স্টাফ রিপোর্টার : দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে হামের প্রাদুর্ভাব। গত ২৮ দিনে হাম এবং তার উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন বিভাগে হাম রোগীর সংখ্যা ১৬ হাজার ৮৭৪ জন। এদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ১৭৯ জনের। পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়েছে ২ হাজার ৪৮৯ জনের। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ২৪ জনের। ঝুঁকিতে আছে—এক মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুরা, টিকাই এ রোগের সুরক্ষার প্রধান উপায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের এই সংক্রমণ আরও মাস খানেক থাকবে। তবে হামের মৃত্যু কমতে সময় লাগতে পারে দুই মাস। তবে হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত ও মৃত্যু দুটোই কয়েক গুণ বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুরা হামের সবচেয়ে ঝুঁকিতে। দীর্ঘ রোগ আক্রান্ত শিশু, ১২ মাসের কম বয়সী শিশু, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু, টিকা না নেওয়া ব্যক্তি এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধ-ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মোশতাক হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, হাম নিয়ন্ত্রণের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে—সেটি সফল হলে, এক মাসের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব কমে আসবে। এখন বাড়তেই থাকবে, টিকা তো সব জায়গায় দেওয়া হচ্ছে না। প্রাথমিকভাবে যেসব এলাকায় সংক্রমণ বেশি আছে, সেখানে টিকা দেওয়া হচ্ছে। গণটিকা শুরু হলে—সেটা বেশি কার্যকর হবে।
পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারের শিশুদের মধ্যে—যাদের জ্বর আছে, তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এনে রাখতে হবে, শিশুর মাকেসহ। এ সময় শিশুর বাবা-মাকে আর্থিক সাপোর্ট দিতে হবে। কারণ তাদের কাজে যাওয়া না হলে, বাচ্চাকে খাওয়াতে পারবে না, তখন তারা না খেয়ে মারা যাবে। এটা স্বাস্থ্য বিভাগের কাজ না, এখানে সমাজকল্যাণ বিভাগকে যুক্ত করতে হবে।
অর্থাৎ, যারা ঝুঁকিপূর্ণ শিশু তাদের চিকিৎসার আওতায় আনা, জটিল না হলেও হাসপাতালে এনে পর্যবেক্ষণ করা। এতে তারা জটিল জায়গায় যাবে না। তৃতীয় হচ্ছে—তাদের কাছ থেকে অন্যদের মধ্যে সংক্রমিত হবে না; বা ছড়াবে না। টিকা দেওয়ার সময় কর্মীরা কিন্তু বাড়ি বাড়ি যাচ্ছে না। হাসপাতালে বা উপজেলা হেল্থ কমপ্লেক্সে বসতেছে, সেখানে বাচ্চাদের এনে মায়েরা টিকা দিচ্ছে। বাড়ি বাড়ি যাওয়ার জন্য ভবিষ্যতে গণটিকা কার্যক্রম শুরু হবে। শহরে জ্বর আসা শিশুদের নগর হাসপাতালে এনে আইসোলেশনে রাখতে হবে। এসব করতে পারলে দেখা যাবে হামের সংক্রমণ এক মাসের মধ্যে কমে গেছে।
এই বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বলেন, হামের মৃত্যু কমে আসতে দুই মাস সময় লাগবে। হামের নিদিষ্ট কোনো সিজন নেই, তবে হাম শীত-গরমের মাঝামাঝি সময়ে হয়। যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, তাদের যে কোনো সময় হাম হতে পারে। সাধারণত এই সময়টাতে বেশি হয়। এ বছর হামে আক্রান্ত হয়ে শিশুদের মৃত্যু হচ্ছে বেশি।
চিকিত্সকরা বলছেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক। একজন আক্রান্ত শিশু থেকে প্রায় ৭০ জন পর্যন্ত সংক্রমিত হতে পারে। র্যাশ ওঠার আগে-পরে মিলিয়ে ৭ থেকে ৯ দিন রোগী সংক্রমণ ছড়াতে পারে। হামের নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিত্সা না থাকায় লক্ষণভিত্তিক চিকিত্সাই প্রধান ভরসা। জটিলতা দেখা দিলে প্রয়োজন অনুযায়ী অক্সিজেন বা অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়।
দেশে হামের সার্ভিল্যান্স কার্যক্রম পরিচালিত হয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সহায়তায় এবং সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) অধীনে। সংশ্লিষ্টরা জানান, রোগীর অতিরিক্ত চাপের কারণে নমুনা সংগ্রহ ও তথ্য যাচাই কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। ফলে অনেক রোগী নিশ্চিত শনাক্ত না হয়ে ‘সন্দেহভাজন’ হিসেবেই থেকে যাচ্ছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি: দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হাম সন্দেহে দুই জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময় নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছে ৮০ জন। এছাড়া সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত হয়ে ৮৮৮ জন হাসপাতালে চিকিত্সা নিয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ১১ এপ্রিল শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চের পর থেকে এ পর্যন্ত হামে ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সন্দেহভাজন হামজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ১৪৫ জন।
এছাড়া ১৫ মার্চের পর থেকে এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছে ২ হাজার ৪৮৯ জন। একই সময়ে সন্দেহভাজন হামে আক্রান্তের সংখ্যা ১৪ হাজার ৩৮৫ জন। ভর্তি হয়েছে ৯ হাজার ৪৬৩ জন এবং সুস্থ হয়েছে ৭ হাজার ২২ জন।
