বেনাপোল সংবাদদাতা : কবির ভাষায়, ‘বাবুই পাখিরে ডাকি বলিছে চড়াই, কুঁঁড়ে ঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই’। আবহমান গ্রাম বাংলার বাসা তৈরির যে নিখুত কারিগর, কবির কালজয়ী ‘স্বাধীনতার সুখ’ কবিতার নায়ক সেই বাবুই পাখি শিল্পের বড়াই করতেই পারে। তবে তাল গাছের স্বল্পতা আর প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে যশোরে শার্শা উপজেলা ও বেনাপোল পোর্ট থানার গ্রামাঞ্চলে বাবুই পাখি আজ নিজেই অস্তিত্ব সংকটে। সকলের ধারণা একই পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে একেবারেই বিলুপ্তির পথে প্রকৃতির চিরচেনা বাবুই পাখির বাসা। অথচ আজ থেকে প্রায় ১০-১২ বছর আগেও গ্রামে তাল গাছে দেখা মিলতো বাবুই পাখির বাসা।
দেশের অন্যান্য অঞ্চলের ন্যায় এ উপজেলা থেকেও বাবুই পাখি আজ বিলুপ্ত প্রায়। বহুদিন চোখে পড়েনা তাল গাছের পাতায় পাতায় ঝুলে থাকা নিপুণ কারিগর বাবুই পাখির বাসা। আর তরুণ প্রজন্ম যেন থমকে আছে বইয়ের পাতায়। নাম শুনলেও অধিকাংশেরই পাওয়া হয়নি চোখে দেখার সাধ। বছরের পর বছর নির্বিচারে তালগাছ নিধনে পাখির বসবাস উপযোগী পরিবেশ সংকট, ফসলি জমিতে অবাধে কীটনাশক প্রয়োগ, পাখি শিকারিদের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি আর জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব এ অঞ্চল থেকে বাবুই পাখি বিলুপ্তির কারণ।
বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের সদস্য আনিছুর রহমান জানান, আগের মতো এখন আর চোখেই পড়ে না বাবুই পাখি ও তার তৈরি দৃষ্টিনন্দন ছোট্র বাসা তৈরির নৈসর্গিক দৃশ্য। বাবুই পাখির নিখুঁত বুননে এ বাসা টেনে ছেঁড়াও কষ্টসাধ্য।
বাবুই পাখি সাধারণত তিন ধরনের বাসা তৈরি করে। নিচের দিকে অনেক লম্বা সরু একটা রাস্তা থাকে, যে রাস্তা দিয়ে বাসার ভেতরে ঢোকে। এমন বাসা অনাগত ছানার জন্য নিরাপদ। আরেক ধরনের বাসার বেশিরভাগ অংশ খোলা থাক। এমন বাসা বানানোর পেছনের কারণ হচ্ছে, বাবুই পাখিটি এই বাসায় বিশ্রাম করে বা এখানে বসে আশেপাশে সতর্ক পাহারা বসায়। আরেকটি বিশেষ ধরনের বাসা বানায়, যার ভেতরে দুইটি অংশ থাকে। সে বাসায় সংসার ছানাসহ বিশ্রামের আলাদা জায়গা থাকে। প্রতি তালগাছে ১০০ থেকে ১১০টি বাসা তৈরি করতে সময় লাগে ৮-১০ দিন। খড়, কুটা, তালপাতা, খেজুর পাতা, ঝাউ ও লতা-পাতা দিয়ে বাবুই পাখি উচু তালগাছে তাদের বাসা বাঁধে। এ বাসা দেখতে যেমন আকর্ষণীয় লাগে, ঠিক তেমনি অনেক মজবুত। প্রবল ঝড়েও তাদের বাসা ছিড়ে নিচে পড়ে না। পুরুষ বাবুই পাখি বাসা তৈরির কাজ শেষ হলে সঙ্গী খুঁজতে বের হয়। সঙ্গী পছন্দ হলে স্ত্রী বাবুইকে সাথী বানানোর জন্য পুরুষ বাবুই নিজেকে আকর্ষণীয় করতে খাল, বিল ও ডোবার পানিতে গোসল করে গাছের ডালে ডালে নেচে বেড়ায়। বাবুই পাখির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, রাতের বেলায় ঘর আলোকিত করতে বাসার ভিতর এক চিমটি গোবর রেখে জোনাকি পোকা ধরে এনে তার উপর বসিয়ে দেয় এবং সকাল হলে ছেড়ে দেয়। প্রজনন সময় ছাড়া বাবুই পাখির গায়ে ও পিঠে তামাটে কালো বর্ণের দাগ হয়। ঠোঁট পুরো মোসাকার ও লেজ চৌকা।
বেনাপোল পৌরসভা বড়আঁচড়া গ্রামের বাসিন্দা লোকমান হোসেন রাসেল জানান, তাল গাছের স্বল্পতা আর প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে বাবুই পাখি নিজেই আজ অস্তিত্ব সংকটে। কালের বিবর্তনে নেই শিল্পের বড়াই। তাই আর কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত হয় না গ্রামবাংলার জনপদ।
বেনাপোল ডিগ্রী কলেজ অধ্যাপক শরিফুল আলম শাহীন বলেন, অথচ মাত্র ক‘বছর আগেও গ্রাম্য মেঠো পথ কিংবা প্রতিটি বাড়ির আনাচে-কানাচে তাল গাছের পাতায় পাতায় উুঁকি দিত মন ভুলানো বাবুই পাখি ও দৃষ্টিনন্দন বাসা। তিনি আরো বলেন, তবে এখন চিরচেনা সেই ছায়া সুনিবিড় গ্রামাঞ্চলেই বাবুই পাখি চোখে মেলানো ভার। মেঠোপথ বেয়ে মাইলের পর মাইল হাঁটলেও চোখে পড়েনা ঐতিহ্যের বাহক বাবুই পাখির বাসা।
স্থানীয়রা মনে করেন, উপজেলায় আবহমান গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের বাহক বাবুই পাখির শৈল্পিক ধরে রাখা, অস্তিত্ব রক্ষায় জরুরি উদ্যোগ গ্রহণ সময়ের ধারা। বাবুই পাখির অস্তিত্ব রক্ষায় উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি ওই সকল পাখি শিকারিদের আইনের আওতায় নিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিও জানান তারা।
উপজেলা কৃষি অফিসার দীপক কুমার সাহা জানান, সচেতনতা ছাড়া পাখি তথা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সম্ভব নয়। তাই সম্মিলিতভাবে নিজ নিজ এলাকায় এ ব্যাপারে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করে পাখির বসবাস উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টিতে সকলের সুদৃষ্টি দিতে হবে। উপজেলা থেকে তাল গাছের চারা বিতরণ করা হবে। যাতে করে অদূর ভবিষ্যৎ গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের বাহক বাবুই পাখির ধরে রাখা অস্তিত্ব রক্ষায় জরুরি উদ্যোগ সকলের গ্রহণ করা বলে জানান তিনি।
