রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬, ১২:০০ রাত
MENU
#
সাভারে কিশোরকে নির্যাতনের অভিযোগে থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক বহিষ্কার
daily-fulki

সাভারে কিশোরকে নির্যাতনের অভিযোগে থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক বহিষ্কার


স্টাফ রিপোর্টার : সাভার পৌর এলাকার রাজাশন মহল্লায় রিপন দাস (১৫) নামে এক কিশোরকে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে সাভার থানা ছাত্রদলের নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব হোসেন সামিরের বিরুদ্ধে। এতে ভুক্তভোগী কিশোরের দু’টি চোখই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বলে অভিযোগ করেছে পরিবার। এ ঘটনায় সাভার থানা ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণার মাত্র ২১ দিনের মাথায় সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব হোসেন সামিরকে সাংগঠনিক পদ থেকে অব্যাহতি দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল।

 

হামলার ঘটনায় রিপনের ভগ্নিপতি স্বপন সূত্রধর শুক্রবার (২৬ জুন) রাতে সাভার থানায় মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় সাভার থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মাহবুব হোসেন সামিরসহ তার কয়েকজন সহযোগীকে আসামি করা হয়েছে।

এ ঘটনায় নির্যাতিত কিশোরের বোনজামাই স্বপন চন্দ্র সূত্রধর গত বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) রাতে ছাত্রদল নেতা মাহাবুব হোসেন সামিরকে প্রধান আসামি করে চারজনের নাম উল্লেখসহ ৫ থেকে ৬ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাভার মডেল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।

এদিকে এ ঘটনার পর শুক্রবার (২৬ জুন) দুপুরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে ঢাকা জেলা উত্তরের অধীনস্থ সাভার থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মাহবুব হোসেন সামিরকে সাংগঠনিক পদ থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন নাসির এই অব্যাহতি আদেশ অনুমোদন করেছেন বলে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়েছেন দপ্তর সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম।

সাভার মডেল থানায় দায়ের করা মামলার অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, গত ৩০ মে বিকেলে সাভার পৌরসভার মধ্য রাজাশনের পালোয়ানপাড়া এলাকায় সমবয়সী কয়েকজনের সঙ্গে খেলাধূলা করছিল কিশোর রিপন। এ সময় স্থানীয় অপর এক কিশোরের সঙ্গে অনাকাঙ্খিতভাবে ধাক্কা লাগার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিরোধের সৃষ্টি হয়। পরে ওই কিশোরের বড় ভাই হিসেবে পরিচিত ছাত্রদল নেতা মাহাবুব হোসেন সামির ক্ষুব্ধ হয়ে রিপনকে খুঁজে বের করার জন্য তার সহযোগীদের নির্দেশ দেন।

এর ধারাবাহিকতায় গত ২ জুন বিকেল ৪টারদিকে রাজাশন পালোয়ানপাড়া এলাকায় রাজধানী বেকারির সামনে থেকে রিপনকে জোরপূর্বক তুলে সামিরের ব্যক্তিগত অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই তাকে নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভুক্তভোগীর পরিবারের অভিযোগ, মারধরের একপর্যায়ে রিপন অচেতন হয়ে পড়লে অভিযুক্তরা তাকে বাড়ির সামনে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে তাকে জাতীয় ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানেও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

লিখিত অভিযোগে মাহাবুব হোসেন সামির ছাড়াও তার সহযোগী মানিক, সজিব এবং আলাউদ্দিন ওরফে আলমগীরের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অপহরণ, অবৈধভাবে আটকে রাখা, গুরুতর শারীরিক নির্যাতন এবং হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে।

 

রিপন ময়মনসিংহের তারাকান্দা এলাকার জীবন ঋষির ছেলে। সে বাবা মায়ের সঙ্গে সাভার পৌরসভার রাজাসন মহল্লায় থাকে। জীবন ঋষি পেশায় একজন চর্মকার এবং তার স্ত্রী স্থানীয় একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন।

হামলার শিকার রিপনের ভগ্নিপতি স্বপন সূত্রধর বলেন, গত ৩০ মে সাভার পৌরসভার রাজাসন পালোয়ান মার্কেটের সামনে সমবয়সীদের সঙ্গে খেলাধুলা করছিল। এ সময় ছাত্রদল নেতা সামিরের এক সহযোগীর সঙ্গে তার ধাক্কা লাগে। এতে তিনি ক্ষুব্ধ হন এবং বিষয়টি সামিরকে জানান।

রিপন আরও বলেন, সামিরের নির্দেশে গত ২ জুন মানিক ও সজীব নামে তার দুই সহযোগী রিপনকে সামিরের পালোয়ান মার্কেটের অফিসে ধরে নিয়ে যান। অফিসে নেওয়ার পর তাকে কিল, ঘুষি ও লাথি মারার পাশাপাশি লাঠি দিয়ে মাথা ও শরীরের বিভিন্ন অংশ আঘাত করা হয়।
এ ছাড়া বারবার তার মাথা দেওয়ালের সঙ্গে ঠেকিয়ে সজোরে ধাক্কা মেরে আঘাত দেওয়া হয়। তার দুই চোখে লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয়। প্রচণ্ড আঘাতে তার দুই চোখ দিয়েই রক্তক্ষরণ হয়। উপর্যুপরি মারপিট ও চোখের আঘাতের কারণে রিপন অচেতন হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে তাকে বাসার পাশে ফেলে রেখে যাওয়া হয়।

রিপনের মা আসন্তি ঋষি বলেন, ঘটনার পর মুমূর্ষু অবস্থায় রিপনকে প্রথমে সভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসাইন্স হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। পরবর্তীতে অবস্থার আরও অবনতি ঘটলে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার অবস্থার উন্নতি হচ্ছিল না। অর্থের অভাবে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে না পারায় গত বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) তাকে বাড়ি নিয়ে আসা হয়।

ভুক্তভোগীর মা আরও জানান, তার ছেলে দুই চোখে কোনো কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। মস্তিষ্কে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের প্রভাবে এবং চোখে আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ায় দুই চোখই নষ্ট হয়ে গেছে বলে চিকিৎসকেরা তাকে জানিয়েছেন। অর্থের অভাবে চিকিৎসা করাতে না পেরে তার ছেলের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে।

আসন্তি ঋষি আরও বলেন, থানায় অভিযোগ করার পর থেকে তার পরিবারের সদস্যদের নানাভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এ অবস্থায় তারা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

এদিকে কিশোর নির্যাতনের ঘটনায় থানায় মামলা হওয়ায় সাভার থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মাহবুব হোসেন সামিরকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

তবে এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্তদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


ছাত্রদল ঢাকা জেলা উত্তরের সাধারণ সম্পাদক মাহফুজ ইকবাল বলেন, থানায় এফআইআর হওয়ায় কেন্দ্রের নির্দেশে মাহবুব হোসেন সামিরকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এ ব্যাপারে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়া গেলে বহিষ্কার আদেশ প্রত্যাহার করা হতে পারে।

সাভার থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নূর মোহাম্মদ বলেন, অভিযোগের প্রেক্ষিতে সামিরসহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে শুক্রবার (২৬ জুন) রাতে মামলা হয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
 

 

সর্বাধিক পঠিত