মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬, ১২:০০ রাত
MENU
#
কিশোর গ্যাং: সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক নীরব মহামারী
daily-fulki

কিশোর গ্যাং: সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক নীরব মহামারী

মুহাম্মদ হোসাইন উদ্দিন

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের শহর থেকে গ্রাম—প্রায় সর্বত্র “কিশোর গ্যাং” নামক এক ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। একসময় যে কিশোররা ছিল পরিবার ও জাতির ভবিষ্যৎ স্বপ্ন, আজ তাদের একটি অংশ জড়িয়ে পড়ছে চাঁদাবাজি, মাদক, ছিনতাই, ইভটিজিং, মারামারি, সাইবার অপরাধ এমনকি হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর অপরাধে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক ছত্রছায়া, পরিবারে অবহেলা এবং নৈতিক শিক্ষার অভাব—এসব কারণে কিশোর গ্যাং এখন জাতির জন্য এক গভীর উদ্বেগের নাম।
 

কিশোর গ্যাং কী?
কিশোর গ্যাং বলতে এমন একদল কিশোর বা তরুণকে বোঝায় যারা সংঘবদ্ধভাবে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকে। সাধারণত এদের বয়স ১২ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। নাম, লোগো, এলাকা বা আধিপত্যকে কেন্দ্র করে তারা নিজেদের পরিচয় গড়ে তোলে এবং অনেক সময় সামাজিক আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
কেন বাড়ছে কিশোর গ্যাং?
 

১. পারিবারিক অবহেলা
আজ অনেক পরিবারে বাবা-মা সন্তানের মানসিক জগত সম্পর্কে উদাসীন। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে, কী দেখছে—এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত নজরদারি নেই। অর্থ উপার্জনের ব্যস্ততায় অনেক অভিভাবক সন্তানকে সময় দিতে পারছেন না।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন
“তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, এবং প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।”
— সহীহ বুখারী
এই হাদিস স্পষ্ট করে যে সন্তানের চরিত্র গঠনের দায়িত্ব পরিবারকেই বহন করতে হবে।
 

২. ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার অভাব
যে হৃদয়ে আল্লাহভীতি নেই, সেখানে অপরাধ সহজ হয়ে যায়। কোরআন মানুষকে শান্তি, সংযম ও মানবিকতার শিক্ষা দেয়। কিন্তু আজ অনেক তরুণ সেই শিক্ষার বাইরে বেড়ে উঠছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
“নিশ্চয়ই আল্লাহ অশ্লীলতা, অন্যায় ও সীমালঙ্ঘনকে নিষিদ্ধ করেছেন।”
সূরা আন-নাহল: ৯০
কিশোর গ্যাং মূলত সীমালঙ্ঘনেরই একটি রূপ, যা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।
 

৩. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অপসংস্কৃতি
বর্তমান সময়ে কিছু কিশোর সিনেমা, ওয়েব সিরিজ, গ্যাং-সংস্কৃতি এবং সহিংস ভিডিও দেখে প্রভাবিত হচ্ছে। অনেকেই “ভয়ঙ্কর” বা “ডন” পরিচয়কে গর্বের বিষয় মনে করে। ঞরশঞড়শ, ঋধপবনড়ড়শ বা ণড়ঁঞঁনব-এ জনপ্রিয়তা পাওয়ার নেশায় তারা অপরাধমূলক ভিডিও তৈরি করে।
ইসলাম অহংকার ও দম্ভকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করেছে।
আল্লাহ বলেন—
“পৃথিবীতে দম্ভভরে চলাফেরা করো না।”
সূরা আল-ইসরা: ৩৭
 

৪. মাদক ও রাজনৈতিক আশ্রয়
অনেক ক্ষেত্রে কিশোর গ্যাং মাদক ব্যবসায়ীদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আবার কিছু অসাধু রাজনৈতিক ব্যক্তি নিজেদের স্বার্থে কিশোরদের ব্যবহার করে থাকে। ফলে অপরাধ করেও তারা দ্রুত শাস্তির আওতায় আসে না।
 

কিশোর গ্যাংয়ের ভয়াবহ প্রভাব
সমাজে আতঙ্ক সৃষ্টি
 

স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, নারী ও সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। এলাকায় এলাকায় ভয় ও অস্থিরতা সৃষ্টি হয়।
শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস
যে তরুণদের হাতে বই থাকার কথা, তাদের হাতে উঠে আসে অস্ত্র ও মাদক।
পরিবারে অশান্তি
একজন কিশোর অপরাধে জড়ালে তার পরিবার সামাজিকভাবে অপমানিত হয় এবং মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে।
জাতীয় উন্নয়নে বাধা
যুবসমাজ একটি দেশের শক্তি। সেই শক্তি যখন ধ্বংসাত্মক কাজে ব্যবহৃত হয়, তখন রাষ্ট্রের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়।
 

ইসলামের দৃষ্টিতে সমাধান
১. পরিবারে ইসলামী পরিবেশ গড়ে তোলা
সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই নামাজ, কোরআন শিক্ষা ও নৈতিকতার চর্চায় অভ্যস্ত করতে হবে। পরিবারে ভালোবাসা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে।
২. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা
স্কুল-কলেজে শুধু জিপিএ নয়, চরিত্র গঠনমূলক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
৩. খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক ইতিবাচক কার্যক্রম বৃদ্ধি
তরুণদের সুস্থ বিনোদন, খেলাধুলা, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে হবে।
৪. মাদক ও অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা
আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীদের রাজনৈতিক বা সামাজিক আশ্রয় বন্ধ করতে হবে।
৫. মসজিদ ও আলেম সমাজের ভূমিকা
ইমাম, আলেম ও সমাজের সচেতন ব্যক্তিদের তরুণদের নিয়ে নিয়মিত আলোচনা, কাউন্সেলিং ও দিকনির্দেশনা দিতে হবে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“সর্বোত্তম মানুষ সে, যে মানুষের উপকার করে।”
 

— আল-মু’জামুল আওসাত
তরুণদের ধ্বংস নয়, মানবকল্যাণে উদ্বুদ্ধ করাই ইসলামের শিক্ষা।
উপসংহার
কিশোর গ্যাং কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; এটি একটি সামাজিক, নৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সংকট। শুধুমাত্র আইন প্রয়োগ করে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন এবং সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগই পারে তরুণ প্রজন্মকে এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে।
আজকের কিশোরই আগামী দিনের রাষ্ট্রনায়ক, আলেম, শিক্ষক, বিজ্ঞানী ও সমাজনেতা। তাই তাদের হাতে অস্ত্র নয়—কোরআন, জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবতার আলো তুলে দিতে হবে। তাহলেই গড়ে উঠবে নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও আদর্শ।

মুহাম্মদ হোসাইন উদ্দিন 
অধ্যক্ষ 
জাবাল ই নূর আলিম মাদ্রাসা, সাভার, ঢাকা।
 

সর্বাধিক পঠিত