সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ রাত
MENU
#
জ্বালানি সংকটে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ২৪ শতাংশ কমেছে
daily-fulki

জ্বালানি সংকটে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ২৪ শতাংশ কমেছে

 

স্টাফ রিপোর্টার : জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের শিল্পকারখানা বড় ধরনের চাপে পড়েছে। জ্বালানি তেল ও গ্যাসের ঘাটতি এবং লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন কমেছে। এর সঙ্গে পরিবহনের বাড়তি ব্যয়ও যুক্ত হয়েছে। গত দুই মাসে তৈরি পোশাক, ইস্পাত, সিমেন্ট, ওষুধ, হিমায়িত মৎস্য, ভোগ্যপণ্য তৈরির কারখানায় উৎপাদন কমেছে গড়ে ২৪ শতাংশ। একই সময়ে পরিচালন ব্যয় বেড়েছে ৩০ শতাংশের বেশি। গত এক সপ্তাহে চট্টগ্রাম, সাভার, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, খুলনা, মুন্সীগঞ্জের প্রধান শিল্পাঞ্চল ঘুরে এবং তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র পাওয়া গেছে। 

দেশের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র চট্টগ্রামে সচল থাকা এক হাজার ৬৭৬টি শিল্পকারখানার মধ্যে পোশাক, রি-রোলিং মিল, জাহাজ ভাঙা ও সিমেন্টের মতো ভারী শিল্পগুলোই প্রধান। জ্বালানি সংকটের কারণে এ ধরনের শিল্পে উৎপাদন প্রায় এক-চতুর্থাংশ কমেছে। এ ছাড়া সাভার-আশুলিয়ায় সাড়ে তিন শতাধিক সচল পোশাক কারখানা ও আনুষঙ্গিক প্রতিষ্ঠান আছে। সেগুলোতে  দৈনিক উৎপাদন এক লাখ পিস থেকে নেমে এসেছে ৮০-৯০ হাজারে। 

গাজীপুরে ছোট-বড় প্রায় পাঁচ হাজার শিল্পকারখানা রয়েছে, যার একটি বড় অংশ টেক্সটাইল ও ডাইং। এখানে বিদ্যুৎ ঘাটতি ৩০ শতাংশে পৌঁছে যাওয়ায় উৎপাদন কমেছে প্রায় ২৫ শতাংশ। অন্যদিকে, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে প্রায় দুই হাজার ছোট-বড় বস্ত্র ও পোশাক কারখানায় ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। এ ছাড়া কুমিল্লার রপ্তানিমুখী বিভিন্ন ইউনিট, ময়মনসিংহের ভালুকা এলাকার টেক্সটাইল হাব এবং খুলনার সহস্রাধিক হিমায়িত মৎস্য ও পাটজাত পণ্য উৎপাদনকারী কারখানায় উৎপাদন ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। 

উৎপাদন কমার পাশাপাশি দ্রুত বাড়ছে ব্যয়। জ্বালানি সংকটে জেনারেটরনির্ভরতা বাড়ায় অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুতের তুলনায় খরচ দ্বিগুণ হয়েছে। পরিবহন ব্যয় ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় সময়মতো পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে অনেক উদ্যোক্তাকে বাড়তি খরচে বিকল্প ব্যবস্থায় যেতে হচ্ছে। এর সঙ্গে কাঁচামালের আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধি যুক্ত হয়ে রপ্তানি খাতেও চাপ তৈরি করছে। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করতে না পারা এবং গ্যাস সরবরাহে ঘাটতির কারণে ভারী শিল্পগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। উৎপাদন সক্ষমতা হ্রাস ও ব্যয় বৃদ্ধির এই দ্বৈত চাপে দেশের শিল্প খাত এখন কঠিন সময় পার করছে। এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। 

