রবিবার, ২৪ মে ২০২৬, ১২:০০ রাত
MENU
#
কুরবানি কবুল না হওয়ার কারণ: ৫টি ভয়াবহ ভুল
daily-fulki

কুরবানি কবুল না হওয়ার কারণ: ৫টি ভয়াবহ ভুল

 


কুরবানি ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতগুলোর একটি। তবে কুরবানি শুধুমাত্র পশু জবাই করার নাম নয়; এটি আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, আনুগত্য, তাকওয়া ও আত্মত্যাগের এক মহান শিক্ষা। বাহ্যিক চাকচিক্য, বড় পশু কিংবা লোক দেখানো আয়োজন আল্লাহর কাছে মূল্যবান নয়; বরং মূল্যবান হলো বান্দার অন্তরের বিশুদ্ধতা ও একনিষ্ঠ নিয়ত।

পবিত্র কোরআনে কুরবানির আসল উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে আল্লাহ তাআলা বলেন-

لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَٰكِن يَنَالُهُ التَّقْوَىٰ مِنكُمْ

‘আল্লাহর কাছে পৌঁছে না তার গোশত কিংবা রক্ত; বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা আল-হজ্জ: আয়াত ৩৭)

 

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, কুরবানির মূল বিষয় পশুর দাম, আকার বা মাংসের পরিমাণ নয়; বরং বান্দার অন্তরের তাকওয়া। তাই কুরবানির আগে প্রত্যেক মুসলমানের আত্মসমালোচনা করা জরুরি-আমার কুরবানি কি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, নাকি মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য?

 

গর্ব ও অহংকার থেকে বেঁচে থাকা জরুরি

বর্তমান সমাজে অনেক সময় কুরবানি নিয়ে অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতা দেখা যায়। কে কত বড় গরু কিনল, কার পশুর দাম বেশি, কার আয়োজন বেশি-এসব নিয়ে গর্ব ও অহংকার তৈরি হয়। অথচ কুরবানি অহংকারের নয়; বিনয় ও আত্মত্যাগের ইবাদত।

মহান আল্লাহ অহংকারকে অপছন্দ করেন। তিনি বলেন-

إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো অহংকারী ও গর্বকারীকে পছন্দ করেন না।’ (সুরা লুকমান: আয়াত ১৮)

 

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-

لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ

‘যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (মুসলিম ৯১)

 

তাই কুরবানির পশু কেনার সময় সামর্থ্য অনুযায়ী ভালো পশু নির্বাচন করা উত্তম হলেও তা যেন কখনো অহংকার, প্রদর্শনী বা সামাজিক প্রতিযোগিতার কারণ না হয়।

 

লোক দেখানো আমল থেকে সতর্ক থাকতে হবে

ইবাদতের সবচেয়ে বড় শর্ত হলো ইখলাস বা একনিষ্ঠতা। মানুষের প্রশংসা পাওয়ার উদ্দেশ্যে কোনো আমল করলে তা রিয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়। কুরবানি যদি মানুষের বাহবা, ছবি-ভিডিও প্রদর্শন, সামাজিক মর্যাদা বা আত্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে করা হয়, তাহলে এর রূহ নষ্ট হয়ে যায়।

 

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-

أَخْوَفُ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمُ الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ

সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, “শিরকে আসগর কী?”

তিনি বললেন-

الرِّيَاءُ

‘লোক দেখানো আমল।’ (মুসনাদ আহমদ ২৩৬৩০)

 

আল্লাহ তাআলা কোরআনে লোক দেখানো ইবাদতের ভয়াবহতা সম্পর্কে বলেন-

فَوَيْلٌ لِّلْمُصَلِّينَ ۝ الَّذِينَ هُمْ يُرَاءُونَ

‘ধ্বংস তাদের জন্য যারা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ইবাদত করে।’ (সুরা মাউন: আয়াত ৪-৫)

সুতরাং কুরবানির পশু কেনা, জবাই করা কিংবা গোশত বণ্টনের প্রতিটি ধাপে নিয়ত হতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।

 

সমাজের ভয়ে নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কুরবানি

অনেকে সমাজে ছোট হয়ে যাওয়ার ভয়, আত্মীয়স্বজনের চাপ কিংবা লোকলজ্জার কারণে কুরবানি করেন। অথচ ইবাদত কখনো সামাজিক মান রক্ষার বিষয় নয়। ইবাদতের মূল ভিত্তি হলো আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠতা।

আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ

‘তাদেরকে কেবল এ নির্দেশই দেওয়া হয়েছিল যে, তারা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে।’ (সুরা আল-বাইয়্যিনাহ: আয়াত ৫)

