মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ রাত
MENU
#
আজ ২১ জুলাই সাভারবাসীর জন্য বিভীষিকাময় দিন
daily-fulki

আজ ২১ জুলাই সাভারবাসীর জন্য বিভীষিকাময় দিন


স্টাফ রিপোর্টার : আজ ২১ জুলাই। ছাত্র জনতার আন্দোলনে সাভারবাসীর জন্য ছিল এক বিভীষিকাময় দিন। ২০২৪ সালের এদিন কারফিউ অমান্য করে বিপুল সংখ্যক ছাত্রজনতা ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে বিক্ষোভ ও কেন্দ্র ঘোষিত সর্বাত্মক অবরোধ কর্মসূচিতে (কম্পিপ্লিট শাটডাউন) অংশগ্রহণ করেন। এদিন সাভারে ৬ জনসহ সাভারে ১৯ জন শহীদ হয়েছেন।


এদিন সকাল থেকেই ঢাকা জেলার তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম এন্ড অপ্্স) বর্তমানে কারাবন্দী আবদুল্লাহিল কাফির নেতৃত্বে মহাসড়ক থেকে ছাত্র-জনতার ওপর দফায় দফায় গুলি চালানো হয়। সড়ক-মহাসড়ক থেকে তাদেরকে হটিয়ে দেয়া হয়। পুলিশ ও আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা বেশ আক্রমণাত্মক মনোভাব নিয়ে যৌথভাবে শক্তি প্রদর্শন এবং সশস্ত্র অবস্থায় মটরসাইকেল শোডাউন করে। সড়ক মহাসড়কে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ছিল। তারা এপিসি, জলকামানসহ ৩০/৩৫টি গাড়ী বহর নিয়ে সাভার ও আশুলিয়ায় কড়া পাহাড়া দিতে থাকে। তাদের সাথে ছিল দোসর আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের মটরসাইকেল মহড়া।


এক পর্যায়ে বেলা সাড়ে ১২টারদিকে সাভার থানা বাসস্ট্যান্ড ও পাকিজা মোড়ে পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের সাথে আন্দোলনকারীদের তুমুল সংঘর্ষ বেধে যায়। পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের গুলিতে এদিন ছয়জন শহীদ হন। দুপুরের পর থেকে রাতভর সাভার পৌর এলাকায় প্রায় অর্ধশত বিএনপি নেতা ও সাংবাদিকদের বাড়ি ঘরে লুটপাট চালায় পুলিশ ও সন্ত্রাসী বাহিনী। আন্দোলনকারী ও নিরীহ পথচারীসহ প্রায় শতাধিক ব্যক্তিকে এ দিন পুলিশ আটক করে কারাগারে পাঠায়। এর আগের দিন ২০ জুলাই পুলিশের গুলিতে সাভার বাসস্ট্যান্ডের কাঁচা বাজারে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। গুলিতে মুরগীর দোকানি কুরবান শেখ ও ফারুক হোসেন শহীদ হন। আহত হন প্রায় অর্ধশত। এ ছাড়া বাসস্ট্যান্ড ও পাকিজা মোড়ে আরো তিন ব্যক্তি পুলিশ ও আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের গুলিতে নিহত হন।


২১ জুলাই সকাল থেকে বিক্ষোভ দমাতে পুলিশ টিয়ার সেল, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে ছাত্র-জনতাকে ছত্র ভঙ্গ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। শত শত ছাত্র-জনতা ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে ৫ শতাধিক সন্ত্রাসী ও পুলিশকে বেশ ধরাশায়ী করে ফেলে। থানা বাসস্ট্যান্ড, পাকিজা মোড়, সাভার বাসস্ট্যান্ড, শিমুলতলা, রেডিও কলোনী, বিশ মাইল, পল্লী বিদ্যুত, পলাশবাড়ী, বাইপাইল, জামগড়াসহ সকল গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পুলিশকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। এ দিন পুলিশ অহরহ শটগান ও ছররা গুলি চালায়। বিভিন্ন পয়েন্টে গুলিতে ছয়জন শহীদ হন। দুপুরের পর থেকে পুলিশ সাভার পৌর এলাকায় বিএনপি ও ভিন্ন মতের ব্যক্তিদের বাসা ও অফিসে লুটপাট চালানো হয়।


ঢাকা জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর খোরশেদ আলম জানান, ২১ জুলাই পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীরা তাকে না পেয়ে পৌর এলাকায় ছায়াবিথী মহল্লায় তার শ্বশুর শহীদুল্লা কায়সারের বাসায় অতর্কিত হামলা, ভাঙ্গচুর ও লুটপাট চালায়। তার বাসায় থাকা ভেটেরিনারী ওষুধ ব্যবসার নগদ ৩৪ লাখ টাকা, খোরশেদ আলমের স্ত্রীর গলায় থাকা স্বর্ণের চেইনসহ২০/২২ ভরি স্বর্ণ, টিভি, ফ্রিজ, মোবাইল ফোন লুট করে নিয়ে যায়।


