বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ রাত
MENU
#
বর্জন-সহিংসতা নয়, সংসদে গঠনমূলক সমালোচনা করবে জামায়াত জোট
daily-fulki

বর্জন-সহিংসতা নয়, সংসদে গঠনমূলক সমালোচনা করবে জামায়াত জোট


স্টাফ রিপোর্টার : আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বয়কট, প্রতিরোধ বা সহিংসতার রাজনীতি পরিহার করে সরকারের গঠনমূলক সমালোচনার নীতি গ্রহণ করেছে জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোট। জোটের শীর্ষ নেতারা প্রাথমিকভাবে সরকারকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, নীতি নির্ধারকরা জনকল্যাণের পথ থেকে সরে গেলে জনগণের স্বার্থে রাজপথ ও সংসদে ঐক্যবদ্ধ কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।

দীর্ঘ রাজনৈতিক পালাবদল, ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান এবং অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষে নির্বাচনের পর আগামী ১২ মার্চ (বৃহস্পতিবার) বসতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের এই সংসদীয় যাত্রাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন উৎসব ও প্রস্তুতির আমেজ বিরাজ করছে।


অতীতের সংসদগুলোর মতো বয়কট বা সাংঘর্ষিক রাজনীতির বদলে এবার সংসদে এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির আভাস মিলছে। একদিকে সরকারি দল ‘ঐকমত্যের ভিত্তিতে’ দেশ পরিচালনার কথা বলছে, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী জোটগুলোও সহিংসতা এড়িয়ে গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সংসদে শক্ত ভূমিকা রাখার ঘোষণা দিয়েছে।

আগামী ১২ মার্চ থেকে শুরু হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, এখন দেখার বিষয় হলো সরকারি ও বিরোধী দলের এই সৌহার্দ্যপূর্ণ ও গঠনমূলক অবস্থান আগামী দিনগুলোতে কতটা টেকসই হয়।

সমন্বয়ের বার্তা সরকারি ও বিরোধী দলের হুইপদের
সংসদকে কার্যকর ও প্রাণবন্ত করতে এরই মধ্যে তোড়জোড় শুরু হয়েছে সরকারি ও বিরোধী উভয় শিবিরে। সোমবার (৯ মার্চ) সংসদ ভবনে চিফ হুইপের কার্যালয়ে এক বিরল ও ইতিবাচক দৃশ্য দেখা যায়। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলামের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সৌজন্য সাক্ষাৎ ও বৈঠক করেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা।

বৈঠকে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল অংশ নেয়।


প্রতিনিধি দলের অন্য সদস্যরা ছিলেন সংসদ সদস্য মো. রফিকুল ইসলাম খান, মো. আবুল হাসনাত এবং মো. নূরুল ইসলাম।
সাক্ষাৎকালে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি ‘ঐক্যের সরকার’ বা ‘ঐকমতের সরকার’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে উভয় পক্ষের মধ্যে বিস্তারিত ও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়।

এ সময় সরকারি দলের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি যে সরকার গঠন করেছে, সেখানে সংসদের প্রতিটি কার্যক্রমে বিরোধী দলের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আমরা অঙ্গীকারাবদ্ধ।

বিরোধী দলের সঙ্গে এই আলোচনা সংসদীয় কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও অংশগ্রহণমূলক করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বুধবার বসছে সরকারি দলের সংসদীয় সভা
অধিবেশন শুরুর আগের দিন, অর্থাৎ আগামীকাল বুধবার (১১ মার্চ) সকাল ১১টায় জাতীয় সংসদ ভবনে অবস্থিত সরকারি দলীয় সভাকক্ষে বসছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সরকারি দলের প্রথম সংসদীয় সভা।

সোমবার (৯ মার্চ) জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। সংসদ নেতার (প্রধানমন্ত্রী) সভাপতিত্বে এই গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হবে।