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘আমরা বিপিসিকে বলেছি কার কতটুকু জ্বালানি দরকার, সেই তালিকা অনুযায়ী বিজিএমইএ সদস্যদের জ্বালানি কার্ড দিতে। এই কার্ড দেখিয়ে ব্যবসায়ীরা যে কোনো পাম্প থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তেল নিতে পারবেন।’ সংকট থেকে উত্তরণে শিল্প কারখানাগুলোকে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় তিনি সৌর প্যানেল বসানোর ওপরেও গুরুত্ব আরোপ করেন।
চতুর্মুখী চাপে চট্টগ্রামের শিল্পকারখানা 

চট্টগ্রাম থেকে সারোয়ার সুমন জানিয়েছেন, গত জানুয়ারিতেও প্রতিদিন চার হাজার টন রড উৎপাদন করেছে আবুল খায়ের স্টিল। উৎপাদন কমতে কমতে এখন সেটি দাঁড়িয়েছে সাড়ে তিন হাজার টনে। প্রতিদিন তিন হাজার টনের সক্ষমতা থাকা জিপিএইচ ইস্পাতের উৎপাদন দুই মাসের ব্যবধানে নেমে এসেছে এক হাজার ৮০০ টনে। একইভাবে ফেব্রুয়ারিতে প্রতিদিন গড়ে চার হাজার টন সিমেন্ট উৎপাদন করা কনফিডেন্স সিমেন্টের উৎপাদন এখন তিন হাজার টনে। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে এসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ২৫ শতাংশ কমলেও একই সময়ে তাদের পরিচালনা খরচ বেড়ে গেছে ৩০ শতাংশ। শুধু এই প্রতিষ্ঠানগুলোই নয়; জ্বালানি সংকটে স্মরণকালের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে চট্টগ্রামের এক হাজার ৬৭৬টি নিবন্ধিত শিল্পকারখানা। 

চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলেল তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৫৭০টি গার্মেন্টস কারখানায় উৎপাদন ২৪% হ্রাস পেয়েছে এবং ব্যয় বেড়েছে ৩০%। ৫০টি রি-রোলিং মিলসে উৎপাদন ৩০% কমে ব্যয় বেড়েছে ৩৫%। সংকটে থাকা ৭৩টি জাহাজ ভাঙা শিল্পে সর্বোচ্চ ৪০% উৎপাদন কমেছে। এছাড়া ৯টি সিমেন্ট কারখানায় ৩০%, ১১টি স্পিনিং মিলে ১৫% এবং ১৬টি অক্সিজেন কারখানায় ২০% উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি ব্যয় বেড়েছে গড়ে ৩০%। ১৫টি গ্যাস কারখানায় উৎপাদন ৩০% কমে ব্যয় বেড়েছে ৩৫%। ৯টি তেল শোধনাগারে উৎপাদন ২০% কমলেও ৪টি সার-কারখানা বর্তমানে সম্পূর্ণ বন্ধ। ওষুধ, চা ও রাবার বাগানে উৎপাদন ১০-২০% হ্রাস পেয়েছে এবং ব্যয় বেড়েছে ২৫% পর্যন্ত। ২৬টি টেক্সটাইল ও ২৮টি স্পিনিং কারখানায় ৩০% উৎপাদন হ্রাসের বিপরীতে ৩৫% ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অন্যান্য ৮২২টি কারখানায় উৎপাদন ২৫% কমে ব্যয় বেড়েছে ৩০%। সব মিলিয়ে চট্টগ্রামের মোট ১৬৭৬টি কারখানাই বর্তমানে উৎপাদন সংকট ও ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের মুখে রয়েছে।

দেশের মোট ইস্পাত শিল্পের ৬২ শতাংশ ও পোশাকশিল্পের ৩০ শতাংশই চট্টগ্রামে অবস্থিত। জাহাজ ভাঙা শিল্পের শতভাগ পরিচালনা করেন এ অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা। এ ছাড়া সিইপিজেড, কেইপিজেড ও কোরিয়ান ইপিজেডের মতো শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান এবং গুরুত্বপূর্ণ সার কারখানা ও সিমেন্ট শিল্প এখানে অবস্থিত। চট্টগ্রাম বন্দর ও পাইকারি মোকাম খাতুনগঞ্জ থাকায় প্রতিদিন ৩০ হাজারেরও বেশি ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও ট্রলির মতো বড় গাড়ি চলাচল করে। বাণিজ্যিক রাজধানী বলা হলেও এখানকার কারখানাগুলো চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎও পাচ্ছে না।

