ফুলকি ডেস্ক : ওয়াশিংটনের শর্ত মেনে যুদ্ধ শেষ করার চুক্তিতে সম্মত না হলে ইরানকে প্রস্তর যুগে পাঠানোর হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত বুধবার রাতে ওয়াশিংটনে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি এ হুমকি দেন। জবাবে ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে তেহরান বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা জোরদার করলে তারা ইসরায়েল ও প্রতিবেশী দেশগুলোয় মার্কিন স্থাপনায় ব্যাপক হামলা চালাবে। পাল্টাপাল্টি হুমকি-ধমকির মধ্যে চীন অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।
আলজাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়, ট্রাম্প ‘প্রস্তর যুগে পাঠানো’র যে বক্তব্য দিয়েছেন, কার্যত তা ব্যাপক বোমাবর্ষণ বা কার্পেট বম্বিংয়ের হুমকি। একটি দেশের আধুনিক সভ্যতার সব অবকাঠামো ধ্বংস করে দেওয়া, অর্থাৎ হাসপাতাল, স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পকারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, হোটেল, আকাশচুম্বী ভবন কিংবা পার্ক– কিছুই অক্ষত থাকবে না। এর আগে ইসরায়েলের নেতাদের গাজা ও লেবানন নিয়ে এমন হুমকি উচ্চারণ করতে দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, এ ধরনের হামলা তা গণহত্যার শামিল হতে পারে।
এ অবস্থায় বিশ্ব অর্থনীতিকে বড় ধাক্কা দিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। ট্রাম্প তাঁর ভাষণে বলেছেন, যুদ্ধ বন্ধ হলে এ প্রণালি স্বাভাবিকভাবেই খুলে যাবে। আলজাজিরা জানায়, জি-৭ ও উপসাগরীয় দেশগুলোর জোট জিজিসি হরমুজ প্রণালি খোলা নিয়ে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আলোচনা করবে। আর ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বলেছেন, জোর করে হরমুজ খোলার চেষ্টা বাস্তবসম্মত নয়।
জ্বালানি তেল ছাড়াও হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বব্যাপী ফসল উৎপাদনের জন্য সার রপ্তানি করা হয়। বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, কৃষকদের জন্য সার সরবরাহ স্বাভাবিক করতে প্রণালিতে একটি ‘মানবিক করিডোর’ গঠনের দাবি জানিয়েছে ইতালি। এ অবস্থায় যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়েত্তি কুপার জরুরি ভিত্তিতে হরমুজ উন্মুক্ত করার জোর দাবি জানিয়েছেন।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হওয়া এবং ট্রাম্পের বক্তব্যে উস্কানি কমার ইঙ্গিত না থাকায় জ্বালানি তেলের দাম আরেক দফা বেড়েছে। দ্য গার্ডিয়ান জানায়, গতকাল বৃহস্পতিবার অপরিশোধিত তেল ৪ শতাংশ বেড়ে ১০৫ দশমিক ৫৫ ডলার হয়েছে।
জাতির উদ্দেশে দেওয়া ১৯ মিনিটের ভাষণে ট্রাম্প যুদ্ধ শেষ করা নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট বার্তা দেননি। তিনি ইরানে কী কী ধ্বংস করেছেন এবং ভবিষ্যতে কী করবেন, তার ফিরিস্তি হুমকির সুরে আরও একবার তুলে ধরেছেন। ভাষণে ট্রাম্প বলেন, ‘আগামী দুই-তিন সপ্তাহ আমরা তাদের (ইরান) ওপর অত্যন্ত কঠোর আঘাত হানব। আমরা তাদের প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাব, যেখানে তাদের থাকা উচিত।’ রয়টার্স লিখেছে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সব সামরিক লক্ষ্য খুব শিগগির পূরণ হওয়ার পথে বলেও ভাষণে দাবি করেছেন ট্রাম্প।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আজ ইরানের নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ধ্বংস হয়ে গেছে। ইরানের বেশির ভাগ নেতা মারা গেছেন। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ও ড্রোন হামলার সক্ষমতা নাটকীয়ভাবে খর্ব হয়েছে। ভাষণে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের শিশু ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য যুদ্ধ ‘সফল বিনিয়োগ’ বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, মার্কিনিরা আর ইরানের হামলার হুমকিতে নেই। তাদের পরমাণু আতঙ্কে নেই। যুক্তরাষ্ট্র আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি নিরাপদ, শক্তিশালী ও উন্নত হবে।
