মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
وَ نَضَعُ الۡمَوَازِیۡنَ الۡقِسۡطَ لِیَوۡمِ الۡقِیٰمَۃِ فَلَا تُظۡلَمُ نَفۡسٌ شَیۡئًا ؕ وَ اِنۡ كَانَ مِثۡقَالَ حَبَّۃٍ مِّنۡ خَرۡدَلٍ اَتَیۡنَا بِهَا ؕ وَ كَفٰی بِنَا حٰسِبِیۡنَ
সরল অনুবাদ :
‘আর আমি কিয়ামতের দিন ন্যায়বিচারের মানদণ্ড স্থাপন করব। সুতরাং কারো প্রতি কোনো অবিচার করা হবে না। কারো কর্ম যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয়, আমি তা হাজির করব। আর হিসাব গ্রহণকারী হিসেবে আমিই যথেষ্ট।
’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ৪৭)
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা :
এখানে مَوَازِين শব্দটি ميزان শব্দের বহুবচন। অর্থ ওজনের যন্ত্র বা দাঁড়িপাল্লা। এখন প্রশ্ন হলো, দাঁড়িপাল্লা কি একটি হবে নাকি একাধিক হবে? কোনো কোনো তাফসিরবিদ বলেন, আমলের শ্রেণি অনুযায়ী আমল ওজন করার জন্য অনেকগুলো দাঁড়িপাল্লা স্থাপন করা হবে। প্রত্যেকের জন্য ভিন্ন ভিন্ন দাঁড়িপাল্লা হবে।
আবার এটাও হতে পারে যে একই দাঁড়িপাল্লাকে বহুবচন হিসেবে উপাস্থাপন করা হয়েছে। (তাফসিরে কুরতুবি)
কিন্তু অধিকাংশ তাফসিরবিদদের মতে, দাঁড়িপাল্লা একটিই হবে। যার থাকবে দুটি পাল্লা। যে দুটি পাল্লা সবাই দেখতে পাবে, অনুভব করতে পারবে।
তবে বহুবচনে ব্যক্ত করার কারণ হয়তো এটাই যে, মিজানের পাল্লাতে যেমনিভাবে বান্দার আমলনামা ওজন করা হবে, তেমনিভাবে বান্দার আমলকেও সরাসরি ওজন করা হবে, এমনকি বান্দাকেও ওজন করা হবে। সে হিসেবে বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। (শারহুত তাহাভিয়্যাহ, তাফসিরে জাকারিয়া)
মানুষের আমল ও কর্মসমূহ অতীন্দ্রীয়, তা ইন্দ্রীয়গ্রাহ্য ও অনুভূত নয়, তার বাহ্যিক কোনো রূপ বা অস্তিতত্ত্ব নেই, তাহলে তার ওজন কিভাবে সম্ভব? আধুনিক যুগে এই প্রশ্নের কোনো গুরুত্ব নেই। যেহেতু বর্তমানে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এ প্রশ্নের উত্তর সহজ করে দিয়েছে। বর্তমানে বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের সাহায্যে নিরাকার তথা ওজনহীন বস্তুও ওজন করা যাচ্ছে।
যখন মানুষের দ্বারা এটা সম্ভব, তখন মহান আল্লাহর জন্য আকারহীন বা ওজনহীন অশরীরী জিনিসকে ওজন করা কেমন করে কঠিন হতে পারে? তাঁর মহিমা হলো, তিনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান। এ ছাড়া এটাও হতে পারে যে (ন্যায়-বিচার করতে) মানুষকে দেখানোর জন্য তিনি নিরাকার বস্তুকে সাকার বানাবেন এবং তা ওজন করবেন। যেমন সহিহ হাদিসে কিছু কর্মের সাকার হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। ‘কিয়ামতের দিন কোরআন এক ফ্যাকাসে বর্ণের শীর্ণ পুরুষের বেশে কোরআন তেলাওয়াতকারীর সামনে উপস্থিত হবে। সে জিজ্ঞেস করবে, ‘তুমি কে?’ সে বলবে, ‘আমি কোরআন যা তুমি রাত্রি জাগরণ করে পাঠ করতে ও দিনে পিপাসার্ত অবস্থায় পাঠ করতে।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নম্বর : ৩৫২) (তাফসিরে আহসানুল বায়ান)
শিক্ষা ও বিধান
১. কিয়ামতের দিন আল্লাহ নিখুঁত বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করবেন। আর বিচার হবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, নির্ভুল ও সুবিচারপূর্ণ, যেখানে কোনো পক্ষপাত থাকবে না।
২. দুনিয়ার বিচারে কেউ কারো ওপর সামান্যতম জুলুম করলেও আখেরাতে কারো ওপর বিন্দুমাত্র অবিচার করা হবে না।
৩. ক্ষুদ্রতম আমলও উপেক্ষিত হবে না। আল্লাহ সরিষার দানার পরিমাণ ক্ষুদ্র আমলও হাজির করবেন। তাই ছোট ভালো কাজ (হাসি, সদকা, সাহায্য) কখনো তুচ্ছ মনে করা উচিত নয়। একইভাবে ছোট পাপ থেকেও সতর্ক থাকা জরুরি।
৪. আল্লাহর জ্ঞান ও হিসাব সর্বব্যাপী ও নিখুঁত। তাই তিনি মানুষের গোপন-প্রকাশ্য সব কাজ, নিয়ত-সব কিছুই আল্লাহ জানেন এবং সংরক্ষণ করেন।
৫. একদিন প্রতিটি কাজের হিসাব দিতে হবে। তাই একজন মুমিন হিসেবে সব সময় নিজের আমল সম্পর্কে সতর্ক থাকা উচিত।
