বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ রাত
MENU
#
পশ্চিমবঙ্গে কেন মাছ নিয়ে ভোটের প্রচার চালাচ্ছেন রাজনীতিবিদরা?
daily-fulki

পশ্চিমবঙ্গে কেন মাছ নিয়ে ভোটের প্রচার চালাচ্ছেন রাজনীতিবিদরা?


ফুলকি ডেস্ক : ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শহর কলকাতার এক ভ্যাপসা গরমের সকাল। ধবধবে সাদা আর লাল রঙের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে কৌস্তভ বাগচী ঘুরছেন দুয়ারে দুয়ারে। তবে তার হাতে কোনো লিফলেট নয়, বরং ধরা আছে জ্যান্ত মাছ।

পেছনে ঢাকের বাদ্যি আর সমর্থকরা তার নামে স্লোগান দিচ্ছে। পেশায় আইনজীবী থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) এই ব্যারাকপুর প্রার্থী ভোটারদের মন জয়ে কোনও লম্বা নীতি-নির্ধারণী ভাষণ দিচ্ছেন না; তার হাতের ওই মাছই নীরবে বার্তা দিচ্ছে, “আমি তোমাদেরই একজন।”

কয়েক কিলোমিটার দূরে কলকাতার বন্দর এলাকায় আরেক বিজেপি প্রার্থী রাকেশ সিংয়ের প্রচারেও দেখা গেছে একই দৃশ্য। শহরটির মেয়র ফিরহাদ হাকিমের বিরুদ্ধে কঠিন লড়াইয়ে নামা রাকেশ ভিড়ের মধ্যে বারবার মাছ উঁচিয়ে ধরছেন।


পশ্চিমবঙ্গে মাছ কেবল একটি খাদ্য নয়, এটি বাঙালির রক্তে মিশে থাকা সংস্কৃতি, স্মৃতি আর প্রাত্যহিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ; যা পরিচয় ও আপনত্বের বড় এক মাপকাঠি।

পশ্চিমবঙ্গজুড়ে এখন সেই মাছকেই রাজনীতির মাঠে নামানো হয়েছে একটি বিশেষ উদ্বেগ দূর করার অস্ত্র হিসেবে। নিজেদের আপন মানুষ হিসাবে তুলে ধরতে বিজেপি’র রাজনীতিবিদরা মাছ হাতে ‘রাজনৈতিক নাটক’ মঞ্চস্থ করছেন।

ভারতে খাদ্যাভ্যাস গভীর রাজনৈতিক রূপ নিতে পারে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দল বিজেপি-কে প্রায়শই কট্টর নিরামিষাশী আদর্শের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়।


বিজেপি শাসিত কিছু রাজ্যে মাংস বিক্রিতে মাঝেমধ্যে নিষেধাজ্ঞা বা গোরক্ষার নামে কড়াকড়ি এই ধারণাকে আরও মজবুত করেছে, যদিও ভারতের বিশাল জনগোষ্ঠী আমিষভোজী।

এবারের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে মাছ তাই আর থালার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই বরং প্রচারের কেন্দ্রে চলে এসেছে, যাকে ব্যবহার করা হচ্ছে বাঙালি সংস্কৃতিতে আনুগত্যের প্রমাণ হিসাবে এবং অনভিপ্রেত হওয়ার অভিযোগ ভুল প্রমাণ করতে।

পশ্চিমবঙ্গে চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় আসার লড়াইয়ে থাকা তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, বিজেপি বাঙালির জীবনধারার জন্য হুমকি। তারা বাঙালির মাছ-ভাত খাওয়ার চিরচেনা সংস্কৃতিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরছে।

জনসভায় মমতা বলেছেন, “বিজেপি আপনাদের মাছ খেতে দেবে না। তারা মাংস বা ডিমও খেতে দেবে না।”

৭১ বছর বয়সী এই লড়াকু নেত্রী অন্য এক সভায় গর্জে উঠে বলেন, “বাঙালি মাছ-ভাতে বাঁচে। আপনারা বলছেন মাছ-মাংস-ডিম খাওয়া যাবে না? তাহলে মানুষ খাবে কী?”

বিজেপিও মাছ হাতে নিয়ে এই অভিযোগের পাল্টা জবাব দিচ্ছে বেশ কড়াভাবেই। পশ্চিমবঙ্গে প্রচার চালাতে গিয়ে বিজেপি’র কেন্দ্রীয় নেত্রী স্মৃতি ইরানি মুখ্যমন্ত্রী মমতার দাবিকে ‘মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, “বাংলা এবং মাছ-ভাত একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, যা কখনও শেষ হবে না।”

কলকাতার রাসবিহারী আসনের বিজেপি প্রার্থী স্বপন দাশগুপ্ত একে দুর্নীতির দিক থেকে নজর ঘোরানোর ‘ভুয়া বয়ান’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

অন্যদিকে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজে নিরামিষাশী হলেও মাছকে টেনে এনেছেন পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনের ব্যর্থতা বোঝাতে। তার যুক্তি, দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থেকেও বাংলাকে মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে পারেনি তৃণমূল কংগ্রেস। তাদেরকে মাছ অন্য রাজ্য আনতে হয়।

মমতাও পাল্টা জবাবে বলেছেন, রাজ্যের ৮০ শতাংশ মাছ স্থানীয়ভাবেই উৎপাদিত হয়। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “বিজেপি শাসিত রাজ্য বিহার, উত্তরপ্রদেশ বা রাজস্থানে কেন মাছ খেতে দেওয়া হয় না? দিল্লিতে মাছের দোকানে হামলা হয় কেন? আপনাদের লজ্জা করে না?”

