মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ রাত
MENU
#
আলোচিত লে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গ্রেপ্তার
daily-fulki

আলোচিত লে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গ্রেপ্তার

 

ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লে: জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেফতার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তিনি সাবেক সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বেশ আলোচিত ছিলেন। অবসরপ্রাপ্ত এই তিন তারকা জেনারেলকে সোমবার (২৩ মার্চ) গভীর রাতে অভিযান চালিয়ে রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস এলাকার বাসা থেকে আটক করা হয়।

 

ডিএমপির ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম আজ মঙ্গলবার সকালে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলা আছে। এসব মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হবে।

 

তবে মামলাগুলোর বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত জানাননি ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম।

 

২০০৭ সালে সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসির দায়িত্বে থাকা মেজর জেনারেল মাসুদ এক-এগারোর পট পরিবর্তনের পর পদোন্নতি পেয়ে লেফটেনেন্ট জেনারেল হন। সে সময় আলোচিত ‘গুরুতর অপরাধ দমন-সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি’র সমন্বয়ক ছিলেন তিনি।

 

ওই কমিটির প্রধান ছিলেন তখনকার স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এম এ মতিন। তবে জরুরি অবস্থার ওই সময়ে পর্দার আড়ালে থেকে জেনারেল মাসুদই যৌথবাহিনীর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করতেন বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হত।

 

সেনা কর্মকর্তাদের নেতৃত্বাধীন ওই বাহিনী শীর্ষ রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করত এবং পরে তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে মামলা দেওয়া হত।

 

২০০৬ সালের শেষ ভাগে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতা ছাড়ার পর রাজনৈতিক মতানৈক্যের মধ্যে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিলে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। জাতীয় নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয় আন্দোলনরত দলগুলো।

 

ওই অবস্থায় সারাদেশে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতা-হানাহানির আপাত অবসান ঘটে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের জরুরি অবস্থা জারি করার মধ্যে দিয়ে। একইসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ ছেড়ে দেন তিনি। বাতিল করা হয় ২২ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন।

 

আলোচিত সেই ঘটনাপ্রবাহের শুরুর দিনটি পরিচিতি পায় ‘ওয়ান ইলেভেন’ নামে। বিএনপি নেতাদের বিশ্বাস, ‘এক-এগারো’ না ঘটলে আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে তারাই আবার ক্ষমতায় ফিরতেন। আর রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন সেই ‘বন্দোবস্তই’ করছিলেন বলে অভিযোগ করেন বিরোধীরা।

 

বলা হয়, ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি এবং ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সেনা কর্মকর্তাদের একজন ছিলেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী।

 

তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (পরে চার তারকা জেনারেল হন) মইন উ আহমেদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে তিনি কার্যত সেই প্রভাবশালী কমিটি (গুরুতর অপরাধ দমন-সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি) পরিচালনা করতেন, যাদের নির্দেশে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিকদের পাশাপাশি দেশের শীর্ষ কয়েকজন ব্যবসায়ীকেও সে সময় আটক করা হয়।

 

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও সে সময় গ্রেপ্তার করে দুর্নীতির মামলা দেওয়া হয়েছিল। বন্দি অবস্থায় তারেক রহমানকে নির্যাতন করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে কথিত ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’র মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব পাল্টে ফেলে রাজনীতিকে নতুন চেহারা দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ ওঠে।

সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ওই সময়ই মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে ‘নাগরিক পার্টি’ নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের প্রক্রিয়া ‍শুরু হয়। দীর্ঘ কয়েক মাসের তৎপরতায় নাগরিক সমাজের একটি অংশের সমর্থন পেলেও ইউনূস শেষ পর্যন্ত সেই রাজনৈতিক উদ্যোগ থেকে সরে দাঁড়ান।

 

সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দেড় বছরের মাথায় ২০০৮ সালের জুনে লেফটেনেন্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে বাংলাদেশের হাই কমিশনার করে পাঠানো হয় অস্ট্রেলিয়ায়। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকারও তাকে সেই দায়িত্বে রাখে। অবসরের সময় হয়ে গেলে তার চাকরির মেয়াদ ২০১২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়।

 

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী কর্মজীবন শুরু করেছিলেন সত্তরের দশকে রক্ষী বাহিনীতে। ১৯৭৫ সালে রক্ষী বাহিনী ভেঙে দেওয়া হলে আরো অনেকের সঙ্গে মাসুদ উদ্দিনকে সেনাবাহিনীতে আত্মীকরণ করা হয়।

 

সেনাবাহিনী থেকে অবসরের পর ঢাকায় একটি পাঁচ তারকা মানের হোটেল খুলে ব্যবসা শুরু করেন অবসরপ্রাপ্ত এই সেনা কর্মকর্তা। পাশাপাশি শুরু করেন জনশক্তি রপ্তানির ব্যবসা।

 

২০১৮ সালে তিনি এইচ এম এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। দলটির মনোনয়নে একাদশ সংসদ নির্বাচনে ফেনী-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

 

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের মার্চে দুদকের এক মামলায় আওয়ামী লীগের সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের স্ত্রী-কন্যার সঙ্গে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকেও আসামি করা হয়।

 

মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে ‘সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ আদায়’ করে ১ হাজার ১২৮ কোটি ৬১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ‘আত্মসাৎ ও পাচারের’ অভিযোগ আনা হয় তাদের বিরুদ্ধে।

 

এছাড়া ২০২৫ সালের অগাস্টে ‘অর্থ পাচারের’ অভিযোগে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, তার স্ত্রী ও মেয়ের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

 

এজাহারে বলা হয়, মাসুদ উদ্দিন এবং তার জনশক্তি রপ্তানি প্রতিষ্ঠান ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনাল অন্য আসামিদের সঙ্গে যোগসাজশে ‘প্রতারণার’ মাধ্যমে ২০১৬ সালের ১৮ অগাস্ট থেকে ২০২৪ সালের ৩০ মে পর্যন্ত মোট ৯ হাজার ৩৭২ জন কর্মীকে মালয়েশিয়ায় পাঠায়।

 

“এ সময় সরকার নির্ধারিত ফি ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকার অতিরিক্ত জনপ্রতি ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা আদায় করে। এছাড়া পাসপোর্ট, কোভিড-১৯ টেস্ট, মেডিকেল ও পোশাক বাবদ অতিরিক্ত ৩৬৫০০ টাকা আদায় করার প্রমাণ পাওয়া গেছে।”

 

এসব ‘অনিয়মের’ মাধ্যমে মোট ১০০ কোটি ৭৫ লাখ ৮৩ হাজার ৭২০ টাকা পাচারের অভিযোগ করা হয় ওই মামলায়।

 

 

সর্বাধিক পঠিত