শনিবার, ৬ জুন ২০২৬, ১২:০০ রাত
MENU
#
হজ কবুল হওয়ার ১০ আলামত
daily-fulki

হজ কবুল হওয়ার ১০ আলামত


ফুলকি ডেস্ক ; হজ ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম একটি মহান ইবাদত। এটি শুধু কিছু আনুষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডের সমষ্টি নয়; বরং জীবনের এক আমূল পরিবর্তনের নাম।


একজন মুসলিম যখন আল্লাহর ঘরের মেহমান হয়ে লাখো মানুষের সঙ্গে একই পোশাকে, একই স্থানে, একই রবের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের গুনাহের জন্য কান্নাকাটি করে, তখন তার অন্তরে এক নতুন জাগরণ সৃষ্টি হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন হাজি কিভাবে বুঝবেন যে তাঁর হজ আল্লাহর দরবারে কবুল হয়েছে?

হজ কবুল হওয়ার প্রকৃত সংবাদ একমাত্র আল্লাহ তাআলাই জানেন।


পৃথিবীর কোনো মানুষ নিশ্চিতভাবে বলতে পারে না যে তার বা অন্য কারো হজ কবুল হয়েছে কি না। তবে কোরআনে এমন কিছু বর্ণনা পাওয়া যায়, যা একজন বান্দার হজ কবুল হওয়ার সুসংবাদ বহন করে।
আর হজের পর যদি মানুষের ঈমান, চরিত্র, আমল, চিন্তা-চেতনা ও জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসে, তবে তা কবুলিয়তের অন্যতম লক্ষণ হিসেবে গণ্য হয়। নিচে হজ কবুল হওয়ার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আলামত আলোচনা করা হলো—

১. ঈমান ও আমল বৃদ্ধি পাওয়া : হজ কবুল হওয়ার অন্যতম বড় আলামত হলো মানুষের ঈমান আরো শক্তিশালী হওয়া এবং ইবাদতের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়া।

হজের আগে যে ব্যক্তি নামাজে অলসতা করত, কোরআন তিলাওয়াত থেকে দূরে থাকত কিংবা বিভিন্ন নেক আমলে অনাগ্রহী ছিল, হজের পর তার মধ্যে যদি ইবাদতের প্রতি গভীর ভালোবাসা সৃষ্টি হয়, তবে এটি কবুলিয়তের একটি মহা লক্ষণ। কেননা কবুল হজ মানুষকে আল্লাহর আরো নিকটবর্তী করে এবং তার হৃদয়ে তাকওয়ার আলো জ্বালিয়ে দেয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যারা সৎপথ অবলম্বন করেছে, আল্লাহ তাদের হেদায়েত আরো বৃদ্ধি করে দেন এবং তাদের তাকওয়া দান করেন।’ (সুরা : মুহাম্মাদ, আয়াত : ১৭)

২. দুনিয়ার মোহ কমে যাওয়া এবং আখিরাতমুখী হওয়া: হজের প্রতিটি অনুষঙ্গ মানুষকে মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ইহরামের সাদা কাপড় যেন কাফনের কথা মনে করিয়ে দেয়, আর আরাফাতের ময়দান যেন হাশরের মাঠের প্রতিচ্ছবি। তাই হজ কবুল হলে মানুষের হৃদয়ে দুনিয়ার চাকচিক্যের প্রতি আকর্ষণ কমে যায় এবং আখিরাতের সফলতার প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। তার চিন্তা-চেতনা, পরিকল্পনা ও জীবনের লক্ষ্য ধীরে ধীরে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের দিকে ধাবিত হয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘দুনিয়ার জীবন তো প্রতারণার সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৮৫)

৩. গুনাহ ও অন্যায় থেকে সম্পূর্ণরূপে ফিরে আসা : হজ কবুল হওয়ার সবচেয়ে স্পষ্ট আলামত হলো পাপমুক্ত জীবনযাপনের চেষ্টা করা। যে ব্যক্তি হজের আগে সুদ, ঘুষ, মিথ্যা, গিবত, অশ্লীলতা, হারাম উপার্জন বা অন্য কোনো গুনাহে জড়িত ছিল, হজের পর যদি সেসব থেকে আন্তরিকভাবে তাওবা করে দূরে সরে আসে, তবে এটি কবুলিয়তের শক্তিশালী নিদর্শন। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি হজ করল এবং অশ্লীলতা ও গুনাহ থেকে বিরত থাকল, সে এমন অবস্থায় ফিরে আসে যেমন তার মা তাকে জন্ম দিয়েছিল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৫২১)

৪. নিজের আমলকে তুচ্ছ মনে করা: কবুল হজের একটি সূক্ষ্ম আলামত হলো মানুষ নিজের আমল নিয়ে অহংকার না করে বরং তা অপ্রতুল মনে করে। হজ থেকে ফিরে কেউ যদি বলতে শুরু করে, ‘আমি হজ করেছি’, তাহলে এটা হবে খুব জঘন্য বিষয়। কেননা আল্লাহ বলেন, ‘আর তারা যা কিছু দান করে (এবং নেক আমল করে), তা করে এমন অবস্থায় যে তাদের অন্তর ভীতসন্ত্রস্ত থাকে, কারণ তারা তাদের প্রতিপালকের নিকট ফিরে যাবে।’ (সুরা: মুমিনুন, আয়াত : ৬০)

