স্টাফ রিপোর্টার : বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ‘উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে’ গত ৩ মার্চ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন এবং দুই কমিশনার মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহ্সান ফরিদ পদত্যাগ করেন। এরপর তিন মাসের বেশি সময় পার হলেও গঠন হয়নি নতুন কমিশন। এতে স্থবির হয়ে আছে দুদকের সব কার্যক্রম। এই সময়ে প্রায় ৭ হাজার অভিযোগ জমা পড়েছে দুদকের পত্র গ্রহণ ও প্রেরণ শাখায়। তবে কমিশন না থাকায় এসব অভিযোগ পড়ে আছে চেয়ারম্যানের দপ্তরে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অনুসন্ধান, তদন্ত, মামলা রুজু কিংবা চার্জশিট— দুদকের গুরুত্বপূর্ণ এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার একমাত্র ক্ষমতা কমিশনের হাতে। দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটিতে গড়ে প্রতিদিন ৮০ থেকে ১২০টি অভিযোগ আসে। এসব অভিযোগ যাচাই-বাছাইয়ের পর অনুসন্ধানের অনুমোদনও নিতে হয় কমিশন থেকে। ফলে কমিশন নিয়োগ যত বিলম্বিত হবে, অভিযোগের স্তূপ তত উঁচু হবে। এরই মধ্যে কমিশনে প্রায় ৭ হাজার অভিযোগ জমা পড়ে আছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একাধিক উপদেষ্টাসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী আমলা, রাজনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ী।
আরও জানা যায়, দুদকের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা চলমান মামলার তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিকে আসামি করে সুপারিশ পেশ করা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে। আসামি করা হয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়বকেও। তিনি এখন দেশের বাইরে আছেন। এ ছাড়া পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়ে আছে। কমিশন না থাকায় এসব প্রতিবেদন আদালতে জমা দিয়ে মামলার বিচারকার্য শুরু করা যাচ্ছে না।
কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন করে অনুসন্ধান ও তদন্ত শুরু না হওয়ায় পুরোনো মামলা ও অনুসন্ধানের কাজ করছেন তারা। অনেক মামলার তদন্ত ও অনুসন্ধান প্রতিবেদন তারা এই সময়ে তৈরি করে রাখছেন, যাতে কমিশন গঠনের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
হচ্ছে না অভিযান, কাজ নেই এনফোর্সমেন্ট টিমের: দুর্নীতির অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা যাচাই এবং জনসেবায় অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ কিংবা গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে কমিশনের অনুমোদন নিয়ে এই টিম মাঠে অভিযান পরিচালনা করে। এ ছাড়া দুদকের টোল-ফ্রি হটলাইন নম্বর ১০৬-এর মাধ্যমেও ভুক্তভোগীরা অভিযোগ জানাতে পারেন। সেক্ষেত্রে অভিযোগের গুরুত্ব অনুধাবন করে প্রয়োজন হলে তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করে কমিশন। সাধারণত দুদকের সহকারী পরিচালক, উপপরিচালক বা অন্যান্য কর্মকর্তার সমন্বয়ে গঠিত টিম সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা দপ্তরে গিয়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, নথিপত্র পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে কথা বলে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা যাচাই করে। হাসপাতাল, ভূমি অফিস, বিআরটিএ, পাসপোর্ট অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত অভিযান চালায় দুদক। তবে সবক্ষেত্রেই প্রয়োজন করে পড়ে কমিশনের অনুমোদন। এখন কমিশন না থাকায় এনফোর্সমেন্ট টিমের সদস্যরা অলস সময় পাড় করছেন।
থমকে আছে মামলার তদন্ত, অনুসন্ধান: খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যাচাই-বাছাই কমিটি থেকে প্রাপ্ত নতুন অভিযোগ সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত নেওয়া ও অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা নিয়োগের অনুমোদন নিতে হয় কমিশন থেকে। গত ৩ মার্চ পুরো কমিশন পদত্যাগ করায় নতুন করে আর কোনো অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু হয়নি। অনুসন্ধান শেষে সংশ্লিষ্ট অভিযোগের তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে মামলা দায়ের করে দুদক। মামলা দায়েরের অনুমোদন নিতে হয় কমিশন থেকে। এরপর মামলার তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট জমা দেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। তবে চার্জশিট দাখিলের আগেও অনুমোদন নিতে হয় কমিশন থেকে। অনুসন্ধান ও তদন্ত চলাকালীন অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের খোঁজ পেলে এবং সেসব সম্পদ হাতবদল হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে, সেগুলো জব্দ করে দুদক। অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে তার বিদেশে যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
