স্টাফ রিপোর্টার : কোনো মানুষের ওপর যদি এমন কোনো বিপদ আসে, যার আগে তার কোনো গুনাহ নেই, তাহলে বলা হয়, এটি তার ধৈর্যের পরীক্ষা এবং সওয়াবের আশায় তার মর্যাদা বৃদ্ধি করার একটি মাধ্যম। এই বিপদ কোনো গুনাহ মোচনের জন্য নাও হতে পারে; বরং এটি তার অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার জন্য আসে, যাতে সে ধৈর্যের মাধ্যমে ধৈর্যশীলদের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছতে পারে।
প্রত্যেক বিপদের মধ্যে ১০টি উপকার আছে, যার জন্য বান্দার আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত—
এক. মানুষের দুর্বলতা ও আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষিতার স্মরণ : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি তোমার পূর্ববর্তী জাতিগুলোর কাছে রাসুলদের পাঠিয়েছিলাম। অতঃপর তাদের দারিদ্র্য ও দুঃখ-কষ্ট দ্বারা পাকড়াও করেছিলাম, যাতে তারা বিনীতভাবে আমার কাছে প্রার্থনা করে।’ (সুরা : আল-আনআম, আয়াত : ৪২)
দুই. আল্লাহর নিয়ামত স্মরণ করিয়ে দেওয়া : রোগ না হলে মানুষ সুস্থতার মূল্য বুঝতে পারে না। সম্পদ হারানোর অভিজ্ঞতা না হলে ধন-সম্পদের মূল্য উপলব্ধি হয় না।
কারণ বিপরীত বিষয়ের মাধ্যমে জিনিসের প্রকৃত মূল্য বোঝা যায়।
তিন. ধর্মীয় উদাসীনতা ও ঘুমন্ত অবস্থা থেকে মানুষকে জাগিয়ে তোলা : আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন, ‘আমি অবশ্যই তাদের বড় শাস্তির আগে ছোট শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাব, যাতে তারা ফিরে আসে।’ (সুরা : আস-সাজদাহ, আয়াত : ২১)
চার. গুনাহ ও ভুলত্রুটি মাফ হওয়া : আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে তিনি বিপদে ফেলেন।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৬৪৫)
অর্থাৎ এমন বিপদ, যা তার স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে, সম্পদে ক্ষতি করে অথবা আনন্দকে দুঃখে পরিণত করে।
কোনো কোনো মুসলিম মনীষী বলেন, ‘যদি বিপদ-মুসিবত না আসত, তবে আমরা কিয়ামতের দিন নিঃস্ব অবস্থায় উপস্থিত হতাম।’
পাঁচ. মর্যাদা বৃদ্ধি পাওয়া : আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কখনো কখনো কোনো ব্যক্তির জন্য আল্লাহর কাছে এমন মর্যাদা নির্ধারিত থাকে, যা সে নিজের আমল দ্বারা অর্জন করতে পারে না। তখন আল্লাহ তাকে এমন বিষয়ের মাধ্যমে পরীক্ষা করতে থাকেন যা সে অপছন্দ করে, অবশেষে তাকে সেই মর্যাদায় পৌঁছে দেন।’ সহিহুল জামে, হাদিস : ১৬২৫)
ছয়. আত্মোপলব্ধি করা : বিপদ এলে এই চিন্তা করা যে আল্লাহ চাইলে বিপদ আরো বড় হতে পারত। তাই বান্দার উচিত আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা।
কারো কিছু সম্পদ নষ্ট হলে সে যেন আল্লাহর প্রশংসা করে যে তার সব সম্পদ নষ্ট হয়নি।
সাত. বিপদ দুনিয়ায়ই সীমাবদ্ধ থাকা : দুনিয়ার বিপদ ক্ষণস্থায়ী এবং এর প্রভাবও সীমিত। সময়ের সঙ্গে মানুষ তা ভুলে যায় বা তা সহ্য করার শক্তি পায়। কিন্তু আখিরাতের বিপদ দীর্ঘস্থায়ী, কঠিন ও অত্যন্ত ভয়াবহ।
আট. উত্তম প্রতিদান লাভ : ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি প্রত্যাবর্তনের কারণে উত্তম প্রতিদান লাভ করা। উম্মে সালামা (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি—কোনো মুসলিম যখন কোনো বিপদে আক্রান্ত হয় এবং আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী বলে—‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই এবং তাঁর কাছেই ফিরে যাব।’ এবং বলে—‘হে আল্লাহ! আমার এই বিপদে আমাকে সওয়াব দান করুন এবং এর পরিবর্তে আমাকে উত্তম কিছু দান করুন।’ তাহলে আল্লাহ অবশ্যই তাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করেন। (মুসলিম, হাদিস : ৯১৮)
নয়. অগণিত সওয়াবের অধিকারী হওয়া : বিপদের চেয়ে তার প্রতিদান অনেক বেশি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের তাদের প্রতিদান অগণিতভাবে প্রদান করা হবে।’ (সুরা : আয-ঝুমার, আয়াত : ১০)
দশ. দুনিয়াকেন্দ্রিক বিপদ অপেক্ষাকৃত ভালো : এর জন্য শুকরিয়া আদায় করা উচিত যে দ্বিনের ওপর বিপদ আসেনি। এটি আল্লাহর বড় অনুগ্রহ। কারণ দুনিয়ার ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব, কিন্তু দ্বিনের ক্ষতি সবচেয়ে বড় ক্ষতি। রাসুলুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি দোয়া ছিল—‘হে আল্লাহ! আমাদের দ্বিনের মধ্যে আমাদের ওপর কোনো বিপদ চাপিয়ে দেবেন না। আর দুনিয়াকে আমাদের সবচেয়ে বড় চিন্তা ও আমাদের জ্ঞানের চূড়ান্ত সীমা বানাবেন না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৫০২)
সারকথা হলো মুমিনের কাছে বিপদ শুধু কষ্টের নাম নয়; বরং তা হতে পারে আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম, গুনাহ মাফের কারণ, মর্যাদা বৃদ্ধির পথ এবং আখিরাতের চিরস্থায়ী সফলতার সোপান। তাই বিপদের সময় ধৈর্য, সন্তুষ্টি ও কৃতজ্ঞতার পথ অবলম্বন করাই ঈমানের সৌন্দর্য।
