স্টাফ রিপোর্টার : দেশের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সাভার অংশে হাইওয়ে পুলিশের চাঁদাবাজি এখন ওপেন সিক্রেট। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে দিন-রাত চলছে যানবাহনে তল্লাশি আর মাসোহারা আদায়ের মহোৎসব। বিশেষ করে সাভারের আমিনবাজার থেকে নয়ারহাট পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে চাঁদাবাজির এক শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। এতে চরম ক্ষুব্ধ চালক, পরিবহন মালিক ও সাধারণ ব্যবসায়ীরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার যানবাহন চলাচল করে। এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কে পুলিশের এই অনৈতিক কর্মকাণ্ড কেবল যাত্রী ও চালকদের হয়রানি করছে না, বরং সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ করছে। অবিলম্বে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগীরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সাভারের বলিয়াপুর, উলাইল, গেন্ডা, বাসস্ট্যান্ড, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে, বিপিএটিসির সামনে ও নবীনগর এলাকায় হাইওয়ে পুলিশের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি। পুলিশ সদস্যরা বা তাদের তাদের নিয়োজিত লোক রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থেকে বিশেষ ইশারায় বা লাঠি উঁচিয়ে দূরপাল্লার ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান থামান। কাগজপত্রের ত্রুটি থাকুক বা না থাকুক, ‘মামলার ভয়’ দেখিয়ে ৫শ’ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে।
নয়ারহাট এলাকায় কথা হয় ট্রাক চালক আবুল হোসেনের সাথে। তিনি জানান, সব কাগজ ওকে থাকলেও পুলিশ বলে ওভারলোডিং হয়েছে। টাকা না দিলে ১-২ ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখে। ট্রিপ মিস হওয়ার ভয়ে আমরা বাধ্য হয়েই ৫০০ টাকা দিয়ে দিই।
শুধু তাৎক্ষণিক চাঁদাবাজিই নয়, স্থানীয় পরিবহনের ক্ষেত্রে চলছে ‘টোকেন’ বা ‘মাসোহারা’ প্রথা। সাভারের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে ছেড়ে যাওয়া লেগুনা, হিউম্যান হলার এবং লোকাল বাসগুলো থেকে মাসিক ভিত্তিতে ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এই টাকা সংগ্রহে পুলিশের পাশাপাশি কিছু সিভিল পোশাকধারী ‘লাইনম্যান’ বা সোর্স কাজ করে বলে জানা গেছে।
মহাসড়কে থ্রি-হুইলার বা অটো-রিকশা চলাচল উচ্চ আদালতের নির্দেশে নিষিদ্ধ হলেও সাভারের শাখা সড়কগুলো থেকে মহাসড়কে ওঠার মুখে পুলিশের বিশেষ পাহারা থাকে। প্রতিটি অটো থেকে প্রতিদিন ১শ’ ২শ’ টাকা হারে ‘এন্ট্রি ফি’ আদায় করা হয়, যা না দিলে গাড়ি ডাম্পিং করার হুমকি দিয়ে ধরে নিয়ে যায়। পরে রেখার বিলের কথা বলে ২০০০ টাকা নিয়ে গাড়ি ছাড়ে। কিন্তু সেই টাকার কোন রশিদও দেয় না। সম্প্রতি, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাকিজার সামনে হাইওয়ে পুলিশের চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে অটো রিক্সা চালকরা মহাসড়ক বন্ধ করে বিক্ষোভ দেখায়। পরে থানা পুলিশ গিয়ে তাদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়।
সাভারের একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী বলেন, মহাসড়কের এই চাঁদাবাজির প্রভাব সরাসরি বাজারে পড়ে। ট্রাক ভাড়া বাড়লে চাল ও সবজির দাম বেড়ে যায়। পুলিশ যদি রক্ষক হয়ে ভক্ষকের ভূমিকা নেয়, তবে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে? এছাড়া যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে টাকা আদায়ের সময় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়, যার ফলে অফিসগামী যাত্রী ও অসুস্থ রোগীদের পোহাতে হয় সীমাহীন দুর্ভোগ।
এ বিষয়ে সাভার হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ শেখ শাহজাহান চাঁদাবাজির অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করে ট্রাফিক পুলিশের দিকে ইঙ্গিত দেন। তিনি দাবি করেন, মহাসড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ি বন্ধ করতে আমরা নিয়মিত ডিউটি করি। সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ থাকলে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নেব।”
তবে পুলিশের এই দাবির সাথে বাস্তব চিত্রের আকাশ-পাতাল পার্থক্য দেখা গেছে মহাসড়কের প্রতিটি মোড়ে।
