ফুলকি ডেস্ক : কাবা শরিফের তাওয়াফ হজ ও ওমরাহর অপরিহার্য আমল। ওমরাহর সময় তাওয়াফ করা ফরজ। হজের সময় তাওয়াফে জিয়ারত করা ফরজ। আরাফায় অবস্থানের পর এ তাওয়াফ করতে হয়। তবে তাওয়াফ শুধু ওমরাহ বা হজের সঙ্গে সম্পর্কিত আমল নয়। ওমরাহ ও হজের তাওয়াফ ছাড়াও বছরজুড়ে নফল তাওয়াফ করা যায়। নফল তাওয়াফও অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল।
হজরত ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে হজ-ওমরাহর তাওয়াফসহ যে কোনো সময় কাবা শরিফ তাওয়াফ করার ফজিলত বর্ণনা করে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন— ‘যে ব্যক্তি বাইতুল্লাহর চারদিকে সাতবার প্রদক্ষিণ করবে ও তা যথাযথভাবে সম্পন্ন করবে, তা তার জন্য গোলাম মুক্ত করে দেওয়ার সমতুল্য হবে। কোন লোক এতে এক পা ফেলে অপর পা ওঠানোর আগেই আল্লাহ তাআলা তার একটি গুনাহ ক্ষমা করে দেন ও তার জন্যে একটি সাওয়াব নির্ধারণ করেন।’ (তিরমিজি ৯৫৯)
তাওয়াফের নিয়ম
মসজিদুল হারামে প্রবেশ করে হাজরে আসওয়াদের কোণা বরাবর এসে হাজরে আসওয়াদের দিকে মুখ করে দাঁড়ান। মনে মনে বা মুখে উচ্চারণ করে নিজের ভাষায় বলুন— ‘হে আল্লাহ! আমি তাওয়াফ শুরু করছি, আপনি কবুল করে নিন।’ কান বরাবর হাত তুলে তাকবির দিন এবং হাতের ইশারায় হাজরে আসওয়াদে চুমু খান। সিনা সোজা করে সাত চক্কর দিন। প্রতি চক্করের শুরুতে তাকবির দিন, তাওয়াফের সময় দোয়া পড়ুন, জিকির করুন।
তাওয়াফ শেষে—
> দুই রাকাত নামাজ পড়ুন।
> জমজমের পানি পান করুন।
হজ ও ওমরার তাওয়াফে রমল ও ইজতিবা আছে। নফল তাওয়াফে রমল ও ইজতিবা নেই। আবার নফল তাওয়াফের জন্য ইহরাম পরিধান করা জরুরি নয়, সাধারণ পোশাকেও নফল তাওয়াফ করা যায়। তবে বর্তমানে ইহরামের পোশাক ছাড়া কাবা শরিফ চত্ত্বরে যাওয়া যায় না। বিধায় যারা নফল তাওয়াফ করেন, তারাও ইহরামের পোশাক পরে তাওয়াফ করতে যান। নফল তাওয়াফের পর সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ে সাঈ করতে হয় না।
ইজতিবা
তাওয়াফের সময় গায়ের চাদরকে ডান বগলের নিচে দিয়ে চাদরের উভয় মাথাকে বাম কাঁধের ওপর দিয়ে এক মাথা সামনে আর অন্য মাথা পেছনে ফেলে তাওয়াফ করা। তাওয়াফের সময় এভাবে বীর-বাহাদুরি সুলভ ভঙ্গিতে গায়েল চাদর পরিধান করাই হলো ইজতিবা। এটা বিশ্বনবী (সা.)-এর সুন্নত।
রমল
হজ ও ওমরার তাওয়াফের প্রথম ৩ চক্করে রমল করেছেন প্রিয়নবী (সা.)। আর তাহলো তাওয়াফের সময় বীরদর্পে দুই হাত, শরীর ও কাঁধ দুলিয়ে দ্রুত গতিতে চলা।
তাওয়াফের দোয়া
তাওয়াফের সময় যে কোনো দোয়া পড়া যায়। তাওয়াফের জন্য কোনো নির্দিষ্ট এমন কোনো দোয়া নেই যা পড়লে তাওয়াফ শুদ্ধ হবে না। হাদিসে কয়েকটি দোয়া পাওয়া যায় যা রাসুলুল্লাহ (সা.) তাওয়াফের সময় পড়েছেন।
তাওয়াফ শুরুর সময় ও প্রতি চক্করের শুরুতে হাজরে আসওয়াদের সামনে তাকবির (অর্থাৎ আল্লাহু আকবার) বলা সুন্নত যেমন ওপরে বলা হয়েছে। নবীজি (সা.) কাবা ঘরের চারপাশে উটের পিঠে চড়ে তাওয়াফ করেছিলেন এবং যখনই তিনি হাজরে আসওয়াদ বরাবর পৌঁছাতেন, তখন তার হাতে থাকা একটি লাঠি দিয়ে হাজরে আসওয়াদের দিকে ইশারা করতেন এবং ‘আল্লাহু আকবার’ বলতেন।’ (বুখারি)