এছাড়া গুলি করে বাসার এসি, পানির পাম্প, ফ্যান,ওয়াশ রুমের কমডসহ নানা আসবাব পত্র ঝাঝরা করে দেয়। খোরশেদ আলম আরও জানান ফ্রীজের মাছ,মাংস পাশের পুকুরে ফেলে দেয় পুলিশ ও সন্ত্রাসীরা। একই কায়দায় পুলিশ পৌর এলাকার ডগরমোড়ায় ঢাকা জেলা জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক সেক্রেটারী ও সাবেক কাউন্সিরর হাসান মাহবুব মাস্টার, রেডিও কলোনী এলাকায় পৌর বিএনপি নেতা সোহরাব হোসেন, সাইফুর রহমান, মজিদপুর এলাকায় পৌর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও পৌর সাবেক কাউন্সিলর আবদুর রহমানের বাসায় লুটপাট চালায়। আবদুর রহমানের স্ত্রী দিলরুবা আক্তার রুমীর ৪০ ভড়ি স্বর্ণ, নগদ টাকা, মোবাইল ফোন লুটে নেয়। 


পুলিশ বাসার টিভি ফ্রিজ, এয়ারকুলারসহ বিভিন্ন তৈষজপত্র ভেঙ্গে তছনছ করে। লুটপাটকারীরা এ বাড়িতে মদ্যপান শেষে দুটি খালি বোতলসহ বিভিন্ন মাদক সেবনের বিভিন্ন আলামত ফেলে যায়। তারা একই কায়দায় সাভার বাসস্ট্যান্ডে সিটি সেন্টার ভবনে থাকা সাভার পৌর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ব্যবসায়ী নেতা ওবায়দুর রহমান অভির বাসায় লুটপাট চালায়। ওবায়দুর রহমান অভি জানান, রাতের আধারে তালাবদ্ধ বাসায় ৭০/৮০ জন পুলিশ প্রবেশ করে বাসার বাসার টিভি, ফ্রীজসহ যাবতীয় তৈষস পত্র ও পার্কিংয়ে থাকা দুটি গাড়ী ভাংচুর করে কোটি ক্ষতি সাধন ও লুটপাট করে। তারা একই দিনে আইচানোয়াদ্দায় যুবদল নেতা ইউনুস খান ও তার পুত্র পৌর ছাত্রদল নেতা নাঈম খানের বাড়িতে হামলা চালায় এবং ভাংচুর ও লুটপাট করে।


পুলিশ পর্যায়ক্রমে অর্ধশত বিএনপি নেতা-কর্মীদের বাড়ীতে পুলিশ ও সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়ে লুটপাট ও ভাংচুর করে। ভিন্ন মতের হওয়ায় এবং ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে সংবাদ প্রকাশ করায় এ দিন ঢাকা জেলার স্থানীয় দৈনিক ফুলকি অফিসে হামলা করে পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীরা। তারা অফিসের চারটি কম্পিউটার, দুটি টিভি, সিসি ক্যামেরা, দরজা জানালার গ্লাস, ওয়াশ রুমের কমড মোবাইল ফোনসহ নানা দ্রব্য সামগ্রী ভাংচুর ও দুটি কম্পিউটার লুটে নেয়।


এ সময় দৈনিক ফুলকি অফিসে থাকা দৈনিক ফুলকির বার্তা সম্পাদক ও বাংলাভিশন টিভির সাভার প্রতিনিধি এবং বর্তমানে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার নজমুল হুদা শাহীনকে ধরে তাদের গাড়ীতে তুলে নিতে ঢাকা আরিচা মহাসড়কে পুলিশ ভ্যানের নিকট নিয়ে যায় এবং দীর্ঘ সময় নানা ধরনের অসৌজন্যমূলক আচরণ করে। এক পর্যায়ে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন রেখে এবং পত্রিকার সম্পাদক তার বড় ভাই নাজমুস সাকিবের অবস্থান জানতে চেয়ে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে নানা বিভ্রান্তিকর বিষয়ে জিজ্ঞাসা শেষে ছেড়ে দেয়।
২১ জুলাই ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক ও সংযোগ সড়ক-মহাসড়ক ছাড়াও পাড়া-মহল্লা এমনকি বাসা বাড়ীর ছাদও নিরাপদ ছিল না। আন্দোলনে অংশ নেয়া বিক্ষুব্ধ মানুষ ছিল আতঙ্কিত।
 

সর্বাধিক পঠিত