স্টাফ রিপোর্টার : ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাতিল হওয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংগীত শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগটি পুনরায় কার্যকর করতে যাচ্ছে বর্তমান নির্বাচিত সরকার। তবে আগের মতো সরাসরি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে নয়, বরং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিশেষ ‘প্যানেল’ বা ‘ক্লাস্টার’ পদ্ধতিতে এই নিয়োগ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রেক্ষাপট: অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত ও বিতর্ক
২০১৯ সালের নিয়োগ বিধিমালা সংশোধন করে ২০২৫ সালের ২৮ আগস্ট একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার, যেখানে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষার জন্য আলাদা সহকারী শিক্ষক পদ রাখা হয়েছিল। তবে পরবর্তীকালে বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনের চাপ এবং সচিব কমিটির সুপারিশের প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ২ নভেম্বর পুনরায় বিধিমালা সংশোধন করে এই দুটি পদ বাদ দেওয়া হয়।
তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছিল যে, সীমিত সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে দেশের বিশাল প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় কোনও পরিবর্তন আনা সম্ভব নয় এবং এতে বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে বৈষম্য তৈরি হতে পারে। এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার প্রার্থীর কর্মসংস্থানের পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, যা নিয়ে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।
নির্বাচিত সরকারের নতুন কৌশল
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর ক্ষমতায় এসে নতুন সরকার এই স্থগিত নিয়োগ প্রক্রিয়া পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেয়। বিশেষ করে ‘জাতীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতি রক্ষা আন্দোলন’-এর দীর্ঘদিনের দাবির মুখে সরকার সরাসরি নিয়োগের পরিবর্তে একটি বিকল্প ও বাস্তবসম্মত পথ বেছে নিয়েছে।
নতুন পরিকল্পনার মূল দিক
মন্ত্রণালয় পরিবর্তন: সংগীত শিক্ষকদের নির্বাচন করবে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, তবে তাদের বেতন-ভাতা প্রদান করবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
ক্লাস্টার পদ্ধতি: প্রায় ২ হাজার ৫৮৩ জন সংগীত প্রশিক্ষক নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রতিটি ‘ক্লাস্টার’ বা ২০-২৫টি বিদ্যালয়ের জন্য একজন প্রশিক্ষক নিয়োজিত থাকবেন, যারা রুটিন অনুযায়ী প্রতিটি বিদ্যালয়ে গিয়ে পাঠদান করবেন।
শারীরিক শিক্ষা ও ধর্মীয় শিক্ষক: সংগীত শিক্ষক নিয়োগের জট খুললেও শারীরিক শিক্ষা পদের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। তবে নৈতিক শিক্ষার প্রসারে সরকার প্রায় ৯ হাজার ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে।
এই বিষয়ে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, “পর্যাপ্ত যোগ্য প্রার্থীর অভাব এবং কৌশলগত কারণে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এই নিয়োগ দেওয়া হবে। বিষয়টি ইতোমধ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে।” একটি ক্লাস্টারে একজন করে শিক্ষক নিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যিনি একদিন একটি বিদ্যালয়ে এবং পরের দিন অন্য বিদ্যালয়ে গিয়ে দায়িত্ব পালন করবেন বলেও জানান মন্ত্রী।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ-ও একই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংগীত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে।” নিয়োগ পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়েছে কিনা—জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি ইতোমধ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে।”
ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের পরিকল্পনা
প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষার ওপর জোর দিতে নতুন সরকার বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। গত ১৫ মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, সমাজে নৈতিক অবক্ষয় রোধে প্রায় ৯ হাজার ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের পরিকল্পনা বিবেচনা করছে মন্ত্রণালয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আমলের শিক্ষা গুরুত্বের কথা স্মরণ করে তিনি জানান, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও প্রাথমিক শিক্ষাকে ঢেলে সাজাতে ‘১৮০ দিনের কর্মসূচি’ অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশনা দিয়েছেন।
সংস্কৃতি রক্ষা আন্দোলনের ভূমিকা
২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক নিয়োগের দাবিতে স্মারকলিপি প্রদান এবং কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশ করে ‘জাতীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতি রক্ষা আন্দোলন’।
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী সংস্থা এবং ছাত্র ইউনিয়নসহ ২৩টি সংগঠনের জোট ‘জাতীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতি রক্ষা আন্দোলনের’ দাবি ছিল সংগীত ও শারীরিক শিক্ষার শিক্ষার শিক্ষক পদ দুটি ফিরিয়ে দিতে আগের বিধিমালা বহাল করা।
বর্তমান সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর গত দুই মাসেও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর দাবি অব্যাহত রয়েছে। সংগীত শিক্ষক সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নিয়োগের পরিকল্পনা করা হলেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শারীরিক শিক্ষা পদে নিয়োগের বিষয়টি এখনও অনিশ্চিত রয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
