খাস পুকুর সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

 

প্রকল্প-১, সাভার উপজেলার বিভিন্ন খাস জলাশয়সমূহ খনন, সংস্কার, ব্যবহার উপযোগীকরণ ও সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্প। এ প্রকল্পে বনগাঁও ইউনিয়নের (১) কুমরান, (২) কান্দিবলিয়ারপুর ও (৩) বেড়াইদ পুকুর খনন, সংস্কার, ব্যবহার উপযোগীকরণ ও সৌন্দর্যবর্ধন কাজের জন্য ৯ লক্ষ ৮৬ হাজার ৬৭০/- টাকায় ঠাকুরগাঁও জেলার পিরগঞ্জ উপজেলার বঙ্গবন্ধু সড়কের মেসার্স রেজিয়া ট্রেড ইন্টারন্যাশনালকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর কার্যাদেশ প্রদান করা হয় এবং যা ২০২৬ সালের ১৬ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। এ প্রকল্পের বেরাইদ রাজধানীর ঢাকার বসুন্ধরা এলাকায় বলে জানা যায়।


প্রকল্প-২, সাভার উপজেলার ধনঞ্জয়পুর খাস জলাশয়সমূহ খনন, সংস্কার, ব্যবহার উপযোগীকরণ ও সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্প। এ প্রকল্পের আওতায় (ক) ধনঞ্জয়পুর পুকুর খনন, সংস্কার, ব্যবহার উপযোগীকরণ ও সৌন্দর্যবর্ধন কাজের জন্য ৩৬ লক্ষ ১৩ হাজার ৪০/- টাকায় একই প্রতিষ্ঠান মেসার্স রেজিয়া ট্রেড ইন্টারন্যাশনালকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর কার্যাদেশ প্রদান করা হয় এবং যা ২০২৬ সালের ১৬ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়।

প্রকল্প-৩, সাভার উপজেলার (১) জালেশ্বর-১, (২) জালেশ্বর-২, (৩) চারিগ্রাম পশ্চিমপাড়া ও (৪) চারিগ্রাম পূর্বপাড়া খাস পুকুর ও জলাশয়সমূহ খনন, সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্প। এ প্রকল্পের আওতায় জলেশ্বর-১, জলেশ্বর-২, চারিগ্রাম পশ্চিমপাড়া ও চারিগ্রাম পূর্বপাড়া পুকুর খনন, সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধন কাজের জন্য ১ কোটি ২০ লাখ ৪৯ হাজার ৮০০/- টাকায় ঢাকা জেলার সাভার পৌর এলাকার বি-২৭/২, ব্যাংক কলোনীর মেসার্স জাফর ট্রেডিং করপোরেশনকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর কার্যাদেশ প্রদান করা হয় এবং যা ২০২৬ সালের ১৬ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়।

 

প্রকল্প-৪, সাভার উপজেলার বিভিন্ন খাস জলাশয়সমূহ খনন, সংস্কার, ব্যবহার উপযোগীকরণ ও সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্প। এ প্রকল্পের আওতায় (১) শিমুলিয়া কাচারিবাড়ি, (২) দেওয়ান বাড়ি, (৩) বদরউদ্দিন খান, (৪) তাজপুর, (৫) কবিরপুর ভুনাবাড়ি, (৬) বাইদগাঁও জিহাস, (৭) কোনাপাড়া কচুশাক ও (৮) বাসাইদ পুকুর খনন, সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধন কাজের জন্য ৯৫ লাখ ২১ হাজার ৮৫০/- টাকায় মাদারীপুরের বিএসসিআইসি এলাকার মেসার্স হাজী শরিয়ত উল্লাহ ট্রেডার্সকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর কার্যাদেশ প্রদান করা হয় এবং যা ২০২৬ সালের ১৬ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। 


কিন্তু জালেশ্বর-২ পুকুরে একটি ভেকু মেশিন দিয়ে খননকাজ চললেও তা এখন বন্ধ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ ঠিকাদার পুকুরের পাড় কেটে মাটি বিক্রি করেছেন। পুকুরের পার কাটার ফলে আশপাশের মানুষের ঘর-বাড়ি এবং পাশের মসজিদটি ভাংগনের কবলে পড়ে। পরে এলাকাবাসী একজোট হয়ে কাজ বন্ধ করে দেয়। 


এদিকে প্রকল্পের আওতাধীন শিমুলিয়া ইউনিয়নের কাচারিবাড়ি পুকুর থেকে কমপক্ষে ৫শ’ গাড়ি মাটি কেটে বিক্রি করেছে বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ। এছাড়া আশুলিয়ার চারিগ্রাম, বাসাইদ, কুমারন, কান্দি বলিয়ারপুর ও বেড়াইদ এলাকায় শত শত গাড়ি মাটি কেটে বিক্রির অভিযোগও উঠেছে।


সরেজমিনে কুমারন মৌজার ভবানীপুর এলাকার একটি পুকুরে গিয়ে দেখা যায়, পুকুরটি গভীর করে খনন করে শত শত গাড়ি মাটি কেটে বিক্রি করা হয়েছে। 


