ফুলকি ডেস্ক : রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন চীনে পৌঁছেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সফরের মাত্র চার দিন পর। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয় বরং চীন নিজেকে বিশ্বের একটি নির্ভরযোগ্য ও শক্তিশালী দেশ হিসেবে তুলে ধরার কৌশলের অংশ।
ইউক্রেন যুদ্ধ, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে মস্কো ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক আরও গভীর হচ্ছে। রাশিয়া এখন চীনের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালিতে সংকটের কারণে চীনও রাশিয়ার স্থলপথের জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে।
পুতিন এখন চীন সফরে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে এটি তাদের এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে দ্বিতীয় সরাসরি বৈঠক। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক যে আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে, এটা তার স্পষ্ট ইঙ্গিত।
এই সফরের সময়টাও তাৎপর্যপূর্ণ। ২০০১ সালে স্বাক্ষরিত সৌহার্দ্যপূর্ণ প্রতিবেশী ও বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা চুক্তির ২৫ বছর পূর্তি হচ্ছে এ সময়। ওই চুক্তির মাধ্যমে দীর্ঘদিনের সন্দেহ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা পেরিয়ে দুই দেশ নতুন সম্পর্কের ভিত্তি গড়েছিল।
মঙ্গলবার (১৯ মে) রাতে চীনে পৌঁছানোর পর পুতিনকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানান চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। আজ বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রথমে ছোট পরিসরে এবং পরে বড় পরিসরে বৈঠক হয়েছে।
ট্রাম্পের অনিশ্চয়তা দুই দেশকে আরও কাছে নিয়ে এসেছে
মস্কো ও বেইজিং—দুই দেশই এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জটিল সম্পর্ক সামলাচ্ছে। ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির অনিশ্চয়তা তাদের আরও কাছাকাছি এনেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইউক্রেন যুদ্ধ চলছে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ঘিরে উত্তেজনা বাড়ছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম অস্থির হয়ে উঠেছে। চীন, যারা বিপুল পরিমাণ তেল-গ্যাস আমদানি করে, তাদের জন্য এটা বড় উদ্বেগের বিষয়। ফলে তারা রাশিয়ার স্থলপথের নিরাপদ জ্বালানি সরবরাহের দিকে বেশি নজর দিচ্ছে।
সম্পর্ক কীভাবে বদলেছে
একসময় চীন ও রাশিয়ার (সোভিয়েত ইউনিয়ন) সম্পর্ক ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ভরা। শীতল যুদ্ধের সময় ৪ হাজার ৩০০ কিলোমিটার সীমান্তে উত্তেজনা প্রায় যুদ্ধের দিকে নিয়ে গিয়েছিল। সেই সীমান্ত আজ কৌশলগত সহযোগিতা ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়েছে।
পুতিন ও শি জিনপিং দুজনেই একে অপরকে বন্ধু বলে সম্বোধন করেন। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর এই সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে।
রাশিয়ার কাছে চীন কেন এত জরুরি
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার অর্থনীতির জন্য চীন হয়ে উঠেছে জীবনরেখা। ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ২৩৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
তবে এই সম্পর্ক অসম। চীনের মোট বাণিজ্যের মাত্র ৪ শতাংশ রাশিয়ার সঙ্গে। ফলে আলোচনায় চীনের দর কষাকষির ক্ষমতা অনেক বেশি। নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়া তার প্রয়োজনীয় প্রযুক্তির ৯০ শতাংশের বেশি চীন থেকে নিচ্ছে। তেল-গ্যাসেরও বড় ক্রেতা এখন চীন।
চীনের কাছে রাশিয়া কেন দরকার
চীনের জন্য রাশিয়া মানে নিরাপদ জ্বালানি। হরমুজ প্রণালিতে ঝুঁকি বাড়ায় বেইজিং 'পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-২' পাইপলাইন প্রকল্পকে নতুন করে গুরুত্ব দিচ্ছে। এই পাইপলাইন চালু হলে মঙ্গোলিয়া হয়ে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ গ্যাস চীনে আসবে।
শুধু অর্থনীতি নয়, ভূরাজনীতিতেও রাশিয়া চীনের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে দুই দেশ প্রায়ই যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান নেয়। যৌথ সামরিক মহড়াও নিয়মিত হচ্ছে, যদিও আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটে চীন যায়নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সম্পর্ক শুধু পশ্চিমবিরোধিতায় নয়, বরং বাস্তব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাই এটি সহজে ভাঙবে না।
এই সফরে পুতিন বলেছেন, রাশিয়া ও চীন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে। বর্তমান বিশ্বের অনিশ্চয়তায় এই দুই দেশের ঘনিষ্ঠতা আরও বাড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে।