তাওয়াফের শুরুতে ও হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ বা ইশারা করার সময় অনেক আলেমরা এই দোয়াটি পড়াও উত্তম বলেছেন—
اللَّهُمَّ إِيمَانًا بِكَ وَتَصْدِيقًا بِكِتَابِكَ وَوَفَاءً بِعَهْدِكَ وَاتِّبَاعًا لِسُنَّةِ نَبِيِّكَ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা ইমানান বিকা ওয়া তাসদিকান বিকিতাবিকা ওয়া ওয়াফাআন বিআহদিকা ওয়া ইত্তিবাআন লি সুন্নাতি নাবিয়্যিকা মুহাম্মাদিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।’
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আপনার প্রতি ইমান, আপনার কিতাবে বিশ্বাস, আপনার সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করা এবং আপনার নবি মুহাম্মাদের (সা.) সুন্নতের অনুসরণে তাওয়াফ শুরু করছি।’
তাওয়াফের প্রথম তিন চক্করে এ দোয়াটি পড়তে পারেন—
اللَّهُمَّ اجْعَلْهُ حَجًّا مَبْرُورًا وَذَنْبًا مَغْفُورًا وَسَعْيًا مَشكُورًا.
উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মাজআলহু হাজ্জান মাবরুরান ওয়া যামবান মাগফুরান ওয়া সাইয়ান মাশকুরান।’
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! এটিকে কবুল হজ বানিয়ে দিন, গুনাহ মাফের কারণ বানিয়ে দিন এবং প্রশংসিত প্রচেষ্টা বানিয়ে দিন।’
শেষ চার চক্করে এ দোয়াটি পড়তে পারেন—
اللَّهُمَّ اغْفِرْ وَارْحَمْ وَاعْفُ عَمَّا تَعْلَمْ وَأَنتَ الأَعَزُّ الأَكرَمُ اللَّهُمَّ رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنيَا حَسَنَةً وَفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাগফির ওয়ারহাম ওয়া’ফু আম্মা তা‘লাম ওয়াঅন্তাল আআজ্জুল আকরাম আল্লাহুম্মা রাব্বানা আতিনা ফিদ দুনিয়া হাসানাহ ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাহ ওয়া কিনা আজাবান নার।
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমা করুন, দয়া করুন, আপনি যা জানেন তা উপেক্ষা করুন। নিশ্চয়ই আপনি পরাক্রমশালী ও সম্মানিত। হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দিন, আখিরাতে কল্যাণ দিন এবং আমাদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন।
রুকনে ইয়ামানি থেকে হাজরে আসওয়াদের দিকে যাওয়ার সময় আল্লাহর রাসুল (সা.) কুরআন মাজিদের উল্লেখিত এ দোয়াটি পড়েছেন বলে বর্ণিত রয়েছে—
رَبَّنَاۤ اٰتِنَا فِی الدُّنۡیَا حَسَنَۃً وَّ فِی الۡاٰخِرَۃِ حَسَنَۃً وَّ قِنَا عَذَابَ النَّارِ
উচ্চারণ: ‘রাব্বানা আতিনা ফিদ-দুনিয়া হাসানাহ ওয়া ফিল-আখিরাতি হাসানাহ ওয়া কিনা আযাবান-নার’
অর্থ: ‘হে আমাদের রব, আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দিন, আখেরাতেও কল্যাণ দিন এবং আগুনের আযাব থেকে রক্ষা করুন।’ (সুরা বাকারা: ২০১, আবু দাউদ ১/ ২৬০)
এ ছাড়া তাওয়াফের সময় যে কোনো জিকির, কুরআন-হাদিসে বর্ণিত বা উত্তম অর্থবোধক দোয়া পাঠ করা করা যেতে পারে।
