শনিবার, ৭ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ রাত
MENU
#
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, প্রশাসনে সৃষ্টি হতে পারে যত সংকট
daily-fulki

চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, প্রশাসনে সৃষ্টি হতে পারে যত সংকট


স্টাফ রিপোর্টার : নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর গতিশীল ও দক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে মাঠ সাজাতে শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে গতানুগতিক সিস্টেম পরিহার করে প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাতে ‘চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ’ প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে ওঠায় কর্মকর্তাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া কর্মকর্তাদের সরিয়ে নতুন করে যাদের স্থলাভিষিক্ত করা হচ্ছে, তাদের প্রায় সবাই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাচ্ছেন বলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

সচিব পদমর্যাদায় পরিবর্তন

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে সরকারের ৫৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে কর্মরত জ্যেষ্ঠ সচিব ও সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মধ্যে অনেকেই চুক্তিভিত্তিক ছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এই সংখ্যা ছিল ৭৯। সম্প্রতি বেশ কয়েকজনের চুক্তি বাতিল হওয়ায় এই সংখ্যা ৬৬-তে নেমে আসে। বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব হিসেবে সাবেক আমলা এবিএম আব্দুস সাত্তার এবং স্বরাষ্ট্র সচিব পদে মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীকেসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, নতুন করে আসা এই কর্মকর্তাদের প্রায় সবাই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন।

ইশতেহার ও বর্তমান চিত্র

বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। যেখানে বলা হয়েছিল—মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ, বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে যোগ্যতাই হবে একমাত্র মাপকাঠি। কেউ যাতে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত না হয়, সেটাও নিশ্চিত করা হবে। তবে প্রশাসনে বড় পদে আবারও চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তাদের প্রাধান্য আসায় অনেক নিয়মিত কর্মকর্তা একে ইশতেহারের পরিপন্থি বলে মনে করছেন।

চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রধান জটিলতা

প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অতিমাত্রায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ফলে নিয়মিত কর্মকর্তাদের ক্যারিয়ারে স্থবিরতা তৈরি হয়। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রধান জটিলতাগুলো হচ্ছে—

পদোন্নতি ও ক্যারিয়ারে স্থবিরতা: চুক্তিতে থাকা কর্মকর্তাদের কারণে নিচের দিকের যোগ্য কর্মকর্তারা প্রাপ্য পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হন।

হতাশা ও ক্ষোভ: দীর্ঘমেয়াদে পদোন্নতি না পেলে কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়, যা প্রশাসনিক স্থবিরতার জন্ম দিতে পারে।

কাজের স্থায়িত্বহীনতা: চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ কখনও স্থায়ী হয় না, মেয়াদ শেষ হলে যেকোনও সময় চাকরি শেষ হতে পারে, যা কর্মীর মনে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে।

সুযোগ-সুবিধার অভাব: স্থায়ী কর্মীদের তুলনায় চুক্তিতে থাকা কর্মীরা সাধারণত পেনশন, গ্রাচুইটি বা অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা পান না।

প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা: বারবার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বা পুনঃচুক্তি দেওয়ার ফলে প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক পদোন্নতি প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় এবং যোগ্য তরুণরা বঞ্চিত হয়।

স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির সুযোগ: নির্দিষ্ট মেয়াদে পছন্দের ব্যক্তিকে পদে বসাতে এই মাধ্যমটি ব্যবহার করা হতে পারে, যা কাজের স্বচ্ছতা নষ্ট করে।

আইনগত জটিলতা: কিছু ক্ষেত্রে, পুরনো ও নতুন আইনের সাংঘর্ষিক বিধানের কারণে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ আইনি জটিলতায় পড়তে পারে।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, কাজের জায়গায় মানসিক চাপ, পদোন্নতি বঞ্চিত কর্মকর্তাদের হতাশা এবং প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা কমানোর মতো বড় জটিলতা তৈরি করে প্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ।  

এ বিষয়ে সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান বলেন, “দীর্ঘদিন আগে অবসরে যাওয়া আমলাদের ফিরিয়ে আনায় নিয়মিত কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্ব তৈরি হয়। এর ফলে প্রশাসনে দক্ষ অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের জটলা তৈরি হয়। পদোন্নতিতে সৃষ্টি হয় জট।” তার মতে, প্রাপ্য পদোন্নতি না পেলে কর্মকর্তাদের মনে সৃষ্টি হয় ক্ষোভ। এর পরিণতি প্রশাসনিক স্থবিরতা। বিষয়টিতে সরকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।  

তবে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররফ হোসাইন ভূঁইয়া মনে করেন, সীমিত আকারে এবং দক্ষতা শেয়ারের উদ্দেশ্যে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া অবৈধ কিছু নয়। এতে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা শেয়ারের মাধ্যমে কাজের গতি বাড়ে।  

কর্মকর্তাদের প্রতিক্রিয়া

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সচিবালয়ের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে দৈনন্দিন কাজ হয়তো চালানো সম্ভব, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার বা দক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলা কঠিন। তারা প্রশ্ন করেন, প্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্তরাই কেবল মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ গড়তে সক্ষম? অন্যরা সবাই ব্যর্থ? তাদের মধ্যে মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা সবই কি অনুপস্থিত?

প্রশাসনিক সংস্কারের বিষয়ে বিএনপি নির্বাচনি ইশতেহার থেকে অনেক দূরে সরে এসেছে বলেও মনে করেন এসব উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী জানান, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টেলিফোনে বা অল্প সময়ে এ নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করা সম্ভব নয়। 
 

সর্বাধিক পঠিত