সভায় সরকারি দলের সব সংসদ সদস্যকে যথাসময়ে উপস্থিত থাকার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছেন চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম।

সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, এই সভায় সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সংসদীয় কার্যপ্রণালি নিয়ে দলীয় এমপিদের দিকনির্দেশনা দেওয়া হবে। এছাড়া বৃহস্পতিবার শুরু হতে যাওয়া প্রথম অধিবেশনেই অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন ও অনুমোদনের বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।

সহিংসতা নয়, গঠনমূলক সমালোচনা করবে বিরোধী জোট
ত্রয়োদশ সংসদে বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সমমনা জোটগুলোর ভূমিকা কী হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরেই কৌতূহল ছিল। জানা গেছে, জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় বিরোধী জোট সংসদে সরকারের গঠনমূলক সমালোচনার নীতি গ্রহণ করেছে।

জোটের শীর্ষ নেতারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, প্রথমদিকে তারা বড় ধরনের কোনো প্রতিরোধ, বয়কট বা সহিংসতার পথে যাবেন না। বরং সরকারকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হবে।

তবে জামায়াত নেতাদের কড়া হুঁশিয়ারি; সরকারকে জনকল্যাণমুখী পথে রাখতে সংসদে সমালোচনা অব্যাহত থাকবে। তাতে কাজ না হলে জনগণের স্বার্থে রাজপথে এবং সংসদে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।

আসন নয়, অধিকার প্রতিষ্ঠাই লক্ষ্য: জামায়াত আমির
অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার তাগিদ দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। সম্প্রতি এক বক্তব্যে রাজনীতি থেকে ‘প্রতিহিংসার বিষ’ এবং ‘দুর্নীতির ক্যানসার’ দূর করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, গত ৫৫ বছরের মতো ভবিষ্যতেও দেশ কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে না, যদি আমরা রাজনীতিকে কলুষমুক্ত করতে না পারি। আমরা কেবল আসনের জন্য রাজনীতি করি না, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনীতি করি।

সমমনা ১২ দলীয় জোটের ঐক্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আমরা জোটগতভাবে যখন বসেছি, তখন একটি কথাই বলেছি— আমরা শুধু আসনের জন্য আসিনি, জনগণের ভোটাধিকার ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এসেছি। প্রিয় বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে আমরা কখনো বেইমানি করব না। সস্তা কোনো সুযোগ-সুবিধা আমাদের পথভ্রষ্ট করতে পারবে না।

জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের কথা স্মরণ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘ ৫৪ বছরের বঞ্চনার পর আমাদের যুবসমাজের নেতৃত্বে যে পরিবর্তন এসেছে, সেই যুবসমাজকে আমরা চিরতরে বুকে ধারণ করে রাখব। তাদের একটাই স্লোগান ছিল ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’। আমরাও সর্বক্ষেত্রে সুবিচার চাই। স্বজনপ্রীতি বা দলপ্রীতি আমরা আর দেখতে চাই না। ইতিহাস কাউকে ছেড়ে কথা বলে না।

ফ্যাসিবাদ, দুর্নীতিবাজ ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে জামায়াত আমির বলেন, আমাদের লড়াই কোনো নির্দিষ্ট দলের বিজয়ের জন্য নয়। এই লড়াই হবে বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের বিজয়ের লড়াই।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বাংলানিউজকে বলেন, আগামী ১২ মার্চের জাতীয় সংসদের অধিবেশন অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। কারণ অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত হয়েছে। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে যেসব ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য। সেই ধারাবাহিকতায় বিরোধী দল সংসদে কার্যকর ভূমিকা পালন করলে সমৃদ্ধ দেশ গঠন সহজ হবে।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পারওয়ার বলেছেন, আমরা সংসদে কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে চাই। গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সরকারের ভুলত্রুটি তুলে ধরে জনগণের কল্যাণে কাজ করতে চাই।
 

সর্বাধিক পঠিত