ট্রাম্পের হুমকির জবাবে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন লক্ষ্যে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। বার্তা সংস্থা এপি জানায়, গতকাল বৃহস্পতিবার চালানো ইরানের এসব হামলা তার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাকে আবারও সামনে এনেছে। এ ছাড়া হরমুজ নিয়ে ইরানের অবস্থান যুদ্ধ চলাকালে ‘সবচেয়ে কৌশলগত’ সুবিধা হিসেবে প্রমাণ হয়েছে। এ অবস্থায় হরমুজ খোলা নিয়ে ৩৫ দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করে যুক্তরাজ্য।
পরে এ বিষয়ে বলপ্রয়োগ নিয়ে বিশ্বকে সতর্ক করে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বলেন, অনেকে সামরিক পদক্ষেপের সাহায্যে জোরজবরদস্তির মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি মুক্ত করার চিন্তাভাবনার পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে। মাঝেমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রও একই রকম অবস্থান নিচ্ছে বলে মনে হয়। যদিও তাদের অবস্থান সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে। রয়টার্স জানায়, দক্ষিণ আফ্রিকা সফরকালে গতকাল সাংবাদিকদের মাখোঁ বলেন, ‘এটা কখনোই আমাদের পছন্দ হতে পারে না। কারণ, এটা অবাস্তব। এভাবে হরমুজ খুলতে আজীবন লেগে যাবে। যারা ওই প্রণালিটি পাড়ি দিতে চাইবে, তাদের কেবল আইআরজিসি নয়; ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ঝুঁকিতেও পড়তে হবে।’
ট্রাম্পের ভাষণের সমালোচনা এসেছে নিজ দেশের ভেতর থেকেই। মার্কিন সিনেটের সংখ্যালঘু ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার ভাষণটির তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, ‘ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের পদক্ষেপ দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নীতিগত ভুলগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হবে। ট্রাম্প লক্ষ্য নির্ধারণে ব্যর্থ হচ্ছেন। তিনি মিত্রদের দূরে ঠেলে দিচ্ছেন। সাধারণ মার্কিনিদের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো উপেক্ষা করছেন।’ তবে প্রশংসা করেছেন রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম। তিনি ফক্স নিউজকে বলেন, ইরানের সামনে এখন দুটি পথ খোলা— চুক্তি করা অথবা আরও বোমা হামলার মুখোমুখি হওয়া।
আকাশসীমা ব্যবহারের মার্কিন অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে অস্ট্রিয়া
অস্ট্রিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির নিরপেক্ষতা আইনের কথা উল্লেখ করে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের জন্য নিজেদের আকাশসীমা ব্যবহারের মার্কিন অনুমতি দিতে অস্বীকার করেছে অস্ট্রিয়া। অস্ট্রিয়ার সরকারি সম্প্রচার মাধ্যম ওআরএফের বরাত দিয়ে আলজাজিরা জানায়, মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র নিশ্চিত করেছেন, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ‘বেশ কয়েকটি’ অনুরোধ এসেছিল। অস্ট্রিয়া সামরিক নিরপেক্ষতার দীর্ঘস্থায়ী নীতি বজায় রাখে।
এর আগে স্পেন গত সোমবার বলেছে, এই সংঘাতে জড়িত মার্কিন সামরিক বিমানের জন্য দেশটির আকাশসীমা বন্ধ। ইতালীয় সরকারও গত সপ্তাহে সিসিলিতে একটি সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের জন্য মার্কিন বোমারু বিমানকে অনুমতি দেয়নি।
তেহরানে শতাব্দীপ্রাচীন চিকিৎসা গবেষণা কেন্দ্রে হামলা, ক্ষয়ক্ষতি
ইরানের রাজধানী তেহরানের কেন্দ্রস্থলে শতাব্দীপ্রাচীন একটি চিকিৎসা গবেষণা কেন্দ্রে হামলা হয়েছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোসেইন কেরমানপুর জানান, হামলায় পাস্তুর ইনস্টিটিউট অব ইরানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গবেষণা কেন্দ্রটি ১৯২০ সালে চালু হয়। সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে হোসেইন কেরমানপুর একে ‘বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতের শতাব্দী পুরোনো স্তম্ভে হামলা’ বলে উল্লেখ করেন।
আলজাজিরা জানায়, গতকাল ইরানের একটি মহাসড়কের উড়াল সেতুতে হামলা হয়েছে। এটি মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে উঁচু উড়াল সেতু। এ ছাড়া কারাজ শহরেও হামলা হয়েছে; হামলা হয়েছে খুজেস্তান প্রদেশেও।
