স্টাফ রিপোর্টার : সংবাদপত্রশিল্পের ওপর বিদ্যমান শুল্ককর কমানোর দাবি জানিয়েছে সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার ওনার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব)। সংবাদপত্রশিল্পের প্রধান কাঁচামাল নিউজপ্রিন্টের ওপর আরোপিত ৩ শতাংশ আমদানি শুল্ক ও ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেছে সংগঠনটি। এ ছাড়া করপোরেট কর সাড়ে ২৭ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার দাবিও করেছেন সংবাদপত্রের মালিকেরা। এর পাশাপাশি বিজ্ঞাপন আয়ের ওপর ৫ শতাংশ উৎসে কর এবং কাঁচামাল আমদানির ওপর ৫ শতাংশ অগ্রিম কর কমানোর কথাও বলেন তারা।
মঙ্গলবার আগারগাঁওয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট আলোচনায় নোয়াবের নেতারা এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান।
নোয়াব সভাপতি ও মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী সংগঠনের পক্ষে প্রস্তাবগুলো তুলে ধরেন। এ ছাড়া বক্তব্য রাখেন প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান। উপস্থিত ছিলেন সংবাদের সম্পাদক ও প্রকাশক আলতামাশ কবির, বণিক বার্তার সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ। এতে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান সভাপতিত্ব করেন। এ সময় এনবিআর সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
নোয়াব বলছে, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, বিজ্ঞাপন আয় কমে যাওয়া এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সংবাদপত্র শিল্প বর্তমানে বড় ধরনের সংকটে রয়েছে। সংবাদপত্র এমন একটি সেবা, যার উৎপাদন খরচ বিক্রিত মূল্যের কয়েক গুণ। বিজ্ঞাপন আয় দিয়ে উৎপাদন ব্যয়ের ঘাটতি পূরণ করা হয়। কিন্তু করোনা মহামারি ও পরবর্তী সময়ে পত্রিকাগুলোর বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন কমে গেছে। বিজ্ঞাপন আয় দিয়েও উৎপাদন ব্যয়ের ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। বিরাট আর্থিক লোকসান গুনতে হচ্ছে। নোয়াব আরও বলছে, সংবাদপত্রের প্রধান উপাদান নিউজপ্রিন্টের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। ছয় মাস আগেও আমদানিকৃত কাগজের প্রতি টনের দাম ছিল ৫৬০ ডলার, সে দাম বেড়ে এখন দাঁড়িয়েছে ৬৩০ ডলার। সার্বিকভাবে নিউজপ্রিন্টের বাজার ঊর্ধ্বমুখী। তার ওপর ডলারের বিনিময় হারও অত্যন্ত বেশি।
নোয়াব-এর প্রস্তাবে যা আছে:
সংবাদপত্রশিল্পের জন্য ২০২৬-২৭ সালের বাজেটে বেশ কিছু প্রস্তাব করেছে নোয়াব। বিভিন্ন কর প্রস্তাবের যৌক্তিকতা তুলে ধরেছে নোয়াব।
নিউজপ্রিন্টে শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি
সংবাদপত্রশিল্পের প্রধান কাঁচামাল নিউজপ্রিন্টের ওপর বর্তমানে ৩ শতাংশ (শর্ত সাপেক্ষে) আমদানি শুল্ক পরিশোধ করতে হচ্ছে। এর পাশাপাশি মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট ১৫ শতাংশ, অগ্রিম কর ৫ শতাংশ, আগাম কর (এটি) সাড়ে ৭ শতাংশ পরিশোধ করতে হয়। পরিবহন, অন্যান্য ব্যয়সহ নিউজপ্রিন্টের ল্যান্ডেড কষ্ট প্রায় ১৩০ থেকে ১৩২ শতাংশ পর্যন্ত দাঁড়ায়। নিউজপ্রিন্টের ক্রমবর্ধমান মূল্য এবং উচ্চ আমদানিনির্ভরতার কারণে সংবাদপত্রশিল্পের টিকে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। বর্তমানে শিল্পটি সংকটময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। তাই নিউজপ্রিন্টের ওপর আরোপিত আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারে দাবি করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন আয়ে উৎসে কর কমানোর প্রস্তাব
সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপন আয়ের ওপর উৎসে কর ৫ শতাংশ এবং কাঁচামাল আমদানির ওপর ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর মিলে হয় ১০ শতাংশ। অথচ সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠানের মোট আয়ের ১০ শতাংশ লাভ থাকে না। এই অগ্রিম আয়কর বছর শেষে আয়করের সঙ্গে সমন্বয় সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সরকারের নিকট প্রতিষ্ঠানের অগ্রিম কর পাওনা হিসেবে থেকে যাচ্ছে, যা বাস্তবে নগদ অর্থের সংকট তৈরি করে। তাই ওই দুটি কর হার কমানো জরুরি। সংবাদপত্রশিল্পের প্রধান কাঁচামাল হলো নিউজপ্রিন্ট, যা মোট উৎপাদন ব্যয়ের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ। যদিও ভ্যাট আইন অনুসারে, সংবাদপত্র প্রকাশনা ও বিক্রয় কার্যক্রম ভ্যাটমুক্ত। বর্তমানে নিউজপ্রিন্ট আমদানির ওপর ১৫ শতাংশের মতো ভ্যাট আরোপ হয়। তাই এই ভ্যাট অব্যাহতির সুপারিশ করেছে নোয়াব।