আইন অনুযায়ী, দুদক থেকে প্রথমে প্রশাসনিক আদেশ দিয়ে ইমিগ্রেশন ব্লক করে কোর্টের মাধ্যমে আদেশ করা হয়। সবকিছুরই অনুমোদন নিতে হয় কমিশন থেকে। ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের সংক্রান্ত অনুমোদনও দেওয়া হয় কমিশন থেকে। এ ছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বৈদেশিক প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের অনুমোদন করে কমিশন। গত ৩ মার্চ থেকে কমিশন না থাকায় বন্ধ হয়ে আছে দুদকের অতি গুরুত্বপূর্ণ এসব কাজ। ফলে স্থবির হয়ে পড়ে আছে সংস্থাটি।
কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া শুরু : দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৪’ অনুযায়ী নতুন কমিশন গঠনের লক্ষ্যে বাছাই কমিটি (সার্চ কমিটি) গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এজন্য গত ২৪ মে প্রধান বিচারপতিকে চিঠি দিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের দুজন বিচারপতি মনোনীত করতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। আইন অনুযায়ী, সার্চ কমিটিতে থাকবেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি, হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতি, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি), মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সদ্য বিদায়ী সচিব এবং সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ জানিয়েছে, এই সার্চ কমিটি কমিশনের জন্য যোগ্য ছয়জন প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত করে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাবে। পরে রাষ্ট্রপতি তাদের মধ্য থেকে তিনজনকে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেবেন এবং তাদের মধ্য থেকে একজনকে চেয়ারম্যান করা হবে।
এদিকে দুদক পুনর্গঠনের জন্য নাম সুপারিশ করতে যে কোনো সময় সার্চ কমিটি গঠন করা হবে বলে গত সোমবার সংসদকে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, ‘হয়তো আপনারা মনে করেন সরকার আন্তরিক নয়। কিন্তু সরকার আন্তরিক ছিল। সার্চ কমিটি গঠন করা হবে এবং দুর্নীতি দমন কমিশন পুনর্গঠন করা হবে।’
এ বিষয়ে দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মুহাম্মদ মুনির চৌধুরী‘কমিশন পুর্নগঠন করা খুবই প্রয়োজন। আমার অনুরোধ থাকবে—কোনো বিশেষ ক্যাডারকে প্রাধান্য দিয়ে নয়; বরং ক্যাডার, সার্ভিস বাহিনী কিংবা বিভাগ যেখানেই হোক এমন লোককে খুঁজে বের করতে হবে, যার পুরো সার্ভিস জীবনে কোনো কলঙ্ক নেই। কলঙ্কমুক্ত, দৃঢ়চেতা, চৌকস, নির্লোভ ও ব্যক্তিত্ববান কর্মকতাদের এখানে নিয়োগ দিতে হবে। সেইসঙ্গে দুদককে চাপমুক্ত ও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। তাহলেই দুর্নীতি কমবে। বাংলাদেশের দুর্নীতি যদি ৩০ থেকে ৪০ শতাংশও হ্রাস করা যায় তাহলে দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
দুদক কর্মকর্তারা যা বলছেন: সংস্থাটির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, দুদকের সব ক্ষমতা কমিশনের হাতে। যে কারণে কমিশন ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তই নেওয়া যায় না। এ ক্ষেত্রে দুদকের সচিব ও মহাপরিচালকদের হাতে কিছু সুনির্দিষ্ট বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া উচিত। যাতে কমিশনে কোনো ধরনের শূন্যতা তৈরি হলে মহাপরিচালকরা সংস্থাটিকে চালিয়ে নিতে পারেন।
কমিশনের আরেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, কমিশন না থাকায় জনগণ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ব্যক্তি ও রাষ্ট্র সবাই সাফার করছে। তিনি আরও বলেন, দুর্নীতি হয় উন্নয়ন প্রকল্পে। কমিশন না থাকায় অভিযান চালানো বা ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। মামলা অনুমোদন, অনুসন্ধান শুরু, সম্পদ জব্দ, স্টোলেন অ্যাসেট উদ্ধারে আন্তঃরাষ্ট্রীয় যোগাযোগ—সব ব্যাহত হচ্ছে। এ ছাড়া অনেক আসামি জামিনে বের হয়ে দেশ থেকে পালিয়ে যাচ্ছেন। আপিল করা যাচ্ছে না। অনেক অবৈধ সম্পদের হাত বদল হয়ে যাচ্ছে, সেগুলো ফ্রিজ বা ক্রোকও করা যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে কমিশন না থাকায় দুর্নীতিবাজদের জন্য সুষম সময় যাচ্ছে।
জানতে চাইলে দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকতারুল ইসলাম বলেন, ‘নতুন কোনো অনুসন্ধান কিংবা চার্জশিট প্রদানে কমিশনের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হয়। যে কারণে কমিশন না থাকায় দুদকের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বা হবে—এটাই স্বাভাবিক। তবে আমাদের কর্মকর্তারা বসে নেই। তারা তাদের দায়িত্বে থাকা অনুসন্ধান ও মামলার তদন্ত কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