কারখানা সচল রাখতে উদ্যোক্তাদের জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কিন্তু সেই জেনারেটরের ডিজেল পেতে পাম্পে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কারখানা মালিকরা বলছেন, দুই মাস আগে যে গাড়িটি দিনে তিনটি ট্রিপ দিত, এখন সেটি একটি ট্রিপ দেওয়ার সময় পাচ্ছে না। এর ওপর গত সপ্তাহে জ্বালানির দাম বাড়ার ঘটনায় ব্যবসায়ীদের খরচের খাতা আরও বড় হয়েছে। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে সিমেন্টের মতো ভারী শিল্পের মেশিন একবার বন্ধ হলে পুনরায় চালু করতে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় নষ্ট হচ্ছে। এটি উৎপাদন সক্ষমতা ও যন্ত্রপাতির আয়ু কমিয়ে দিচ্ছে। মেশিনকে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছে রড উৎপাদনকারী কারখানাগুলো। 

বাড়ছে উৎপাদন ব্যয় 
চট্টগ্রামের শিল্পকারখানাগুলো মূলত গ্যাসনির্ভর। কিন্তু মগ্যাসের চাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের চেয়ারম্যান এস এম আবু তৈয়ব বলেন, ‘জ্বালানি তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল প্রতিটি কারখানা। এটার ওপর নির্ভরশীল দেশের পরিবহন খাতও। যুদ্ধের কারণে এই তিন খাতেই তৈরি হয়েছে সংকট। যার প্রভাবে ক্রয়াদেশের সঙ্গে কমেছে উৎপাদন। আবার বেড়ে গেছে খরচ।’ 

দুই মাসের ব্যবধানে প্রতি টন রড উৎপাদনে ৫০০-৭০০ টাকা খরচ বেড়েছে উল্লেখ করে এইচ এম স্টিলের পরিচালক সরওয়ার আলম বলেন, সিমেন্ট শিল্পে উৎপাদন ব্যয় প্রতি ব্যাগে বেড়েছে ২০ থেকে ২৫ টাকা। দুই মাস আগেও বন্দর থেকে সীতাকুণ্ডের কুমিরার কারখানাতে ৪০ ফুট এককের একটি কনটেইনার ট্রেইলারে করে নিতে খরচ হতো সর্বোচ্চ ১১ হাজার টাকা। এখন সেটি নিতে গুনতে হচ্ছে ১৮ হাজার টাকা। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় গাড়িভাড়া ২০ হাজার থেকে বেড়ে ২৮ হাজার টাকা হয়েছে।’ 
ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ জানান, স্টিল স্ক্র্যাপের মূল্য টনপ্রতি ৭০-৯০ ডলার এবং ওষুধের উপকরণের ব্যয় ৭০০-১৮০০ ডলার বেড়েছে। এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৯০০ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৯০ টাকায়। 

দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছে রপ্তানির তথ্য 
জ্বালানি সংকটের প্রভাব সরাসরি পড়ছে দেশের রপ্তানি আয়ের ওপর। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘পোশাক কারখানার সার্বিক উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমে গেছে। অন্যদিকে ব্যয় বেড়ে গেছে ৩০ শতাংশের বেশি। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের একক বৃহত্তম রপ্তানি বাজার। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন বাড়তি শুল্ক ঘোষণার পর আট মাস ধরে পোশাক খাতে রপ্তানি কমার ধারা অব্যাহত আছে। এটা দেশের জন্য অশনিসংকেত।’

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, গত মার্চে বাংলাদেশ প্রায় ২৮১ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ কম। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে রপ্তানি কমেছে ৫ দশমিক ৫১ শতাংশ। 

জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি কাঁচামালের আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধিও ব্যবসায়ীদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে। জিপিএইচ ইস্পাতের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমাস শিমুল বলেন, ‘উৎপাদন কমে গেছে ২৫ শতাংশ। বিপরীতে খরচ বেড়েছে ৩০ শতাংশ। কারণ দেশে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুৎ নিয়ে সংকট চলছে। আবার বিদেশে কাঁচামালের দাম টনপ্রতি বেড়ে গেছে ১০০ ডলারের বেশি।’
বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘বিদেশ থেকে যে তুলা আমদানি করা হয়, সেটার দাম কেজিতে ৬০ থেকে ৬৫ সেন্টস বেড়েছে। বেড়ে গেছে পলিয়েস্টার ও নাইলনের মতো পেট্রোলিয়াম বাইপ্রোডাক্টসের দামও।’ 

ভারী শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই 
মার্কেট ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড কনসালটিংয়ের প্ল্যাটফর্ম বিগমিন্টের তথ্য অনুসারে, দেশে ছোট-বড় ইস্পাত কারখানার মধ্যে চট্টগ্রামে রয়েছে ৬২ শতাংশ। ঢাকায় আছে ৩২ শতাংশ। সীতাকুণ্ড উপজেলাতেই রয়েছে অন্তত ১৬০টি ভারী শিল্পকারখানা। ইস্পাত ও সিমেন্ট শিল্পের যন্ত্রাংশ নিয়মিত লোডশেডিংয়ের ফলে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। 

কনফিডেন্স সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘অপরিকল্পিত লোডশেডিং ভারী শিল্প কারখানার যন্ত্রাংশের সক্ষমতা নষ্ট করে দিচ্ছে। সময় নির্ধারণ করে লোডশেডিং দেওয়া হলে আগেভাগে প্রস্তুতি নিতে পারবেন কারখানার মালিকরা। অন্যথায় যে খরচ এখন ৩০ শতাংশ বেড়েছে, সেটি কয়েক মাস পরে ৫০ শতাংশ হবে।’ 

কেএসআরএমের মিডিয়া অ্যাডভাইজার মিজানুল ইসলাম বলেন, ‘এক মিনিটের জন্যও ইস্পাত কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখা যায় না। যুদ্ধের কারণে বাড়ছে কাঁচামালের দাম। পরিবহনের বাড়তি খরচ যুক্ত হওয়ায় সার্বিকভাবে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে অন্তত ৩০ শতাংশ।’
আবুল খায়ের স্টিলের উপমহাব্যবস্থাপক ইমরুল কাদের ভূঁইয়া জানান, উৎপাদন খরচ বাড়লেও তারা সেই অনুপাতে রডের দাম বাড়াতে পারছেন না। কারণ এতে চাহিদা আরও কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

পোশাক কারখানাতেও উৎপাদন কমেছে 
সাভার থেকে গোবিন্দ আচার্য্য জানিয়েছেন, সাভার-আশুলিয়ায় সাড়ে তিন শতাধিক সচল পোশাক কারখানা ও আনুষঙ্গিক প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমেছে। সাভার পৌর এলাকার বৃহত্তর শিল্প প্রতিষ্ঠান জে কে গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার মাহবুব আলম বলেন, ‘যেখানে প্রতিদিন এক লাখ থেকে এক লাখ ১০ হাজার পিস পণ্য উৎপাদন হতো, সেখানে এখন ৮০ থেকে ৯০ হাজার পিস হচ্ছে। শুধু উৎপাদনই নয়, পণ্য শিপমেন্টের জন্য চট্টগ্রামে পাঠাতে কাভার্ডভ্যান তেলের অভাবে পথেই আটকা পড়ছে। এ কারণে অনেক কারখানার মালিককে তৈরি পণ্য নিজ খরচে উড়োজাহাজে পাঠাতে হচ্ছে।’
স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের স্টিচেচ লিমিটেডের উৎপাদন পরিকল্পনা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, প্রতিদিন ১৫-২০ হাজার পিস পণ্য উৎপাদন হলেও এখন তা ১০ হাজারে নেমে এসেছে। একেএইচ গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক ফরিদুল আলম বলেন, ‘তেলের অভাবে সঠিক সময়ে শিপমেন্ট করা যাচ্ছে না। ফলে বিদেশি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান তাদের ক্রয়াদেশ কমিয়ে দিচ্ছে।’

