বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬, ১২:০০ রাত
MENU
#
নকল তালাকনামা তৈরির ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি
daily-fulki

নকল তালাকনামা তৈরির ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি


বিবাহ ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও ধর্মীয় বন্ধন। আল্লাহ তাআলা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে ভালোবাসা, দয়া ও প্রশান্তির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।


কিন্তু কখনো কখনো বিভিন্ন প্রশাসনিক, আইনি বা পারিবারিক প্রয়োজনে কিছু মানুষ ‘কৃত্রিম’ বা ‘নকল’ তালাকনামা প্রস্তুত করার চিন্তা করেন। অনেকেই মনে করেন, যেহেতু প্রকৃতপক্ষে তালাক দেওয়ার উদ্দেশ্য নেই, তাই এমন কাগজপত্র তৈরি করলেও কোনো সমস্যা হবে না। অথচ ইসলামী শরিয়তে তালাক একটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়; এখানে অসাবধানতা, রসিকতা কিংবা বাহ্যিক অভিনয়ও অনেক সময় বাস্তব তালাকের কারণ হয়ে যেতে পারে। তাই কৃত্রিম তালাকনামা তৈরি করার আগে শরিয়তের বিধান জানা অত্যন্ত জরুরি।

অন্যথায় একটি কাগজে স্বাক্ষর করার মাধ্যমে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বৈবাহিক সম্পর্ক চিরতরে নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
বিশেষ সতর্কবাণী
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর বিধানসমূহকে উপহাসের বস্তু বানিও না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৩১)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, বিবাহ ও তালাকের মতো শরিয়তের গুরুত্বপূর্ণ বিধান নিয়ে খেলা করা বা তামাশা করা বৈধ নয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তিনটি বিষয় এমন যে, এগুলোর বাস্তব কথাও বাস্তব এবং ঠাট্টা-তামাশার কথাও বাস্তব—বিবাহ, তালাক ও রুজু (স্ত্রীকে এক তালাকে রজয়ি দেয়ার পর ফিরিয়ে নেওয়া)।


’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২১৯৪, তিরমিজি, হাদিস : ১১৮৪)
এই হাদিস প্রমাণ করে যে তালাকের ক্ষেত্রে ‘আমি সত্যি চাইনি’—এমন অজুহাত সবসময় গ্রহণযোগ্য নয়।

নকল তালাকনামা কী?
নকল তালাকনামা বলতে এমন দলিলকে বোঝায়, যা প্রকৃত তালাক দেওয়ার উদ্দেশ্যে নয়; বরং কোনো প্রশাসনিক, আইনি বা অন্য কোনো পার্থিব সুবিধা অর্জনের জন্য প্রস্তুত করা হয়। কিন্তু ইসলামী ফিকহের দৃষ্টিতে প্রশ্ন হলো—এমন দলিল লিখলে বা স্বাক্ষর করলে কি তালাক সংঘটিত হবে?

নকল তালাকনামা প্রস্তুত করলে কখন তালাক হবে না?
ফুকাহায়ে কেরামের বর্ণনা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি দুজন সাক্ষীকে উপস্থিত রেখে স্পষ্টভাবে বলে—‘আমি প্রকৃত তালাক দেওয়ার জন্য নয়; বরং একটি কৃত্রিম বা নকল তালাকনামা প্রস্তুত করছি।’ তাহলে সাক্ষীদের উপস্থিতিতে তার এই বক্তব্য প্রমাণিত থাকবে এবং এ অবস্থায় তালাক কার্যকর হবে না। কারণ সাক্ষীরা পরবর্তীতে সাক্ষ্য দিতে পারবেন যে, তার উদ্দেশ্য প্রকৃত তালাক ছিল না; বরং শুধু একটি আনুষ্ঠানিক কাগজ প্রস্তুত করা ছিল।


