স্টাফ রিপোর্টার : সাভার পৌরসভার উলাইল এলাকার আল-মুসলিম গ্রুপের ছাঁটাইকৃত শ্রমিকরা বকেয়া পাওনা ও চাকরিতে পুনর্বহালের দাবিতে কারখানার সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন। আজ শনিবার (৬ জুন) সকাল থেকে আল-মুসলিম গ্রুপের ‘একেএম নিটওয়্যার লিমিটেড’ কারখানার সামনে কয়েকশত বিক্ষুব্ধ শ্রমিক জড়ো হতে শুরু করেন। একপর্যায়ে শ্রমিকরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ঢাকামুখী সার্ভিস লেন প্রায় দেড় ঘণ্টা অবরোধ করে রাখেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ও যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে কারখানা এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। কারখানার মূল ফটকের সামনে শিল্প পুলিশের সাঁজোয়া যান (এপিসি) ও জলকামান প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এর আগে গত শুক্রবার রাতে কারখানা কর্তৃপক্ষ সাভারে কর্মরত কিছু গণমাধ্যমকর্মীকে অফিসে ডেকে নিয়ে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের বিষয়টি অবহিত করেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, আজ শনিবার সকাল ৮টার দিকে ছাঁটাইকৃত শ্রমিকরা উলাইল এলাকায় কারখানার সামনে এসে অবস্থান নেন। কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া না পেয়ে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ঢাকামুখী সার্ভিস লেনে অবস্থান নেন। এর ফলে মহাসড়কের ওই লেনে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে শিল্প পুলিশ ও থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে শ্রমিকদের বুঝিয়ে মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দিলে প্রায় দেড় ঘণ্টা পর যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া একাধিক শ্রমিক অভিযোগ করে বলেন, কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই আমাদের ছাঁটাই করেছে। আমাদের অনেকেরই ন্যায্য পাওনাদি এখনো পরিশোধ করা হয়নি। এই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে হঠাৎ চাকরি হারিয়ে আমরা পরিবার নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছি। আমাদের হয় চাকরিতে পুনর্বহাল করতে হবে, না হয় আইনানুযায়ী সমস্ত বকেয়া পাওনা এককালীন বুঝিয়ে দিতে হবে।
কারখানার অপারেটর সালমা আক্তার বলেন, ২০১৭ সাল থেকে এই কারখানায় কাজ করছি। হঠাৎ করেই কোনো নোটিশ ছাড়াই আমাদেরকে ছাঁটাই করেছে। বাসা ভাড়া, সন্তানের লেখাপড়ার খরচ-সব মিলিয়ে হঠাৎ চাকরি চলে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছি। নিয়ম অনুযায়ী তিন মাসের টাকা দিয়ে ছাঁটাই করার কথা থাকলেও তারা আমাকে মাত্র এক মাসের টাকা দিয়েছে।
১৩ বছর ধরে এই কারখানায় সুইং অপারেটর হিসেবে কর্মরত আফানুর জানান, হঠাৎ মোবাইলে মেসেজ পাঠিয়ে তাঁকে ছাঁটাই করা হয়েছে। শনিবার (৬ জুন) সকালে কাজে এলে কর্তৃপক্ষ কারখানায় ঢুকতে দেয়নি। একই ধরনের অভিযোগ করেন ৭ বছর ধরে কর্মরত রোজিনা আক্তার, ২ বছর ৫ মাস ধরে কর্মরত মো. রকিবুল্লাহ এবং ট্রেনিং সেন্টার থেকে সদ্য লাইনে আসা আছিয়া আক্তার। তাঁদের অভিযোগ, তিন মাস ১৩ দিনের পাওনা দিয়ে ছাঁটাই করার নিয়ম থাকলেও কারখানা কর্তৃপক্ষ তা মানেনি।
বর্তমানে উলাইল এলাকায় আল-মুসলিম গ্রুপের সামনের পরিস্থিতি থমথমে থাকলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারির কারণে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
শিল্প পুলিশের পরিদর্শক রেফায়েত উল্লাহ চৌধুরী বলেন, শ্রমিকরা মহাসড়কের সার্ভিস লেন অবরোধ করার চেষ্টা করলে আমরা তাদের বুঝিয়ে রাস্তা থেকে সরিয়ে দিই। শ্রমিকদের দাবি, তাদের পাওনাদি ঠিকমতো না দিয়েই ছাঁটাই করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এবং কারখানার নিরাপত্তায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি জলকামান ও সাঁজোয়া যান প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
এই বিষয়ে আল-মুসলিম গ্রুপের উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. আবু রায়হান বলেন, ব্যবসায়িক মন্দা ও তৈরি পোশাকের ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় শ্রম আইনের ২০ ধারায় শ্রমিকদের পাওনাদি পরিশোধ করেই ছাঁটাই করা হয়েছে। কারখানা পলিসি মেনেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, শ্রমিকদের অভিযোগ সঠিক নয়। তবে কোনো শ্রমিকের যদি পাওনা টাকা নিয়ে জটিলতা থাকে, তাহলে তারা যোগাযোগ করলে আমরা যাচাই করে তা পরিশোধ করে দেবো।
প্রসঙ্গত, দেশের শীর্ষস্থানীয় তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান 'আল-মুসলিম গ্রুপ' তাদের তিনটি কারখানার মোট ১ হাজার ৮৬৮ জন কর্মীকে ছাঁটাই করেছে। ছাঁটাইকৃত শ্রমিকের মধ্যে সাভার পৌর এলাকার উলাইল এলাকার ‘একেএম নিটওয়্যার লিমিটেড’ কারখানা থেকে ১ হাজার ২৮৬ জন, রেডিও কলোনি এলাকার ‘প্যাসিফিক ব্লু জিন্স ওয়্যার’ কারখানার ৫২৯ জন এবং আশুলিয়ায় অবস্থিত ‘আল-মুসলিম অ্যাপারেলস’ কারখানার ৫৩ জন কর্মী রয়েছেন।
