স্টাফ রিপোর্টা : বর্তমান সরকার দেশজুড়ে ‘দেশব্যাপী নদী-নালা, খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখনন’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে সাভার উপজেলার হারিয়ে যাওয়া এবং দখল-দূষণ ও ভরাটের শিকার খালগুলো পুনরুদ্ধারে উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন।
সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী সারা দেশের ন্যায় সাভারের ৪০টি খালের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এরমধ্যে ৪টি খাল খননের জন্য ইতিমধ্যেই অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেছে, যার কাজ খুব শীঘ্রই শুরু হতে যাচ্ছে। এই কর্মসূচিটি মূলত বিগত বছরগুলোতে ভরাট ও দখল হয়ে যাওয়া ছোট-বড় খাল উদ্ধার এবং পুনঃখনন করা হবে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা নিরসন, শুষ্ক মৌসুমে সেচ সুবিধা নিশ্চিতকরণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলার আশা করা হচ্ছে।
সরেজমিনে ঘুরে বিভিন্ন লোকজনের সাথে কথা বলে জানাগেছে, সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল এলাকা হওয়ায় এখানকার অধিকাংশ খাল দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী ও আওয়ামী লীগ নেতাদের দখলে রয়েছে। অনেকে খাল দখলের পর ভরাট করে পাকা স্থাপনা তৈরী করেছে। বিভিন্ন হাউজিং কোম্পানির দখলেও রয়েছে খালের অংশ। আবার বিভিন্ন মিল-কারখানার বর্জ্য নিক্ষেপের ফলে ভরাট হয়ে খাল সরু নালায় পরিনত হয়েছে। এতে বর্ষা মৌসুমে এলাকায় স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হতো। সরকারের এই বিশেষ প্রকল্পের আওতায় খালগুলো খনন করা হলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরবে এবং কৃষিকাজ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ১৬ মার্চ দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলায় খাল খননের এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।
সাভার উপজেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দখল-দূষণ ও ভরাটের শিকার খালগুলো খননের জন্য সাভার উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন ও পৌর এলাকার ভিতরে ৪০টি খালের তালিকা করা হয়েছে। তালিকা অনুযায়ী শিমুলিয়া ইউনিয়নের দাওদারা খাল, নলির খাল, ডগরতলী খাল-১, ডগরতলী খাল-২, বারল খাল, কনডা ও সুবন্ধি খাল, গাজীবাড়ী খাল, রনস্থল ও কাচৈর খাল, ভাড়ারিয়া খাল। আশুলিয়া ইউনিয়নের গজারিয়া খাল, নয়নজুলি খাল। আমিনবাজার ইউনিয়নের বড় বড়দেশী, বেগুনবাড়ি, বনগ্রাম খাল। বনগাও ইউনিয়নের সাধাপুর, বিলবাঘিল, দেউল, ইসাকাবাদ, সাইপাড়া, বলিয়ারপুর খাল। বিরুলিয়া ইউনিয়নের বিরুলিয়া, বড়কাকর, উত্তরউলু মোড়া, চাকুলিয়া, আকরান, কুমারখোদা, কোন্ডা খাল। কাউন্দিয়া ইউনিয়নের উত্তর কাউন্দিয়া, গান্ধারিয়া খাল। সাভার পৌর এলাকার সাভার বাজার খাল, উত্তর শ্যামপুর খাল, কাতলাপুর খাল, কর্ণপাড়া খাল। সাভার সদর ইউনিয়নের ধরেন্ডা খাল। পাথালিয়া ইউনিয়নের দিয়াবাড়ি খাল, বড় ওয়ালিয়া খাল, মিরেরটেক খাল। তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের তেতুলঝোড়া জয়নাবাড়ী কুলাশুর খাল, বামনী খাল। ভাকুর্তা ইউনিয়নের তুরাগ/ভাকুর্তা খাল।
এইসব খাল পর্যায়ক্রমে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং কৃষি মন্ত্রণালয় যৌথভাবে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় কাবিখা (কাজের বিনিময়ে খাদ্য) ও টিআর (টেস্ট রিলিফ) প্রকল্পের আওতায় খনন বা পুনঃখনন করা হবে।
এরমধ্যে চারটি খাল খননের অনুমোদন হয়েছে। কর্ণপাড়া খাল, ডগরতলী-২, বড় কাকর খাল পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও বামনী খাল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে খননের অনুমোদন ও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
সাভারে প্রথম ধাপে যে ৪টি খাল খননের বরাদ্দ হয়েছে তার মধ্যে একটি রয়েছে তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের বামনী খান। এই খালটি দখল ও ভরাট করার অভিযোগ রয়েছে বেশ কয়েকটি বড় হাউজিং প্রকল্পের বিরুদ্ধে। সরকারি এই খালটি উদ্ধারে স্থানীয় জনগণ একাধিকবার আন্দোলন ও মানববন্ধন করেও কোন ফল পাইনি।
বামনী খাল দখলের সাথে সরাসরি সুগন্ধা হাউজিং, যমযম নূর সিটি, এস এ হাউজিং। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে হাইকোর্ট এই তিনটি হাউজিং এর বিরুদ্ধে খালের জায়গায় মাটি ভরাটসহ সব ধরণের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রদান করেছেন। এছাড়া রাজউক, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং ঢাকা জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এই তিনটি হাউজিং কোম্পানি কতটুকু জায়গা দখল করেছে তার সঠিক হিসাব আদালতে জমা দেওয়ার জন্য।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হেমায়েতপুর এলাকার এই বামনী খালটি ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে প্রায় ২০টি গ্রামের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে, ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এলাকাবাসী দীর্ঘদিন ধরে মানববন্ধন ও সমাবেশ করে খালটি দখলমুক্ত করার দাবি জানিয়ে আসছেন।
এদিকে এই জনগুরুত্বপূর্ণ বামনি খালটি দখলমুক্ত করে পুনঃখননের জন্য উপজেলা প্রশাসন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের সাথে নিয়ে পরিদর্শন করেছেন।
সাভার উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: সাইফুল ইসলাম বলেন, দৃশ্যমান ৪০টি খাল খননের তালিকা প্রস্তুত করে পাঠানো হয়েছে। তবে ছোটখাটো আরো খাল রয়েছে। ৪০টির মধ্য থেকে চারটি খালের অনুমোদন এবং খনন কাজের বরাদ্দ হয়েছে। এরমধ্যে কর্ণপাড়া খাল, ডগরতলী-২, বড় কাকর খাল পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও বামনী খাল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে খননের কাজ চলবে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে খনন কাজ শুরু হবে বলেও জানান তিনি।