অন্যথায় সাক্ষী ছাড়া কৃত্রিম তালাকনামা তৈরি করলে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি রয়েছে।
যদি কেউ কোনো সাক্ষী ছাড়া তালাকনামা লিখায়, অথবা নিজে পড়ে স্বাক্ষর করে এবং তাতে তালাকের শব্দ উল্লেখ থাকে, তাহলে ইসলামী ফিকহ অনুযায়ী তা বাস্তব তালাক হিসেবে গণ্য হতে পারে। বিশেষত যদি—
সে নিজেই দলিল প্রস্তুত করার নির্দেশ দেয়, অথবা দলিলটি পড়ে স্বাক্ষর করে, অথবা পরে স্বীকার করে যে দলিলটি তার নির্দেশে প্রস্তুত হয়েছে। তাহলে তালাকনামায় যত তালাক লেখা থাকবে, তত তালাকই সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। ইমাম ইবন আবেদীন রহ. বলেন, ‘যদি কেউ লেখককে বলে, ‘লিখো যে আমার স্ত্রী তালাকপ্রাপ্তা’, তবে লেখক তা না লিখলেও এই বক্তব্য তালাকের স্বীকৃতি হিসেবে গণ্য হবে।’ (রাদ্দুল মুহতার, ৩/২৪৬)

আরো বলা হয়েছে, ‘যে দলিল নিজের হাতে লেখা নয় এবং নিজে বলে দেওয়াও হয়নি, তা তালাক হিসেবে গণ্য হবে না; যতক্ষণ না ব্যক্তি তা নিজের বলে স্বীকার করে।’ (রাদ্দুল মুহতার, ৩/২৪৭)
‘আর যদি কেউ মিথ্যা ঘোষণা করার উদ্দেশ্যে বলে, ‘তোমাকে তালাক দেওয়া হলো’, তাহলে সাক্ষীরা তার প্রকৃত উদ্দেশ্যের সাক্ষ্য না দেওয়া পর্যন্ত আইনগতভাবে তালাক কার্যকর বলে বিবেচিত হবে।’ (আদ-দুররুল মুখতার, ৩/২৯৩)

‘যদি সে দাবি করে যে, ‘আমি শুধু ভয় দেখানোর জন্য এমন করেছি’, তবে পূর্বে সাক্ষ্য প্রতিষ্ঠিত না হলে তার এ দাবি গ্রহণ করা হবে না।’ (আদ-দুররুল মুখতার, ৪/৪৬০)

এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
১. তালাক নিয়ে খেলাধুলা করা হারাম
তালাক শরিয়তের একটি গুরুতর বিধান। এটি নিয়ে অভিনয়, প্রতারণা বা অসতর্ক আচরণ করা বৈধ নয়।

২. মিথ্যা দলিল তৈরি করা গুনাহ
যদি কৃত্রিম বা নকল তালাকনামা কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রকে ধোঁকা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়, তাহলে তা প্রতারণার অন্তর্ভুক্ত হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১০১

৩. বিশেষজ্ঞ আলেমের পরামর্শ ছাড়া এমন পদক্ষেপ নেওয়া বিপজ্জনক
অনেক সময় একটি শব্দ, একটি স্বাক্ষর বা একটি বাক্যই বৈবাহিক সম্পর্কের ওপর স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। তাই অভিজ্ঞ মুফতি বা নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ ছাড়া এ ধরনের কাজ করা উচিত নয়।

অতএব, কৃত্রিম বা নকল তালাকনামা প্রস্তুত করার বিষয়টি সাধারণ মানুষের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ। ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে তালাক শুধু একটি কাগজের বিষয় নয়; বরং এটি একটি পরিবার, একটি সম্পর্ক এবং বহু অধিকার-দায়িত্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত গুরুতর বিধান। তাই কোনো কোনো ক্ষেত্রে নকল তালাকনামা প্রস্তুত করতে গিয়ে বাস্তব তালাক সংঘটিত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তাই কেউ যদি বিশেষ কোনো কারণে কৃত্রিম বা নকল তালাকনামা প্রস্তুত করতেই বাধ্য হয়, তবে অবশ্যই শরিয়তের বিধান অনুযায়ী দুজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে নিজের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে তা করবে। আর ইতোমধ্যে কোনো তালাকনামা প্রস্তুত হয়ে থাকলে, তালাক সংঘটিত হয়েছে কি না—সে বিষয়ে অভিজ্ঞ মুফতি বা দারুল ইফতার সঙ্গে যোগাযোগ করে বিস্তারিত মাসআলা জেনে নেওয়া আবশ্যক। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বিবাহ ও তালাকের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সচেতনতা, তাকওয়া এবং শরিয়তের সীমারেখা মেনে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।

 

সর্বাধিক পঠিত