করপোরেট কর ১০ শতাংশ করার দাবি
সংবাদপত্রশিল্পকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সমান্তরালে সাড়ে ২৭ শতাংশ করপোরেট কর দিতে হয়, যা এই শিল্পের জন্য একটি বিশাল বোঝা বলে মনে করে নোয়াব। নোয়াব বলছে, বর্তমানে নিউজপ্রিন্টের আকাশচুম্বী দাম, উচ্চ উৎপাদন ব্যয় এবং বিজ্ঞাপন আয়ের তীব্র সংকটে অধিকাংশ সংবাদপত্রই লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছে। দেশের অনেক রপ্তানিমুখী বা বিশেষ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত শিল্প বর্তমানে ১০ থেকে ১২ শতাংশ করপোরেট কর–সুবিধা ভোগ করলেও সংবাদপত্রশিল্পকে সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে। তাই করপোরেট কর হার কমিয়ে ১০ শতাংশ করার দাবি জানিয়েছে নোয়াব।
কর্মীর আয়কর থেকে প্রতিষ্ঠানের দায়মুক্তির দাবি জানিয়েছে নোয়াব। নোয়াব বলছে, আয়কর আইনের ৮৬ ধারা অনুসারে সরকারিসহ সব প্রতিষ্ঠানে কর্মীরা নিজের আয়কর নিজে দেন। এটা রাষ্ট্রের অন্যতম নীতি। অথচ সংবাদপত্র ওয়েজ বোর্ড অনুসারে কর্মীর আয়ের ওপর প্রযোজ্য আয়কর প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধ করতে হয়। দেশে এমন কোনো আইন থাকা উচিত নয়, যা সবার জন্য সমভাবে প্রযোজ্য নয়।
করোনা মহামারি ও পরবর্তী সময়ে নানা শিল্পকে প্রণোদনা দেওয়া হলেও সংবাদপত্রশিল্পকে সরকার-ঘোষিত প্রণোদনার আওতায় যুক্ত করা হয়নি। নোয়াবের পক্ষ থেকে সংবাদপত্রশিল্পকে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
শিল্পের সংকটের কথা তুলে ধরলেন নোয়াব নেতারা
নোয়াব সভাপতি ও মানবজমিন প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। বাংলাদেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের দুষ্প্রাপ্যতা রয়েছে এবং আগামী দিনে মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। এমতাবস্থায় পত্রিকা প্রকাশ অব্যাহত রাখা কঠিন। মতিউর রহমান চৌধুরী আরও বলেন, পত্রিকাগুলোর কর্মীদের মাসিক বেতন ব্যয় অপরিবর্তিত রয়েছে। সংবাদপত্রগুলো অতি কষ্টে এবং কেউ কেউ লোকসান দিয়েও এই বেতনের ব্যয় চালিয়ে নিচ্ছেন। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এটিকে আরও বড় সংকটের মুখে ফেলেছে। অন্যদিকে পত্রিকাগুলোর অফিসের ভাড়া, ব্যবস্থাপনা ব্যয়, পত্রিকা পরিবহন ব্যয়সহ অন্যান্য ব্যয়গুলোও অপরিবর্তিত রয়েছে।
প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, গত ১৫ থেকে ১৬ বছর সংবাদপত্রগুলো নিগৃহীত ছিল, কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ছিলাম। গত দেড়-দুই বছরেও যে ভালো ছিলাম, তা নয়। দুটি সংবাদপত্রের কার্যালয় জ্বালিয়ে দেয়া হয়। আমাদের পত্রিকার কথা বলতে পারি, এক কপি পত্রিকা বের করতে সব মিলিয়ে ২৮ টাকা খরচ হয়। কিন্তু পাঠক কমছে, বিজ্ঞাপন কমছে, আয় কমছে। সব শিল্প যেমন সরকারের সাহায্য সহযোগিতা চায়, আমরাও চাই। সম্পাদক মতিউর রহমান আরও বলেন, তৈরি পোশাকশিল্পে ১০ থেকে ১২ শতাংশ করপোরেট কর বসে, আমরা দিই সাড়ে ২৭ শতাংশ। এই হার কমানো যৌক্তিক।
যারা করজালে আছেন, তাদের ওপর আরও কর দেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয় বলে মন্তব্য করেন বণিক বার্তা সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ। তিনি কর-জিডিপির হিসাব ঠিক আছে কি না, তা যাচাই-বাছাই করার পরামর্শ দেন।
এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, ‘সংবাদপত্রশিল্পের করপোরেট কর বাড়বে না, এটা নিশ্চিত করতে পারি। অন্যান্য শুল্ক-কর নিয়ে আগামী বাজেটে যৌক্তিকভাবে কিছু করা হবে।’
সংবাদপত্র শিল্পের প্রতিনিধিরা বলেন, করোনা মহামারির সময় বিভিন্ন শিল্প খাতকে প্রণোদনা দেওয়া হলেও সংবাদপত্র শিল্পকে সেই সুবিধার আওতায় আনা হয়নি। তাই আসন্ন বাজেটে এ শিল্পকে বিশেষ প্রণোদনা দেয়ারও দাবি জানানো হয়েছে।
