দেশের প্রায় ৬১টি জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে হামের প্রকোপ। অতি সংক্রামক এই রোগের ছোবলে এক মাসের কিছু বেশি সময়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে দুইশ চল্লিশ জন শিশু, যাদের অধিকাংশেরই বয়স পাঁচ বছরের নিচে।
শিশুদের এই মৃত্যু কি কেবলই নিয়তি, নাকি স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টদের অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার ফল- জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, প্রতিরোধযোগ্য হামে আমাদের কোমলমতি শিশুদের অকালে এই মৃত্যুর দায় কার?
চলতি বছরে হামের প্রকোপ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হামরোগীর সংখ্যা এক হাজার ৫৮ জন এবং গত ১৫ মার্চ থেকে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত সন্দেহজনক হামরোগীর সংখ্যা ৩০ হাজার ৬০৭ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামরোগীর সংখ্যা ২২৯ জন, গত ১৫ মার্চ থেকে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত নিশ্চিত হামরোগীর সংখ্যা চার হাজার ৪৬০ জন।
১৫ মার্চ থেকে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২০ হাজার ৪৭৫ জন। একই সময়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ১৭ হাজার ৮১ জন।
গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামে কারও মৃত্যু হয়নি এবং ১৫ মার্চ থেকে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত নিশ্চিত হামে ৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম সন্দেহে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১৫ মার্চ থেকে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত সন্দেহজনক হামে ২০৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) তথ্যমতে, দেশের ৬১টি জেলায় হাম ছড়িয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের ৮৩ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের নিচে।
যা বলছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা
বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সংস্থাটি দেশের হাম পরিস্থিতিকে জাতীয়ভাবে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে মূল্যায়ন করেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, হাসপাতালে যাওয়া রোগীদের বেশির ভাগই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। এই হার ৭৯ শতাংশ। এর মধ্যে দুই বছরের কম বয়সী শিশু ৬৬ শতাংশ এবং ৯ মাসের কম বয়সী শিশু ৩৩ শতাংশ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাবের আগে বাংলাদেশ হাম নির্মূলে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছিল। হাম প্রতিরোধী টিকার প্রথম ডোজের কভারেজ ২০০০ সালে ছিল ৮৯ শতাংশ। ২০১৬ সালে তা বেড়ে হয় ১১৮ শতাংশ। দ্বিতীয় ডোজ দেশব্যাপী চালুর পর ২০১২ সালে কভারেজ ছিল ২২ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা বেড়ে হয় ১২১ শতাংশ। এ সময়ে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হাম রোগীর হার দ্রুত কমছিল। তবে ২০২৪-২৫ সালে দেশে এমআর টিকার জাতীয় পর্যায়ের ঘাটতির কারণে টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ বা এমআর১ ও এমআর২ কভারেজ কমে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিয়মিত টিকাদানের অভাব এবং ২০২০ সালের পর নিয়মিত দেশব্যাপী সম্পূরক হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি না থাকা। এসব কারণে সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকা শিশুর সংখ্যা বেড়েছে এবং বর্তমান প্রাদুর্ভাব তৈরি হয়েছে।
সংস্থাটি জাতীয় পর্যায়ে হামের ‘উচ্চ ঝুঁকি’ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। কারণ হিসেবে বলছে, একাধিক বিভাগে সংক্রমণ চলমান, বিপুলসংখ্যক শিশু সংক্রমণের ঝুঁকিতে, রোগ প্রতিরোধের ঘাটতি নথিভুক্ত এবং হাম-সম্পর্কিত সন্দেহভাজন মৃত্যু ঘটেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে দায় কার?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে হাম বর্তমানে মহামারি রূপে দেখা দিয়েছে। হামের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য তারা, সময়মতো প্রয়োজনীয় শিশুদের হামের টিকার আওতায় না আনা, নিয়মিত হামের টিকার পাশাপাশি বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ, শিশুদের ভিটামিন এ ক্যাপসুলের ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকা এবং অপুষ্টি ও শিশুদের দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দায়ী করছেন।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় থেকেই স্বাস্থ্যকর্মীরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে পারেনি। অনেক বাবা-মা বাচ্চাদের টিকা দেননি। নিয়ম হলো, কয়েক বছর পরপর একটা গণটিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা। ২০২০ সালের পর গণটিকা দেওয়া হয়নি।
