মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬, ১২:০০ রাত
MENU
#
ভ্যাট-শুল্ক বাড়ানোর উদ্যোগ অর্ধশত পণ্যে
daily-fulki

ভ্যাট-শুল্ক বাড়ানোর উদ্যোগ অর্ধশত পণ্যে


স্টাফ রিপোর্টার : আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রায় অর্ধশত পণ্য ও সেবায় মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সরকারের লক্ষ্য রাজস্ব আয় বাড়িয়ে অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে সরকারি ব্যয় সক্ষমতা জোরদার করা হলেও অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন, এই বাড়তি করের চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরই পড়তে পারে।


অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চাল, গম, ভোজ্যতেল, আলু, পিঁয়াজ, রসুন, মাছ, মাংস, চিনি ও চায়ের মতো নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যে উৎসে কর বিদ্যমান ০ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১ শতাংশ করার চিন্তা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যাটারিচালিত রিকশা, উচ্চ সিসির মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর অগ্রিম আয়করও বাড়তে পারে। এ ছাড়া অনলাইন মার্কেটিং এজেন্টদের কমিশনের ওপর ভ্যাট ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। প্লাস্টিক পণ্যে ভ্যাট ৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ এবং নির্মাণ খাতে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।


কর্মকর্তাদের ভাষ্য, অধিক রাজস্ব আহরণের মাধ্যমে সরকারের উন্নয়ন ও পুনরুদ্ধার কর্মসূচিতে অর্থায়ন নিশ্চিত করাই এসব পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য। তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে বিপর্যস্ত জনগণের জন্য নতুন করে পরোক্ষ করের বোঝা উদ্বেগজনক হতে পারে। গত তিন বছর ধরে দুই অঙ্কের মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্য নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করেছে।


বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক বলেন, মানুষ নতুন অর্থবছরে স্বস্তি প্রত্যাশা করছে। তাই কর ও ভ্যাট নীতিমালা এমনভাবে প্রণয়ন করতে হবে, যাতে তা জনগণের জন্য সহনীয় হয়। সরকারের নতুন বাজেটে এনবিআরের জন্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২০ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা ভ্যাট থেকে এবং ৬৭ হাজার কোটি টাকা শুল্ক থেকে আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজস্ব আহরণে সরকারের অতিরিক্ত পরোক্ষ কর নির্ভরতা আয় বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।


গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, পরোক্ষ করের বোঝা মূলত গরিব মানুষের ওপর বেশি পড়ে, অথচ ধনীরা তুলনামূলক কম চাপ অনুভব করেন। এতে আয় বৈষম্য আরও গভীর হয়।
তিনি জানান, দেশের গিনি সহগ ২০১০ সালের ০ দশমিক ৪৫৮ থেকে বেড়ে ২০২২ সালে ০ দশমিক ৪৯৯৯-এ দাঁড়িয়েছে, যা সম্পদ বণ্টনে বৈষম্য বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।

এদিকে এনবিআর নতুন অর্থবছর থেকে ভ্যাট ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার আনার পরিকল্পনা করছে। বর্তমানে দেশে ভ্যাট নিবন্ধিত করদাতার সংখ্যা প্রায় আট লাখ হলেও আগামী চার বছরে তা এক কোটিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এনবিআরের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, ভ্যাট ফাঁকি রোধে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হবে এবং করজাল সম্প্রসারণে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নীতি ও বাস্তবায়ন ঘাটতি দূর করা গেলে বর্তমানের তুলনায় তিন গুণের বেশি ভ্যাট আদায়ের সুযোগ রয়েছে। তবে কর প্রশাসনের দুর্বলতা, দুর্নীতি ও কর অব্যাহতির সংস্কৃতির কারণে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ২০১১ সালের ৯ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমে ২০২৪ সালে ৭ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, প্রত্যক্ষ কর ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে এনবিআর প্রতি বছরই পরোক্ষ করের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

এদিকে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ভ্যাটের সবচেয়ে বড় চাপ পড়ে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর। অক্সফাম বাংলাদেশের সহায়তায় প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, দরিদ্র মানুষের আয়ের ১২ দশমিক ১ শতাংশ ভ্যাট হিসেবে ব্যয় হয়, যেখানে ধনীদের  ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৫ দশমিক ৯ শতাংশ।  কারণ মোবাইল ফোন, ওষুধ, গ্যাস, বিদ্যুৎসহ দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্য ও সেবার দামেই ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত থাকে। অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর প্রয়োজন থাকলেও তা যেন জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে না দেয়, সেদিকে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে।

 

সর্বাধিক পঠিত