মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ রাত
MENU
#
ফিরে দেখা ২১ জুলাই, দৈনিক ফুলকি অফিসে হামলার বিভীষিকাময় দিন
daily-fulki

ফিরে দেখা ২১ জুলাই, দৈনিক ফুলকি অফিসে হামলার বিভীষিকাময় দিন

 

স্টাফ রিপোর্টার : ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে সাভারে সংঘটিত অন্যতম আলোচিত ঘটনা ছিল আজ ২১ জুলাই ঢাকা জেলার স্থানীয় পত্রিকা সাভার থেকে প্রকাশিত দৈনিক ফুলকি কার্যালয়ে লুটপাট, হামলা ও ভাঙচুর। আন্দোলন ঘিরে উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে ওইদিন বিকেল সাড়ে ৫ টারদিকে তৎকালীন ঢাকা জেলার তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম এন্ড অপ্্স) বর্তমানে কারাবন্দী আবদুল্লাহিল কাফির নেতৃত্বে প্রথমই ফুলকি অফিসে অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

 

ওই অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল ঢাকা জেলার একমাত্র ডিএফপি’র মিডিয়া তালিকাভুক্ত পত্রিকা দৈনিক ফুলকি কার্যালয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, তৎকালীন ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহিল কাফির নেতৃত্বে সাভার মডেল থানা, আশুলিয়া থানা, ভাকুর্তা ফাঁড়ি, আমিনবাজার ফাঁড়ি ও বিরুলিয়া ফাঁড়ির বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য এলাকা ঘিরে ফেলে প্রথমে ফুলকি কার্যালয়ের ভবনের সিসি ক্যামেরাগুলো ভাঙচুর করেন। পরে অফিসে প্রবেশ করে কম্পিউটার, মনিটর, ক্যামেরা, ল্যাপটপ, টিভি, প্রিন্টারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ভাঙচুর করা হয় এবং কয়েকটি কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক খুলে নিয়ে যাওয়া হয়।


সেসময় কার্যালয়ের ভেতরে অবস্থান করছিলেন দৈনিক ফুলকির বার্তা সম্পাদক ও বাংলাভিশনের প্রতিনিধি নজমুল হুদা শাহীন। তিনি জানান, পুলিশ তাকে একটি গাড়িতে তুলে পত্রিকার সম্পাদক নাজমুস সাকিবের অবস্থান জানতে চায়। সম্পাদক কোথায় আছে জানি না জানালে তখন এডিশনাল এসপি আব্দুল্লাহিল কাফি ফোন করে তাকে ডেকে আনতে বলেন। কিন্তু নজমুল হুদা শাহীন এ সময় জানান, তাকে অফিস থেকে আটককের সময় পুলিশ ফোন দুটি নিয়ে গেছে। কোন পুলিশ তার ফোন নিয়েছে তা নিশ্চিত করতে না পারলে কিছুক্ষণ পর সম্পাদক নাজমুস সাকিবকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করার নির্দেশ দিয়ে তাকে ছেড়ে দেয়। 


একই সময়ে ভবন ও আশপাশের বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালিয়ে দৈনিক ফুলকির সম্পাদক নাজমুস সাকিবকে খুঁজতে থাকে পুলিশ। সেদিনের ঘটনার স্মৃতিচারণ করে নজমুল হুদা শাহীন বলেন, দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে বহু ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। কিন্তু ২১ জুলাইয়ের মতো ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আগে কখনও হয়নি। তার ভাষায়, সেদিন দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের আচরণ ছিল অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। তাদের চোখেমুখে ছিল এক ধরনের হিংস্রতা। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, কথা বললেই গুলি করা হতে পারে বলে মনে হচ্ছিল। পরিচিত পুলিশ সদস্যদের আচরণও সেদিন ছিল সম্পূর্ণ অচেনা।


দৈনিক ফুলকির সম্পাদক নাজমুস সাকিব বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের কারণে তিনি বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ট্যাগ ও চাপ, মামলা, জেল-জুলুম ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। তার অভিযোগ, ২১ জুলাইয়ের অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল তাকে খুঁজে বের করে নির্মম প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা। সম্ভাব্য হামলার তথ্য পেয়ে তিনি আত্মগোপনে যাওয়ায় প্রাণে রক্ষা পান। তার দাবি, সেদিনের হামলা শুধু একটি সংবাদপত্রের ওপর আঘাত নয়, বরং স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের উপর ফ্যাসিস্ট সরকারের চরম দমন-নীপিড়ণের বহি:প্রকাশ।


স্থানীয়দের অভিযোগ, ওইদিন সাভার পৌরসভার স্মরণিকা এলাকা থেকে প্রায় ২০ থেকে ২৫ জনকে আটক করা হয়, যাদের অধিকাংশই ছিলেন পোশাকশ্রমিক। ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তারা মুক্তি পেলেও অনেকেই আর আগের কর্মস্থলে ফিরে চাকরি পাননি বলে অভিযোগ করেন।


স্থানীয়দের ভাষ্য, ২১ জুলাইয়ের সেই অভিযান শুধু একটি সংবাদপত্রের কার্যালয়ে হামলাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; হ্যান্ড মাইকে ফুলকি সম্পাদককে আটকে এলাকাবাসীর সহযোগিতার নামে বিভিন্ন হুমকী ও ভয়ভীতিতে পুরো এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক পরিবার এখনো সেই দিনের স্মৃতি ভুলতে পারেনি। 


দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ২০২৪ সালের ২১ জুলাইয়ের সেই বিকেল সাভারের মানুষের কাছে এখনও এক বিভীষিকাময় স্মৃতি। আর দৈনিক ফুলকি কার্যালয়ে হামলার ঘটনাটি সাভারের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে সংবাদমাধ্যমের ওপর সংঘটিত অন্যতম জঘন্য আলোচিত ও স্মরণীয় হামলা হিসেবে আজও আলোচিত।
 

সর্বাধিক পঠিত