স্টাফ রিপোর্টার : সাভার সাব-রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগে পুনরায় তদন্ত শুরু হয়েছে। রোববার (২৬ এপ্রিল) অভিযোগের সরেজমিন তদন্তে আসেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. মঈনুদ্দিন কাদির।

সূত্রে জানা যায়, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২২ এপ্রিল আইন মন্ত্রণালয়ের এই কর্মকর্তাকে সরেজমিন তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং ১৫ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
সরেজমিনে তদন্তকালে মো. মঈনুদ্দিন কাদির ভুক্তভোগী, দলিল লেখক, সাংবাদিক, অভিযুক্ত সাবরেজিস্ট্রারসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে কথা বলেন এবং সাক্ষ্য নেন।
দায়িত্বশীল একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, জাকির হোসেনের চাকরির বয়স মাত্র ৯ বছর। তিনি চাকরিতে যোগ দেন ২০১৭ সালের ১৬ আগস্ট। অথচ নামে-বেনামে তার সম্পদের তালিকা পিলে চমকানোর মতো। প্রাইজপোস্টিং খ্যাত বর্তমান কর্মস্থল রাজধানীর নিকটবর্তী সাভার। এছাড়াও তিনি এর আগে জামালপুরের বকসিগঞ্জ, সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ এবং হবিগঞ্জের বানিয়াচং সাবরেজিস্ট্রি অফিসে কর্মরত ছিলেন। তবে প্রতিটি কর্মস্থলে হাত খুলে ঘুষ কমিশন বাণিজ্য চালিয়ে আসছেন বলে তথ্যভিত্তিক অনেক অভিযোগ রয়েছে।
সাব-রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ জাকির হোসেন ‘ম্যানেজ মাস্টার’ নামেও পরিচিত। যাকে যেভাবে বশে আনা দরকার, সে বিষয়ে তিনি বেশ পারদর্শী। আবার যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তখন সে সরকারের দলীয় লোক বনে যান। যে কারণে আওয়ামী লীগ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তার কোনো বেগ পেতে হয়নি। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর সমন্বয়ক কোটায় দাপটের সঙ্গে চাকরি করেন সাব-রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ জাকির হোসেন। কাউকে পাত্তা দিতেন না। এখন আবার পুরোদস্তুর বিএনপি সাজার অপচেষ্টা করে যাচ্ছেন। এছাড়া যেখানে চাকরি করেন সেখানে শুরুতে তিনি স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বশে এনে ‘প্রটেকশন সিন্ডিকেট’ গড়ে তোলেন। এই ক্ষমতাবলে সেবাপ্রার্থীসহ অধস্তন কর্মচারীদের সঙ্গেও চরম দুর্ব্যবহার করেন।
রোববার সাক্ষ্য দেওয়ার সময় দলিল লেখক কাজী ফরহাদ হোসেন অভিযোগ করেন, সাব-রেজিস্ট্রার জাকির হোসেন নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেন। নির্ধারিত অর্থের বাইরে টাকা না দিলে তিনি দলিলে ত্রুটি দেখিয়ে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানান।
সাভার উপজেলার তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের শোভাপুর গ্রামের আবুল হোসেন অভিযোগ করেন, একটি ফ্ল্যাট বিক্রির সময় দলিল সংক্রান্ত জটিলতায় পড়ে লিখিত অভিযোগ নিয়ে গেলে সাব-রেজিস্ট্রার তাঁর সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন এবং দারোয়ান ডেকে কক্ষ থেকে বের করে দেন।
সাভার দলিল লেখক কল্যাণ সমিতির আহবায়ক কমিটির সদস্য সচিব মোহাম্মদ মেহেদী হাসান বলেন, প্রায় দেড় বছর আগে সাব-রেজিস্ট্রার জাকির হোসেন সাভারে যোগদানের পর থেকেই অনুগত দলিল লেখকদের বাইরে অন্যদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে আসছেন। তিনি অভিযোগ করেন, অফিসের ভেতরেই কর্মচারীদের মারধরের ঘটনাও ঘটেছে এবং সম্প্রতি এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সংক্রান্ত প্রতিটি দলিলে ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়। অন্যান্য দলিলের ক্ষেত্রেও সরকার নির্ধারিত ফির বাইরে টাকা দিতে বাধ্য করা হয়।
প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, রাজধানীর লালবাগ এলাকার আজিমপুর রোডে জাকির হোসেনের একটি ফ্ল্যাট ও দামি গাড়ি আছে। এসব সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানান তদন্ত কর্মকর্তা।
এ ছাড়া বিভিন্ন অভিযোগ ও সরকারি দপ্তরের চিঠিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ২৫ জানুয়ারি কর কমিশনের আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট থেকে সাবরেজিস্ট্রার জাকির হোসেন ও তাঁর স্ত্রী মনিরা সুলতানার ব্যাংক হিসাব তলব করা হয়। তবে পরে সে বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা জানা যায়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিনিয়র সহকারী সচিব মো. মঈনুদ্দিন কাদির বলেন, অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। ইতিমধ্যে কয়েকজনের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে এবং আরও তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
উল্লেখ্য, একই ধরনের অভিযোগে ২০২৫ সালের জুন মাসে সাবরেজিস্ট্রার জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে তদন্ত হয়। ওই সময় আইন ও বিচার বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব মো. মাহবুবুর রহমান তদন্ত করলেও পরে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
