সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ১২:০০ রাত
MENU
#
বাংলাদেশে হামের মহামারী, ঝুঁকিতে ভারতও
daily-fulki

বাংলাদেশে হামের মহামারী, ঝুঁকিতে ভারতও


ফুলকি ডেস্ক : বাংলাদেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া হাম পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। টিকা সংগ্রহের নীতিতে পরিবর্তন, নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে ব্যাঘাত এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় জনস্বাস্থ্য সংকটগুলোর একটি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

সরকারি তথ্য ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসাবে, ২০২৬ সালের মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে দেশে ৩২ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ সময় ২৫০ জনের বেশি সন্দেহভাজন মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে, যাদের বেশির ভাগই শিশু। তবে স্থানীয় কয়েকজন পর্যবেক্ষক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের ধারণা, টিকাদানে ঘাটতি ও জরুরি পদক্ষেপে বিলম্বের কারণে প্রকৃত মৃতের সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে মিয়ানমার সীমান্তসংলগ্ন রোহিঙ্গা শিবিরে প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়ে। পরে তা দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এখন পর্যন্ত দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়েছে এবং ২১ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। রাজধানী ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলো সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে।


২৩ এপ্রিল প্রকাশিত এক হালনাগাদ তথ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, এই সংক্রমণ ভারত ও মিয়ানমারে সীমান্ত অতিক্রম করে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে। সংস্থাটির তথ্যে বলা হয়, ১৫ মার্চের পর সবচেয়ে বেশি সন্দেহভাজন রোগী পাওয়া গেছে ঢাকা, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগে।

আক্রান্তদের বেশির ভাগই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। বিশেষ করে নয় মাসের কম বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, অপুষ্টি, ভিটামিন 'এ' বিতরণ কর্মসূচিতে ব্যাঘাত এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে।

দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি আন্তর্জাতিকভাবে সফল জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ হিসেবে পরিচিত ছিল। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় হাম-রুবেলা টিকাসহ বিভিন্ন টিকা ইউনিসেফের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হতো। এতে আর্থিক সহায়তা দিত গাভি, দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স এবং বাংলাদেশ সরকারও অংশ নিত। শিশুদের নিয়মিতভাবে নয় ও ১৫ মাস বয়সে হাম-রুবেলা টিকা দেওয়া হতো। পাশাপাশি প্রতি চার বছর পরপর দেশব্যাপী বিশেষ কর্মসূচি চালিয়ে টিকাদানের হার ৯৫ শতাংশের ওপরে রাখা হতো।

করোনা মহামারির সময়ও এই ব্যবস্থা কার্যকর ছিল এবং গণটিকাদান কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসা পেয়েছিল বাংলাদেশ। তবে ২০২৪ সালের সরকারবিরোধী আন্দোলন ও রাজনৈতিক সহিংসতার পর জনস্বাস্থ্য প্রশাসনে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়।

দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন। পরে অন্তর্বর্তী প্রশাসনের নেতৃত্বে আসেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূস।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহের দীর্ঘদিনের পদ্ধতি বাতিল করে উন্মুক্ত দরপত্রভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করে। ইউনিসেফ এ সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়েছিল এবং সতর্ক করেছিল যে এতে টিকা সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে ও টিকাদানের হার কমে যেতে পারে।

নতুন ব্যবস্থায় দরপত্রের মাধ্যমে সরবরাহকারী নির্বাচন করার কথা ছিল। তবে প্রশাসনিক জটিলতা ও ক্রয় প্রক্রিয়ায় বিলম্বের কারণে টিকার মজুত কমে যায় এবং সারা দেশে নিয়মিত টিকাদান ব্যাহত হয়। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ২০২৪ সাল থেকে পিছিয়ে যাওয়া অতিরিক্ত হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি বাতিল করা হয়।

