সোমবার, ২৩ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ রাত
MENU
#
সাভারের সিরিয়াল কিলার সাইকো সম্রাটের মৃত্যু হয়েছে কারাগারে
daily-fulki

সাভারের সিরিয়াল কিলার সাইকো সম্রাটের মৃত্যু হয়েছে কারাগারে

 

স্টাফ রিপোর্টার : সাভারের আলোচিত ও কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার মশিউর রহমান খান সম্রাট ওরফে সাইকো সম্রাট ওরফে সবুজ শেখ মারা গেছেন। সোমবার (২৩ মার্চ) সকালে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে হঠাৎ বুকে ব্যথা অনুভব করলে কারা কর্তৃপক্ষ দ্রুত তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে দায়িত্বরত চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হার্ট স্ট্রোকজনিত কারণে সকাল সাড়ে সাতটার দিকে তার মৃত্যু হয়।

সাভার মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) মোঃ হেলাল উদ্দিন সোমবার দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

একসময় সাভার পৌর এলাকার পরিত্যক্ত ভবনগুলোকে মৃত্যুফাঁদে পরিণত করা এই সিরিয়াল কিলারের মৃত্যুতে শেষ হলো এক ভয়ংকর অপরাধ অধ্যায়, যা দীর্ঘদিন ধরে জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছিল।

চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি দুপুর দুইটায় সাভার থানা রোডের পৌর কমিউনিটি সেন্টারের পরিত্যক্ত ভবনের দ্বিতীয় তলা থেকে দুটি মরদেহ উদ্ধারের মধ্যদিয়ে নতুন করে সামনে আসে তার নির্মম অপরাধের চিত্র। এর আগে একই ভবন থেকে আরও তিনটি মরদেহ এবং সাভার মডেল মসজিদের সামনে এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। ঘটনাস্থল থেকে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে পুলিশ দেখতে পায়, সম্রাট নিজ কাঁধে করে মরদেহ নিচতলা থেকে দ্বিতীয় তলায় নিয়ে যাচ্ছে, যা পুরো ঘটনাকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।

এর আগের দিন ধারণ করা একটি ভিডিওতে তাকে এক নারীর সঙ্গে ওই পরিত্যক্ত ভবনে দেখা যায়; পরে নিশ্চিত হয়, সেই নারীকে হত্যা করে লাশ পুড়িয়ে দেয় সাইকো সম্রাট। তদন্তে নেমে পুলিশ তার সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়ে গ্রেপ্তার করে এবং জিজ্ঞাসাবাদে সে সিরিয়াল অনুযায়ী ছয়টি হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করে। পরদিন ১৯ জানুয়ারি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলে আদালত তা গ্রহণ করে তাকে কারাগারে পাঠায়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সাইকো সম্রাট নামে পরিচিত এই ব্যক্তির আসল নাম সবুজ শেখ। তার গ্রামের বাড়ি মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার হলুদিয়া ইউনিয়নের মোছামান্দা গ্রামে এবং তার বাবার নাম পান্না শেখ। 
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে আসে, ২০১৪ সালে সাভারের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নে প্রথম হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে অপরাধজগতে তার প্রবেশ। ওই ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়ে চার্জশিটভুক্ত হলেও পরে জামিনে বের হয়ে ২০১৯ সালে তিন মাসের মধ্যে দুইবার মাদক মামলায় গ্রেপ্তার হয় এবং পুনরায় জামিনে এসে এরপর ভবঘুরে জীবনযাপন করতে করতে সাভার পৌর এলাকায় অবস্থান করে ধারাবাহিকভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটাতে থাকে। তার বিরুদ্ধে মোট সাতটি হত্যা ও দুটি মাদক মামলা বিচারাধীন ছিল।

পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৪ জুলাই সাভার মডেল মসজিদের সামনে আসমা বেগম নামে এক বৃদ্ধাকে শ্বাসরোধে হত্যা, ২৯ আগস্ট পৌর কমিউনিটি সেন্টারের পরিত্যক্ত ভবনে এক যুবককে হত্যা করে মরদেহ পুড়িয়ে ফেলা, ১১ অক্টোবর একই স্থানে আরেক নারীকে হত্যা, ১৯ ডিসেম্বর আরও এক যুবককে হত্যা এবং ১৭ জানুয়ারি গভীর রাতে এক নারীসহ দুইজনকে হত্যা করে মরদেহ পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা স্বীকার করে সে। এই ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের মধ্যে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ছিল তানিয়া আক্তারের ঘটনা, যার পরিচয় উদঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে একটি ভিডিও।

পরিত্যক্ত ভবনের নীরবতার ভেতরে লুকিয়ে থাকা সেই মরদেহ প্রথমে ছিল অজ্ঞাত। তদন্তের একপর্যায়ে উদ্ধার হওয়া সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সাইকো সম্রাট নিজ কাঁধে করে এক নারীর নিথর দেহ দ্বিতীয় তলায় নিয়ে যাচ্ছে এবং আগুনে পোড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। সাভার মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) মোঃ হেলাল উদ্দিনের নেতৃত্বে এসআই সাখাওয়াত ইমতিয়াজ, এসআই ফাইজুর খান এবং পুলিশ সদস্য মনির হোসেনের সহায়তায় মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন আদালতে স্বীকারোক্তি দেওয়ার পরও তখনও অজ্ঞাত ছিল সেই নারীর পরিচয়।

ঘটনার এক দিন আগে ধারণ করা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে রাজধানীর উত্তরখানের একটি ভাড়া বাসায় বসে মা জুলেখা বেগম তার নিখোঁজ মেয়ে তানিয়া আক্তারকে চিনে ফেলেন। তিনি এর আগে ১ জানুয়ারি নিখোঁজ হওয়ার পর উত্তরখান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন। ভিডিও দেখে ১৯ জানুয়ারি রাতে পরিবার সাভার মডেল থানায় এসে মরদেহ শনাক্ত করে এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে জন্মদাগ দেখে নিশ্চিত হয় এটি তানিয়া।

সব আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০ জানুয়ারি বিকাল সাড়ে তিনটায় মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। উত্তরখানের বড়বাগ জামে মসজিদে জানাজা শেষে দক্ষিণখানের আজিমপুর গণকবরস্থানে বাবার কবরের পাশে তানিয়াকে দাফন করা হয়। পাঁচ বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তানিয়া ছিলেন তৃতীয়; একটি সাধারণ পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে দিয়ে শেষ হয় তার জীবন। তানিয়ার বোন নাসরিন আক্তার ফারিয়া তখন বলেছিলেন, পুলিশের পেশাদার তদন্ত না হলে হয়তো কখনোই তারা জানতে পারতেন না তাদের বোনের শেষ পরিণতি কী হয়েছে; অন্তত পরিচয়সহ দাফনের সুযোগ পেয়েছেন সেটাই তাদের বড় সান্ত্বনা এবং খুনির কঠোর শাস্তির দাবি করেছিলেন তারা।

সোমবার (২৩ মার্চ) সেই খুনি সাইকো সম্রাটের মৃত্যুর সংবাদ শুনে তানিয়ার মা জুলেখা বেগম ও বোন নাসরিন আক্তার ফারিয়া সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।

সাভারের মানুষের কাছে সাইকো সম্রাট ছিল আতঙ্কের আরেক নাম; পরিত্যক্ত ভবনের অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা তার নৃশংসতা যেন আবারও মনে করিয়ে দেয় অপরাধ যত গভীরই হোক সত্য একদিন সামনে আসেই; আর আইনের হাত কিংবা সৃষ্টিকর্তার বিচার থেকে কেউ শেষ পর্যন্ত রেহাই পায় না।

এ ব্যাপারে সাভার মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) মোঃ হেলাল উদ্দিন বলেন, কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়লে সাইকো সম্রাট ওরফে সবুজ শেখকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়, সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মরদেহ যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র শেষে তার পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। 
বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়েছে।

সর্বাধিক পঠিত