শনিবার, ২৩ মে ২০২৬, ১২:০০ রাত
MENU
#
কোরবানির পশুর প্রতি দয়া করার গুরুত্ব
daily-fulki

কোরবানির পশুর প্রতি দয়া করার গুরুত্ব

কোরবানি মুসলমানদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এই ইবাদতের মূল শিক্ষা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ, তাকওয়া ও মানবিকতা অর্জন করা।


ইসলাম যেমন মানুষের প্রতি দয়া, সহমর্মিতা ও উত্তম আচরণের শিক্ষা দেয়, তেমনি পশু-পাখির প্রতিও দয়াপরবশ হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে, বিশেষত কোরবানির পশু জবাইয়ের সময় যেন তাকে অযথা কষ্ট দেওয়া না হয়, সে ব্যাপারে শরিয়তে অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
ইসলাম প্রাণীকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কষ্ট দেওয়া নিষেধ করেছে। তাই প্রাণী ধরা, শোয়ানো ও জবাইয়ের কাজগুলো এভাবে করা উচিত, যেন প্রাণীর অতিরিক্ত কষ্ট না হয়। (তিরমিজি, হাদিস : ১৪০৯; মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক : ৮৬০৯)

শাদ্দাদ ইবনে আউস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ প্রত্যেক বিষয়ে ইহসান তথা সদয় আচরণ আবশ্যক করেছেন।


...আর যখন জবাই করবে, তখনো সদয়ভাবে জবাই করবে। আর তোমরা অবশ্যই ছুরি ধারালো করে নেবে এবং জবাইয়ের পশুকে যথাসম্ভব আরাম দেবে (কষ্ট দেবে না)।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৪০৯)
এ হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয় যে জবাইয়ের সময় পশুর প্রতি দয়ার্দ্র হতে হবে, পশুর কষ্ট যথাসম্ভব লাঘবের চেষ্টা করতে হবে, অযথা অতিরিক্ত কষ্ট সৃষ্টি করে—এমন কোনো পন্থা অবলম্বন করা যাবে না। ‘ইহসান’ শব্দের অর্থ হলো কোনো কাজ উত্তম ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করা।

 

তাই জবাইয়ের ক্ষেত্রেও ইসলামের দাবি হলো দয়া, কোমলতা ও মানবিকতা বজায় রাখা। ইসলামের দৃষ্টিতে কোরবানি শুধু একটি আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় প্রথা নয়; বরং এটি আত্মত্যাগ, সংযম ও নৈতিক উৎকর্ষের শিক্ষা বহন করে। তাই এই ইবাদতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি কাজেও মানবিকতার প্রতিফলন থাকা আবশ্যক।
দুঃখজনকভাবে দেখা যায়, অনেক সময় কোরবানির পশু জবাইয়ের পরপরই চামড়া ছাড়ানো, পায়ের রগ কাটা কিংবা গলায় বারবার খোঁচাখুঁচির মতো কাজ শুরু করা হয়। অথচ তখনো পশুটি পুরোপুরি নিস্তেজ হয়নি।


এর ফলে অবলা প্রাণীটি তীব্র যন্ত্রণা ভোগ করে, যা ইসলামের শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। এ ধরনের তাড়াহুড়া, অসতর্কতা কিংবা অবহেলাজনিত আচরণ ধর্মীয়ভাবে অনুচিত হওয়ার পাশাপাশি নৈতিকভাবেও প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ ইসলামে ইবাদতের বাহ্যিক শুদ্ধতার পাশাপাশি এর সৌন্দর্য ও শৃঙ্খলাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ফকিহরা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, জবাইয়ের পর পশু পুরোপুরি নিস্তেজ হওয়ার আগে তার চামড়া খসানো মাকরুহ। (আল-ইখতিয়ার : ৫/১২; বাদায়িউস সানায়ি : ৫/৬০)

বিখ্যাত ফকিহ আল্লামা মাওসিলি (রহ.) বলেন, ‘নিস্তেজ হওয়ার আগে চামড়া খসানো মাকরুহ।’ (আল-ইখতিয়ার : ৫/১২)

এ বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, পশুর মৃত্যু সম্পূর্ণ নিশ্চিত হওয়ার আগে চামড়া ছাড়ানো বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কর্তনের কাজ শুরু করা শরিয়তের দৃষ্টিতে অপছন্দনীয়। এতে পশুর অনুভূতিজনিত কষ্ট অব্যাহত থাকার আশঙ্কা থাকে।

অনেকেই পশু জবাইয়ের সঙ্গে সঙ্গে চামড়া ছাড়ানো বা পায়ের রগ কাটতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, যা চরম নিষ্ঠুরতা। নিয়ম হলো পশুর মৃত্যু সম্পূর্ণ নিশ্চিত হওয়ার পরই শুধু চামড়া ছাড়ানো বা অন্যান্য প্রক্রিয়া শুরু করা। এতে একদিকে শরিয়তের বিধান যথাযথভাবে পালিত হয়, অন্যদিকে পশুও অযথা কষ্ট থেকে রক্ষা পায়। তবে নিস্তেজ হওয়ার আগে চামড়া খসানো বা অঙ্গ কর্তন করা মাকরুহ হলেও এমনটি করা হলে কোরবানির পশুর গোশত হারাম হয়ে যাবে না; বরং তা হালালই থাকবে। (আল-ফাতাওয়াল হিন্দিয়্যা : ৫/২৮৭)

মোটকথা, কোরবানির পশুর প্রতি দয়া, কোমলতা ও মানবিক আচরণ প্রদর্শন করা ঈমানি দায়িত্বেরই অংশ। ইসলাম কোরবানির মাধ্যমে ত্যাগের শিক্ষা দেয়, নিষ্ঠুরতার নয়; দয়ার শিক্ষা দেয়, নির্দয়তার নয়। পশুর প্রতি সদাচরণই প্রকৃত তাকওয়ার পরিচায়ক।

তাই কোরবানিদাতাদের উচিত কোরবানির পশুর প্রতি দয়া, সহমর্মিতা ও শরিয়তসম্মত আচরণ নিশ্চিত করা, বিশেষ করে জবাইয়ের পর তাড়াহুড়া না করে পশুর সম্পূর্ণ নিস্তেজ হওয়া নিশ্চিত করা উচিত। পাশাপাশি কোরবানির প্রতিটি ধাপে যেন কোনো ধরনের অমানবিকতা বা অতিরিক্ত কষ্টের পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে সচেতন থাকা। আল্লাহ তাআলা আমাদের কোরবানি কবুল করুন এবং আমাদের জীবনে দয়া, তাকওয়া ও মানবিকতার গুণাবলি বৃদ্ধি করুন। আমিন।

 

সর্বাধিক পঠিত