তিনি আরও বলেন, দেশে টিকা না পাওয়া বাচ্চার সংখ্যা বেড়ে গেছে। টিকা না পাওয়া বাচ্চাদের সংখ্যা বেড়ে এ বছর হামের মহামারি ঘটে গেল। যেকোনো সংক্রমণ যখন অনেক বেশি সংখ্যক হয়, তখন ভাইরাসটি মারাত্মক শক্তি ধারণ করে।
কেন হাম আক্রান্ত ও মৃত্যু বাড়ছে জানতে চাইলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, প্রথমত আমরা স্বল্প আয়ের একটা দেশ, আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নানাবিধ দুর্বলতা আছে। এই দুর্বলতার বড় প্রমাণ হলো আমরা সময়মতো হামের টিকা দিইনি এবং জাতিকে হুমকির মুখে ফেলেছি। যদি আমরা সময়মতো টিকা দিতে পারতাম, তাহলে যেই সংখ্যায় এখন মৃত্যু হচ্ছে, তা অনেক কমে আসতো।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে স্বাস্থ্য সংস্কার কমিটির সদস্য এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আবু মুহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, হামের টিকার সংকট নেই, অন্য টিকার সংকট আছে। বাংলাদেশে টিকার ৮০ শতাংশ দেয় গাভি (গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমুনাইজেশন)। সংস্থাটি ২০২৫ সালে হামের ক্যাম্পেইন করার জন্য টাকা দিয়েছিল। সেই টাকায় ইউনিসেফ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা টিকা কিনে রেখেছে কিন্তু ক্যাম্পেইন হয়নি।
তিনি আরও বলেন, টিকার অপর্যাপ্ততা না থাকা সত্ত্বেও টিকা না দেওয়ার একটা কারণ, স্বাস্থ্য সহকারীরা দেড় মাস কাজ করেনি। যে কারণে টিকার হার ৫৭ শতাংশে নেমে গেছে। হার্ড ইমিউনিটির জন্য হামের টিকা দেওয়ার হার ৯৫ শতাংশ থাকা দরকার। ৫৭ শতাংশের বাইরে তারা টিকা পায়নি। আগে সংক্রমণ হলে হাজারে তিন চারজন মারা যেত, এখন ১০ থেকে ১২ জন মারা যাচ্ছে। সম্ভবত হামের ভাইরাসের মধ্যে মিউটেশন হতে পারে। সেই কারণেই হয়তো মৃত্যু বেশি হচ্ছে। সংক্রমণ যত বেশি হবে, মৃত্যুও তত বেশি হবে। জিনোম সিকোয়োন্সিং করে দেখা দরকার মিউটেশন হয়েছে কি-না।
হামে মৃত্যুর দায় কার জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, যেখানে আমাদের দেশ ভ্যাকসিন দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য দেশ হিসেবে বিবেচিত হত এবং আন্তর্জাতিক পুরস্কারও লাভ করেছে। সেই দেশে প্রায় ছয় থেকে সাতটা রোগের বিরুদ্ধে আমাদের শিশুদের এবং বড়দের শরীরে হার্ড ইমিউনিটি ছিল। সেটা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকাদান কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই হার্ড ইমিউনিটি নষ্ট হয়ে গেল।
তিনি আরও বলেন, দেশে এখন অ্যান্টিভেনম টিকা নেই, এন্টি র্যাবিস টিকা নেই, ফলে শুধু হাম একা না, আরও অনেকগুলো রোগের প্রকোপ বৃদ্ধির উর্বর ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। অতএব যাদের সিদ্ধান্তের জন্য টিকা কেনা, টিকা দেওয়া বন্ধ ছিল, বর্তমান পরিস্থিতির জন্য তারাই দায়ী।
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ও টিকা সংকটের জন্য বিগত অন্তর্বর্তী সরকারকে দায়ী করে অতি সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শিশুদের হামের টিকা বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়নি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে হামের প্রাদুর্ভাব এবং শিশুদের মৃত্যুর জন্য দায় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্যখাতের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা নুরজাহান বেগম এবং বিশেষ সহকারী (স্বাস্থ্য) ডা. সায়েদুর রহমান এবং স্বাস্থ্যখাতের নীতি নির্ধারক পর্যায়ের ব্যক্তিরা। বিশেষ করে ডা. সায়েদুর রহমান একজন চিকিৎসক হয়েও কেন সংকট মোকাবিলায় কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করলেন না, কেন আমাদের শিশুদের মৃত্যু ঝুঁকিতে ঠেলে দিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য খাতের দায়িত্বে থাকা প্রত্যেক ব্যক্তিসহ যারা এ সংকটের জন্য দায়ী, তাদের সবাইকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত।