মাছ এখন কেবল একটি খাদ্য নয়, বরং এটি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

সাংস্কৃতিক উদ্বেগ এবং অর্থনৈতিক সমালোচনার মাঝে মাছ এখন এমন এক বিষয়ে পরিণত হয়েছে, যা দিয়ে দুই পক্ষই বোঝাতে চাইছে, ঠিক কী কী ঝুঁকির মুখে আছে।

ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মাছ উৎপাদনকারী দেশ হলেও মাথাপিছু মাছ খাওয়ার দিক থেকে এর অবস্থান অনেক পিছিয়ে (১২৯তম স্থানে)

তবে পশ্চিমবঙ্গে মাছের কদর সার্বজনীন। ২০২৪ সালে আইসিএআর এবং ওয়ার্ল্ডফিশের এক যৌথ সমীক্ষা অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ প্রতি সপ্তাহে মাছ খায়।

সমীক্ষায় আরও দেখা গেছে, ভারতের পূর্ব ও দক্ষিণের রাজ্যগুলোতে মাছ খাওয়ার হার ৯০ শতাংশের বেশি। ভারতজুড়ে মাছ খাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। বর্তমানে দেশটির ৭০ শতাংশের বেশি মানুষ মাছ খায়।

বাংলায় মাছের গুরুত্ব শুধু খাবারের প্লেটে নয়, সব সময়ই তার চেয়ে অনেক বেশি। তাই রাজনীতিতে এর প্রবেশ বলতে গেলে প্রায় অনিবার্যই ছিল।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসে মাছ যেমন ভাগ্য আর বেঁচে থাকার লড়াই, তেমনি অমিতভ ঘোষের ‘দ্য হাংরি টাইড’-এ মাছ সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থান ও অনিশ্চয়তার প্রতীক।

লেখক সামন্ত সুব্রমানিয়ান তার ‘ফলোয়িং ফিশ’ বইয়ে লিখেছেন, “বাঙালি রন্ধনশৈলী যদি উইম্বলডন হয়, তবে ইলিশ সেখানে সবসময় সেন্টার কোর্টে খেলবে।” মাছের কাঁটা ঠিকবমত বেছে খাওয়া সেখানে বাঙালির নিজস্ব সত্তার পরিচায়ক।


বাংলায় মাছের অর্থ কেবল খাবারের পাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, খাবারের বাইরেও এর আরও অনেক অর্থ আছে।

মাছের প্রকারভেদ দিয়ে ভৌগোলিক ইতিহাসও (গঙ্গা বনাম পদ্মা) চেনা যায়। দেশভাগের স্মৃতি (দুই বাংলার আলাদা হওয়া) থেকে শুরু করে শ্রেণিবিভাগ বা সামাজিক অবস্থান, সবই মিশে আছে মাছে।

কে কত দামি মাছ কিনতে পারছে বা কার সেই মাছ কাটার বিশেষ জ্ঞান আছে- এসবের ওপর ভিত্তি করেই হয় শ্রেণিবিভাগ। এমনকি কলকাতার ফুটবলের লড়াইও মাছ ছাড়া অসম্পূর্ণ।

ইস্টবেঙ্গল সমর্থকরা যেখানে ইলিশের ভক্ত, সেখানে মোহনবাগান সমর্থকদের পছন্দ চিংড়ি। অভিবাসন, সামাজিক অবস্থান আর স্বাদের এই বৈচিত্র্য বাঙালির গভীর ইতিহাসকেই তুলে ধরে।

সমাজবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদদের মতে, মাছের এই গভীর প্রতীকী অর্থের কারণেই রাজনীতিবিদরা একে টোপ হিসেবে ব্যবহার করছেন।

ইতিহাসবিদ জয়ন্ত সেনগুপ্তের মতে, “বিজেপি যেহেতু নিরামিষাশী আদর্শের সঙ্গে যুক্ত, তাই তৃণমূল মাছকে বাঙালির সাংস্কৃতিক গৌরবের মোড়কে উপস্থাপন করছে। মাছের এই গুরুত্বের কথা ভেবে বিজেপিও তাই মাছকে এড়িয়ে যেতে পারছে না।”

ফলে দুই দলের রাজনীতিবিদরাই বাঙালির প্রিয় এই খাবার নিয়ে একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি-র সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য সাংবাদিকদেরকে আগামী ৪ মে নির্বাচনী ফল ঘোষণার দিন ভাজা মাছ দিয়ে আপ্যায়নের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

অন্য এক সাক্ষাৎকারে তিনি রসিকতা করে বলেছেন, জয়ের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতেও বিভিন্ন রকমের ছোট মাছ পাঠানো হবে এবং তৃণমূল কর্মীদের ‘মাছ-ভাত’ খাওয়ার নিমন্ত্রণ দেওয়া হবে।

এর পেছনে একটি প্রচ্ছন্ন বার্তা রয়েছে যে, বিজেপি নির্বাচনের পর ক্ষমতায় এসে আপ্যায়নকারীর ভূমিকায় থাকবে, আর তাদের প্রতিপক্ষ আমন্ত্রণ গ্রহণ করবে।

নির্বাচনে পরিচয় বা জীবিকাকে কেন্দ্র করে এই প্রচারে মাছ হয়ত এককভাবে জয়-পরাজয় নির্ধারণ করে দেবে না। তবে মাছ এবারের নির্বাচনি লড়াইয়ে একটি কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা বুঝিয়ে দিচ্ছে বাঙালির রাজনীতি আর সংস্কৃতি কতটা অবিচ্ছেদ্য।

 

সর্বাধিক পঠিত