সংকটে ছোট টেক্সটাইল ও ডাইং কারখানা 
গাজীপুর থেকে ইজাজ আহ্‌মেদ মিলন জানিয়েছেন, জেলার প্রায় পাঁচ হাজার শিল্পকারখানার মধ্যে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় উৎপাদন চালু রাখলেও ছোট কারখানাগুলো ধ্বংসের মুখে। লোডশেডিংয়ের কারণে জেনারেটর চালাতে গিয়ে উৎপাদন খরচ ৩ গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। ক্রাউন কটন কারখানার এক কর্মকর্তা বলেন, ‘লোডশেডিংয়ের কারণে জেনারেটর চালাতে খরচ হচ্ছে ৩ গুণ বেশি। আগে জ্বালানি খরচ দুই লাখ টাকা হলে এখন হচ্ছে ছয় লাখ।’
মৌচাক এলাকার রুমো গ্রুপের ফ্যাশন টু-ডাই লিমিটেডের এজিএম জামিউল হক মিসির জানান, প্রতিদিন ১১ ঘণ্টা উৎপাদনের টার্গেট থাকলেও সাত-আট ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না।
গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর মহাব্যবস্থাপক আবুল বাশার আজাদ জানান, চাহিদার তুলনায় ১৭২ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকায় তারা ৩০ শতাংশ লোডশেডিং দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে জেলায় চার-পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না।

রূপগঞ্জে অর্ধেকে নেমেছে বস্ত্র খাতের উৎপাদন
নারায়ণগঞ্জ থেকে শরীফ উদ্দিন সবুজ ও জিয়াউর রাশেদ জানিয়েছেন, জেলার শিল্প মালিকরা পাম্প থেকে ড্রামে ডিজেল নিতে না পারায় নতুন সংকটে পড়েছেন। বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে এহসান শামীম বলেন, ‘যুদ্ধের ফলে আমাদের ব্যবহৃত প্রায় সব কাঁচামালের দাম ও পরিবহন খরচ মিলিয়ে ২০ শতাংশ বেড়ে গেছে।’
রূপগঞ্জের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। ভূলতা, কাঞ্চন ও তারাব এলাকার প্রায় দুই হাজার কারখানায় উৎপাদন এখন অর্ধেকে নেমেছে। রূপা টেক্সটাইল মিলসের মালিক খলিল শিকদার বলেন, ‘আগে আমাদের কারখানায় প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার পিস কাপড় উৎপাদন হতো। এখন তা কমে পাঁচ হাজারের নিচে নেমে এসেছে।’ জুনায়েত ফ্যাশন গার্মেন্টসের মালিক ইমরান হোসেন জানান, দিনে ১৫-২০ বার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। আবার জ্বালানি তেলের অভাবে জেনারেটর চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।

মোবাইল ও রড উৎপাদন ব্যাহত
কুমিল্লা থেকে কামাল উদ্দিন জানিয়েছেন, জেলার রপ্তানিমুখী শিল্পাঞ্চলগুলোয় ১০ থেকে ২০ শতাংশ উৎপাদন কমেছে। জেলার একমাত্র মোবাইল তৈরির কারখানা হালিমা টেলিকমের দুটি ইউনিটে প্রতিদিন গড়ে তিন ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ থাকছে না। প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী আবুল কালাম হাসান টগর বলেন, ‘কারখানা সচল রাখতে জেনারেটর ব্যবহার করা হলেও প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০ শতাংশ উৎপাদন কম হচ্ছে।’ 
অন্যদিকে, রড উৎপাদনকারী সফিউল আলম স্টিল কারখানায় প্রতিদিন তিন থেকে চার ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। জেনারেটর দিয়ে ভারী মেশিন চালানো সম্ভব না হওয়ায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হয়। প্রতিষ্ঠানের এজিএম প্রণব কুমার বলেন, ‘উৎপাদন ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমে গেলেও শ্রমিকদের নিয়ম অনুযায়ী বেতন পরিশোধ করতে হচ্ছে। এতে প্রতিষ্ঠান বড় ধরনের আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছে।’
 