স্থানীয়দের দাবি, পুকুরের পাড় উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য মাটি ব্যবহার করার কথা থাকলেও বাস্তবে সামান্য মাটি পুকুরের পাড়ে ফেলে বাকী মাটি অন্যত্র বিক্রি করে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। যা দরপত্রের চুক্তির সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক বছর আগে সরকারি উদ্যোগে একই পুকুর খনন করা হয়েছিল। তবে এবার পুকুরটিকে অনেক বেশি গভীর করে খনন করা হয়েছে। তাদের অভিযোগ, শুধুমাত্র এই একটি পুকুর থেকেই প্রায় ৫০ লাখ টাকার মাটি বিক্রি করা হয়েছে, মাটিগুলো বিভিন্ন ইটভাটায় সরবরাহ করা হয়েছে। 


অন্যদিকে আশুলিয়ার (ইয়ারপুর ইউনিয়নের) তাজপুর এলাকায় আদালতে বিচারাধীন একটি বিরোধপূর্ণ পুকুর খনন ও সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্প নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, খননের নামে এ পুকুর থেকে শত শত ট্রাক মাটি কেটে বিভিন্ন ইটভাটায় বিক্রি করা হয়েছে। এতে ভারী যানবাহনের কারণে এলাকার ইটের সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ঘটনায় স্থানীয়রা বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছেন। 
সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগে আশুলিয়া থানায় সাধারণ ডায়েরিও করা হয়েছে। আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম পিপিএম জানান, অভিযোগ তদন্তে একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
 

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য

মেসার্স রেজিয়া ট্রেডার্স ইন্টারন্যাশনাল : এ বিষয়ে প্রকল্প-১ ও প্রকল্প-২-এর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স রেজিয়া ট্রেডার্স ইন্টারন্যাশনাল-এর সত্ত্বাধিকারি মনিরুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, পুকুরের দখল নিয়ে ঝামেলা ছিলো। সাংবাদিকদের সহায়তায় দখল সংক্রান্ত ঝামেলা শেষ হয়েছে। এখন বর্ষাকাল তাই খনন কাজ করা যাচ্ছে না। বর্ষা শেষ হলেই কাজ শুরু করবো। পুকুর থেকে মাটি কেটে বিক্রি করার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, কোন পুকুর থেকেই মাটি কাটা শুরু হয়নি। তবে বনগাঁও ইউনিয়নের কান্দি বলিয়ারপুর পুকুর থেকে ১০ থেকে ১৫ ট্রাক মাটি কেটে কবরস্থান ও স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের কাজ গত ১৬ জুন ২০২৬ শেষ হয়েছে। এখন কিভাবে কাজ করবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকার প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বাড়িয়েছে।

মেসার্স জাফর ট্রেডিং করপোরেশন : এ বিষয়ে প্রকল্প-৩-এর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স জাফর ট্রেডিং করপোরেশনের বক্তব্য জানতে চাইলে ফেনে অপরপ্রান্ত থেকে প্রতিষ্ঠানের পরিচালক জনাব তপু বলেন, জালেশ্বর-১, জালেশ্বর-২ ও চারিগ্রাম পূর্বপাড়া পুকুরের কিছু মাটি কাটার কাজ করা হয়েছে। তবে বর্ষার কারণে পুকুরের তলদেশ থেকে মাটি কাটা সম্ভব হয়নি। কাজ শেষ করার সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। এ সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ করা হবে। কিন্তু মাটি বিক্রির অভিযোগ সত্য নয়।

মেসার্স হাজী শরিয়ত উল্লাহ ট্রেডার্স : এ ব্যাপারে নপ্রকল্প-৪-এর ঠিকাদার মেসাস হাজী শরিয়ত উল্লাহ ট্রেডার্সের মালিক মিজানুর রহমান মিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জানান, তাজপুর ও কাচারিবাড়ি পুকুরের কাজ শেষ হয়েছে। এ দুটি পুকুরের কিছু মাটি বিক্রি নিয়ম অনুযায়ী বিক্রি করেছি এবং সে অর্থ চালানের মাধ্যমে জেলা প্রশাসকের অনুকূলে জমা দেওয়া হয়েছে। প্রকল্প বাবদ কোন বিল এখনও পাওয়া যায়নি। তিনি আরও জানান,  বাজেট কম তাই প্রকল্প থেকে সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ বাদ দেওয়া হয়েছে এবং প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।


সাভার উপজেলা নির্বাহী অফিসার : সাভার উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, এলাকাবাসীর অভিযোগের ভিত্তি আছে বলে শুনেছি। তবে এখন পর্যন্ত কোন বিল পেমেন্ট করা হয়নি। বর্ষকাল চলছে, প্রকল্পের কাজ করতে সমস্যা হচ্ছে। তাই সময় বাড়ানো হতে পারে। কোনো মসজিদ বা মাদ্রাসা মাটি নিতে আগ্রহী না হওয়ায় কিছু মাটি ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়েছে।
 

সর্বাধিক পঠিত