 

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-

إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ

‘সমস্ত আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ (বুখারি ১)

তাই কারও সামর্থ্য না থাকলে লোকলজ্জার কারণে ঋণ করে বা কষ্ট করে কুরবানি করার প্রয়োজন নেই। আর সামর্থ্য থাকলে তা করতে হবে আল্লাহর হুকুম পালনের নিয়তে।

 

কুরবানি শুধু মাংসের আয়োজন নয়

কুরবানির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো সহমর্মিতা। কুরবানি কেবল নিজের পরিবারে মাংস খাওয়ার আয়োজন নয়; বরং দরিদ্র, অসহায়, প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার একটি বড় মাধ্যম।

আল্লাহ তাআলা বলেন-

كُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْبَائِسَ الْفَقِيرَ

‘তোমরা তা থেকে খাও এবং অভাবগ্রস্ত দরিদ্রকে খাওয়াও।’ (সুরা আল-হজ্জ: আয়াত ২৮)

 

আরেক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন-

فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْقَانِعَ وَالْمُعْتَرَّ

‘তোমরা তা থেকে খাও এবং সন্তুষ্ট দরিদ্র ও সাহায্যপ্রার্থীকে খাওয়াও।’ (সুরা আল-হজ্জ: আয়াত ৩৬)

এ কারণে কুরবানির গোশত বণ্টনের সময় প্রকৃত অভাবী মানুষদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। আত্মীয়তা, পরিচয় বা সামাজিক প্রভাবের চেয়ে দরিদ্র মানুষের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া কুরবানির অন্যতম শিক্ষা।

 

বংশগত প্রথা নয়, এটি ইবাদত

অনেকেই কুরবানিকে শুধু পারিবারিক ঐতিহ্য বা সামাজিক রেওয়াজ হিসেবে পালন করেন। অথচ কুরবানি কোনো লোকাচার নয়; এটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নির্ধারিত ইবাদত। তাই শুধু পূর্বপুরুষরা করতেন বলে নয়, বরং আল্লাহর বিধান জেনে, বুঝে ও অন্তর থেকে মান্য করে কুরবানি করা উচিত।

 

আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ نَسُوا اللَّهَ فَأَنسَاهُمْ أَنفُسَهُمْ

‘তোমরা তাদের মতো হয়ো না যারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, ফলে আল্লাহ তাদের নিজেদেরকেও ভুলিয়ে দিয়েছেন।’ (সুরা হাশর: আয়াত ১৯)

 

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-

إِنَّ اللَّهَ لَا يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ وَأَمْوَالِكُمْ وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ

‘আল্লাহ তোমাদের চেহারা বা সম্পদের দিকে তাকান না; তিনি তাকান তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে।’ (মুসলিম ২৫৬৪)

এই হাদিস থেকে স্পষ্ট, আল্লাহর কাছে বাহ্যিক সৌন্দর্য, সম্পদ বা প্রদর্শন মুখ্য নয়; বরং অন্তরের অবস্থা ও আমলের বিশুদ্ধতা মুখ্য।

 

হালাল উপার্জন ও বিশুদ্ধ নিয়ত গুরুত্বপূর্ণ

কুরবানির পশু কেনার অর্থ অবশ্যই হালাল হওয়া জরুরি। হারাম উপার্জনের অর্থ দিয়ে বড় আয়োজন করলে তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার আশা করা যায় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি পবিত্র জিনিসই গ্রহণ করেন। সহিহ মুসলিমে এ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তাই কুরবানির আগে শুধু পশুর বাহ্যিক দিক নয়, নিজের উপার্জন, নিয়ত, আমল ও অন্তরের অবস্থাও যাচাই করা জরুরি। কুরবানির উদ্দেশ্য হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি, দরিদ্রের সহায়তা, আত্মশুদ্ধি ও সুন্নাহর অনুসরণ।

 

সব মিলিয়ে কুরবানি মুসলমানের জন্য তাকওয়া অর্জনের এক বিশেষ সুযোগ। পশুর রক্ত বা মাংস নয়, আল্লাহর কাছে পৌঁছে বান্দার আন্তরিকতা। তাই কুরবানির আগে অহংকার, রিয়া, সামাজিক প্রতিযোগিতা, ভোগবাদ ও লোকলজ্জার মানসিকতা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা জরুরি।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে খাঁটি নিয়তে কুরবানি করার তৌফিক দান করুন, আমাদের আমল কবুল করুন এবং রিয়া ও অহংকার থেকে হেফাজত করুন। আমিন।

 

সর্বাধিক পঠিত