ভালুকার টেক্সটাইলে খরচ বেড়েছে ২০ শতাংশ 
ময়মনসিংহ থেকে তানভীর হোসাইন জানিয়েছেন, জেলার ভালুকা ও কাঠালী এলাকায় গ্যাস সংযোগ থাকা কারখানাতেও অস্থিরতা বিরাজ করছে। শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজের জিএম মোকলেসুর রহমান বলেন, ‘পরিবহন ব্যয় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘ মেয়াদে এর প্রভাব ভয়ংকর হতে পারে। আর যেসব কারখানায় ডিজেলচালিত জেনারেটর রয়েছে, উৎপাদন ব্যয় ২০ থেকে ২৫ ভাগ বাড়বে। এসব কারখানার উৎপাদন চালু রাখা প্রায় অসম্ভব হবে।’ 

হিমায়িত মৎস্য ও পাটজাত পণ্য উৎপাদন কমেছে 
খুলনা থেকে হাসান হিমালয় জানিয়েছেন, এখানকার সহস্রাধিক হিমায়িত মৎস্য ও পাটজাত পণ্য উৎপাদনকারী কারখানায় উৎপাদন ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। রূপসা ও ইলাইপুর এলাকার হিমায়িত মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলোয় লোডশেডিংয়ের কারণে হিমাগারের তাপমাত্রা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফ্রেস ফুডস লিমিটেড জানায়, গত বুধবার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাঁচবারে প্রায় আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। মাছের গুণগত মান ঠিক রাখতে জেনারেটর চালানো হলেও ব্যয়ের হিসাব আকাশছোঁয়া। স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক বিদ্যুৎ বিল যেখানে ২৯ হাজার টাকা আসে, সেখানে একই সময় জেনারেটর চালাতে ডিজেল কিনতে হচ্ছে ৫৫ হাজার টাকার বেশি।

খুলনায় দেশের একমাত্র কেবল তৈরির প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কেবল শিল্প লিমিটেডের উৎপাদন দৈনিক ৪০ কিলোমিটার থেকে ২৫ কিলোমিটারে নেমে এসেছে। প্রতিষ্ঠানের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী এনামুল হক বলেন, চাহিদা বেশি থাকায় জেনারেটর দিয়ে উৎপাদন করতে চাইলেও জ্বালানি তেল সংকটে মাঝেমধ্যে সেটিও করা যাচ্ছে না। 

হিমাগারে আলু রক্ষা করাই দায় 
মুন্সীগঞ্জ থেকে কাজী সাব্বির আহমেদ দীপু জানিয়েছেন, জ্বালানি সংকটে আলু উৎপাদনের প্রধান অঞ্চল মুন্সীগঞ্জের মুক্তারপুর ও গজারিয়ার হিমাগারগুলো বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। জেলায় নিবন্ধিত প্রায় ৭৪টি হিমাগার রয়েছে। হিমাগার মালিকরা জানাচ্ছেন, হিমাগার সচল রাখতে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে দিনে ৮-১০ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। একজন হিমাগার মালিক বলেন, ‘জেনারেটর দিয়ে দীর্ঘ সময় কোল্ডস্টোরেজের তাপমাত্রা ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। ডিজেলের দাম বাড়ায় খরচ দ্বিগুণ হয়েছে।’ 

এ ছাড়া মুক্তারপুর ও গজারিয়া অঞ্চলে কয়েকটি সিমেন্ট কারখানা, জাহাজনির্মাণ শিল্প, টেক্সটাইল মিলসহ দুই শতাধিক মাঝারি ও ভারী শিল্পকারখানা রয়েছে। মুন্সীগঞ্জ বিসিক শিল্পনগরীর একজন উদ্যোক্তা জানান, গত এক মাসে বিদ্যুতের ভয়াবহ লোডশেডিং ও ডিজেল সংকটে এখানকার কারখানাগুলোর উৎপাদন অন্তত ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমেছে। 

সর্বাধিক পঠিত