সরকারি হিসাবে দেখা যায়, ২০২৫ সালে মাত্র ৫৯ শতাংশ শিশু হামের টিকা পেয়েছে, যা সংক্রমণ ঠেকাতে প্রয়োজনীয় হারের তুলনায় অনেক কম। পরে এই তথ্য সরকারি মাধ্যম থেকে সরিয়ে ফেলা হয়, যা স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

এদিকে বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কেও রূপ নিয়েছে। অন্তর্বর্তী প্রশাসনে মুহাম্মদ ইউনূসের প্রেস সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করা শাফিকুল আলম দাবি করেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে টিকা সংগ্রহে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে। তার অভিযোগ, আগের সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দুর্নীতির কারণে ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ বন্ধ করা হয়েছিল।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও গাভি টিকা কেনায় অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিল। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে তিনি কোনো নথিপত্র প্রকাশ করেননি।

এ মন্তব্য নতুন রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করেছে। এর আগে অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে প্রকাশিত এক শ্বেতপত্রে দাবি করা হয়েছিল, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, এক বছরের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকার পরও অন্তর্বর্তী প্রশাসন এসব দাবির পক্ষে যাচাইযোগ্য প্রমাণ দেখাতে পারেনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হাম পরিস্থিতি ও টিকাদানের হার কমে যাওয়ার দায় নিয়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সতর্কতা উপেক্ষা করে ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে সরাসরি ভূমিকা রেখেছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক বিতর্ক যাই থাকুক না কেন, টিকা সরবরাহে বিলম্ব ও টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যাঘাতের ফলে বিপজ্জনক প্রতিরোধ ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যার কারণে হাজারো শিশু সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়েছে।

সংক্রমণ বাড়তে থাকায় এবং আঞ্চলিকভাবে ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা বাড়ায় টিকা সংগ্রহ ব্যবস্থা স্থিতিশীল করা ও জনআস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য বাংলাদেশের ওপর আন্তর্জাতিক চাপও বাড়ছে।

বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি বলেন, বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতি এখন গুরুতর মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। তার ভাষ্য, শত শত শিশু মারা গেছে এবং প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি হতে পারে। তিনি বলেন, সম্ভাব্য আঞ্চলিক প্রভাব থাকা সত্ত্বেও বিষয়টি ভারতে খুব বেশি গুরুত্ব পায়নি।

তিনি দাবি করেন, শেখ হাসিনার সময় ইউনিসেফ ও গাভির সহায়তায় বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি কার্যকরভাবে পরিচালিত হতো। তবে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর সেই ব্যবস্থা বাতিল করে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি চালু করা হয়, যা কার্যকর হয়নি এবং টিকার সংকট তৈরি করে।

বাংলাদেশে হাম নিয়ে প্রায়ই যেসব বিষয় জানতে চাওয়া হয়/ বাংলাদেশে হাম  নিয়ে প্রায়ই যেসব প্রশ্ন করা হয় | UNICEF বাংলাদেশ

তার মতে, এতে বাংলাদেশজুড়ে, বিশেষ করে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে শিশুদের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। একই সঙ্গে এ সংক্রমণ ভারত ও মিয়ানমারেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।

টিকা কেনায় অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে বীণা সিক্রি বলেন, কোনো অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তদন্ত করা যেত, কিন্তু টিকা বিতরণ বন্ধ করা উচিত হয়নি। তার ভাষায়, ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশে শিশুদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ করে দেওয়া ছিল অমানবিক ও বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান প্রশাসনও অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া নীতিগুলোর বড় অংশ বহাল রেখেছে এবং টিকাদান কর্মসূচি সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো পরিবর্তন করেনি। তার মতে, বাণিজ্য বা ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের মতো অন্যান্য ক্ষেত্রে নীতিগত পরিবর্তন আনা হলেও, হাম নিয়ন্ত্রণে আগে সফল হওয়া স্বাস্থ্য উদ্যোগটি পুনরায় চালু করা হয়নি।

 

সর্বাধিক পঠিত