৫. আমল কবুল না হওয়ার ভয় হওয়া: সালাফে সালেহিনরা নেক আমল করার চেয়ে আমল কবুল হওয়ার ব্যাপারে বেশি উদ্বিগ্ন থাকতেন। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা শুধু মুত্তাকিদের আমল কবুল করেন।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ২৭)

৬. কবুল হওয়ার আশা নিয়ে বেশি বেশি দোয়া করা : ভয়ের পাশাপাশি মুমিনের অন্তরে আশা থাকাও জরুরি। কারণ আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া মুমিনের কাজ নয়। কাবা শরিফ নির্মাণের মতো মহান কাজ সম্পন্ন করার পরও ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাঈল (আ.) দোয়া করেছিলেন, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আমাদের পক্ষ থেকে (আমাদের আমলগুলো) কবুল করে নিন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১২৭)

৭. বেশি পরিমাণে ইস্তিগফার করা: ইবাদত শেষ হওয়ার পর ইস্তিগফার করা নবী-রাসুলদের সুন্নাহ। কেননা কবুল হজ মানুষকে আরো বেশি বিনয়ী করে এবং সে উপলব্ধি করে যে তার ইবাদতে নিশ্চয়ই বহু ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়ে গেছে। তাই সে বেশি বেশি তাওবা ও ইস্তিগফারে মনোযোগী হয়। আল্লাহ তাআলা হজের আমল বর্ণনার শেষে বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৯৯)

৮. নেক আমলের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা : একটি নেক আমল কবুল হওয়ার অন্যতম আলামত হলো তার মাধ্যমে আরেকটি নেক আমলের পথ খুলে যাওয়া। হজের পর যদি কেউ নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা, দ্বিনি শিক্ষা অর্জন, দাওয়াত ও খিদমতের কাজে আগের চেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে যায়, তবে এটি তার হজের ইতিবাচক প্রভাব এবং কবুলিয়তের সুসংবাদ বহন করে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ যখন কোনো বান্দার কল্যাণ চান, তখন তাকে নেক আমলের তাওফিক দান করেন।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিভাবে?’ তিনি বললেন, ‘মৃত্যুর আগে তাকে একটি সৎ কাজ করার তাওফিক দেন, তারপর সেই অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটান।’ (মুসনাদ আহমাদ, হাদিস : ১৭৭৭৮)

৯. মানুষের হক আদায়ে সচেতন হওয়া: হজ কবুল হওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আলামত হলো মানুষের অধিকার আদায়ের ব্যাপারে যত্নবান হয়ে ওঠা। সে কারো টাকা-পয়সা, সম্পদ, সম্মান বা অধিকার নষ্ট করে না; বরং অতীতের অন্যায়ের জন্য ক্ষমা চায় এবং মানুষের হক ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। কারণ আল্লাহর হক তাওবার মাধ্যমে মাফ হতে পারে, কিন্তু বান্দার হক আদায় বা ক্ষমা না নেওয়া পর্যন্ত মুক্তি পাওয়া কঠিন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন যে তোমরা আমানতসমূহ তাদের প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দাও।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৮)

১০. উত্তম চরিত্র ও নম্রতা অবলম্বন করা : কবুল হজ মানুষের আচার-আচরণে সৌন্দর্য নিয়ে আসে। সে ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করে, মানুষের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করে, অহংকার ত্যাগ করে এবং নম্রতা ও বিনয়ের পরিচয় দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর রহমানের বান্দা তারা, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং যখন অজ্ঞ লোকেরা তাদের সম্বোধন করে, তখন তারা শান্তিপূর্ণ কথা বলে।’ (সুরা : ফুরকান, আয়াত : ৬৩)

অতএব, হজের প্রকৃত সফলতা ‘হাজি’ উপাধি লাভে নয়; বরং হজের মাধ্যমে অন্তরের পরিবর্তনে। যে হজ মানুষের জীবনকে আল্লাহমুখী করে, গুনাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, নেক আমলের প্রতি আগ্রহী করে, বিনয়ী ও আখিরাতমুখী বানায়—সেই হজই মাকবুল হজ হওয়ার আশা করা যায়। তাই হজ সম্পন্ন করার পর একজন মুমিনের সর্ববৃহৎ চিন্তা হওয়া উচিত ‘আমি হজ করেছি’ এ কথা প্রচার করা নয়; বরং ‘আমার হজ কি আল্লাহর কাছে কবুল হয়েছে?’ এই ভাবনায় নিজেকে সংশোধন করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবার হজ, ওমরাহ ও নেক আমল কবুল করুন। আমিন।

 

সর্বাধিক পঠিত