বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ রাত
MENU
#
নেপালে সরকার উৎখাতের পর আজ সাধারণ নির্বাচন
daily-fulki

নেপালে সরকার উৎখাতের পর আজ সাধারণ নির্বাচন


ফুলকি ডেস্ক : নেপালের মানুষ আজ ৫ মার্চ নতুন সরকার নির্বাচনের জন্য ভোট দিচ্ছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তরুণদের নেতৃত্বে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের কারণে আগের সরকারের পতন হয়। এরপর এই নির্বাচনটি হবে দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন।

সরকার পতনের পর থেকে দেশটির সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কির নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চলছে।


তারা ছয় মাসের মধ্যে নতুন নির্বাচন আয়োজন করে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। নেপালের এই নির্বাচন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য এখানে তুলে ধরা হলো।
ভোট কিভাবে অনুষ্ঠিত হবে?

প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ মানুষ এই নির্বাচনে অংশ নেবেন। তাদের মধ্যে প্রায় ১০ লাখ প্রথমবারের ভোটার।


স্থানীয় সময় সকাল ৭টা থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হবে এবং বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলবে। তবে দেশের কিছু অঞ্চলে সব ভোটারকে ভোট দেওয়ার সুযোগ করে দিতে ভোটকেন্দ্র নির্ধারিত সময়ের পরও খোলা রাখা হতে পারে। অতীতের কিছু নির্বাচনে কিছু আসনে রাত ৯টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলেছিল।
ভোটাররা সংসদের ২৭৫ জন সদস্য নির্বাচন করবেন।


এই ২৭৫ আসনের মধ্যে ১৬৫ জন নির্বাচিত হবেন ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ পদ্ধতিতে। অর্থাৎ, যে প্রার্থী সবচেয়ে বেশি ভোট পাবেন, তিনি সেই আসনে বিজয়ী হবেন। বাকি ১১০ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন) পদ্ধতিতে। এ ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক দল মোট কত শতাংশ ভোট পেয়েছে, তার ভিত্তিতে আসন বণ্টন করা হবে।
দুটি আলাদা পদ্ধতিতে নির্বাচন হওয়ায় কোনো একক দলের পক্ষে সরাসরি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।


ফলে যে দল নির্বাচনে এগিয়ে থাকবে, তাদের সম্ভবত জোট সরকার গঠন করতে হবে। এই নির্বাচনে ৩ হাজার ৪০০-এর বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাদের মধ্যে ১ হাজারেরও বেশি প্রার্থীর বয়স ৪০ বছরের নিচে।
নেপালের নির্বাচনে প্রধান খেলোয়াড় কারা এবং মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতাগুলো কোথায়?

সবচেয়ে বেশি নজরকাড়া রাজনীতিবিদদের একজন হলেন ৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ, যিনি কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র। তিনি ঝাপা-৫ আসনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলির বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এই আসনটি ঐতিহ্যগতভাবে অলির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।

৭৪ বছর বয়সী অলি এবং তার সরকারকে গত সেপ্টেম্বর মাসে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। হিমালয় অঞ্চলের এই প্রজাতন্ত্রে দীর্ঘদিন ধরে চলা দুর্নীতি ও সামাজিক বৈষম্য নিয়ে জনরোষ ক্রমেই বাড়তে থাকায় তাদের পদত্যাগ করতে হয়।

শাহ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা পার্টির (আরএসপি) পক্ষে। দলটি ২০২২ সালের সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচনে চতুর্থ স্থান অর্জন করেছিল। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এবার তারা আরো ভালো ফল করতে পারে। শাহকে আরএসপির সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছে।

দেশের প্রাচীনতম এবং সদস্যসংখ্যার দিক থেকে বৃহত্তম দল নেপালি কংগ্রেসও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছে। দলটি অতীতে একাধিক নির্বাচন জিতেছে, যার মধ্যে ২০২২ সালের সর্বশেষ নির্বাচনও রয়েছে। বর্তমানে দলটির নেতৃত্বে আছেন চারবারের সংসদ সদস্য গগন থাপা।

অন্য প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে অলির দল কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউএমএল), যা সর্বশেষ নির্বাচনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পেয়েছিল, এবং সাবেক মাওবাদী নেতা প্রচণ্ডর নেতৃত্বাধীন নেপালি কমিউনিস্ট পার্টি। কাঠমান্ডু উপত্যকার ১৫টি আসনের দিকেও বিশেষ নজর থাকবে, কারণ শহরাঞ্চলের ভোট কোন দিকে যাচ্ছে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে এই ফলাফলকে দেখা হয়।

নেপাল নির্বাচনের ফলাফল কবে জানা যাবে?

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভোট গণনা শুরু হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সরাসরি নির্বাচিত ১৬৫টি আসনের ফল প্রকাশ করা হবে। তবে পাহাড়ি দেশজুড়ে বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যালট বাক্স সংগ্রহ করে গণনা কেন্দ্রে পৌঁছাতে সাধারণত অন্তত একদিন সময় লাগে।

কর্মকর্তারা বলেছেন, আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভোটের ফল গণনা করতে আরো দুই থেকে তিন দিন সময় লাগতে পারে। তাই নির্বাচন কমিশন যদি তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ফল প্রকাশ করতে পারে, তাহলে এটি হবে দেশের আগের সময়ের তুলনায় বড় পরিবর্তন।

২০২২ সালের সর্বশেষ নির্বাচনে ফল প্রকাশ হতে প্রায় দুই সপ্তাহ সময় লেগেছিল। এর একটি বড় কারণ হলো অনেক ভোটকেন্দ্র দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত। নেপালের মোট ভূখণ্ডের ৮০ শতাংশেরও বেশি পাহাড়ি। ফলে ব্যালট বাক্স সংগ্রহ করা বেশ কঠিন।কিছু ব্যালট বাক্স মানুষকে হাতে করে পাহাড় থেকে নামিয়ে আনতে হয়, আবার কিছু ক্ষেত্রে হেলিকপ্টার বা বিমানের মাধ্যমে আনা-নেওয়া করতে হয়।

এ ছাড়া অনেক দূরবর্তী এলাকায় সন্ধ্যার পর বিমান বা হেলিকপ্টার চলাচল করতে পারে না, তাই অনেক সময় ব্যালট সংগ্রহের কাজ পরের দিন সকালে শুরু করতে হয়। খারাপ আবহাওয়াও এই প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করে।

এদিকে মুসতাং জেলার একটি দূরবর্তী গ্রামে মাত্র চারজন ভোটার নিবন্ধিত থাকলেও, নির্বাচনী সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া, ভোটগ্রহণ তদারকি করা এবং নির্বাচন দিনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেখানে ২০ জন কর্মকর্তা মোতায়েন করা হয়েছিল। গ্রামটির আরো ৩৫ জন যোগ্য ভোটার দেশের অন্যান্য জায়গায় থাকেন। তবে সাম্প্রতিক ভারী তুষারপাতের কারণে তাদের জন্য গ্রামে ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়েছে।

নেপালের আইনে নাগরিকদের তাদের নিবন্ধিত নির্বাচনী এলাকাতেই ভোট দিতে হয়, যা সাধারণত তাদের জন্মস্থান। ভোট গণনাও অনেক সময়সাপেক্ষ, কারণ এটি হাতে করা হয়। প্রতিটি রাজনৈতিক দল গণনা কেন্দ্রে নিজেদের প্রতিনিধিদের পাঠায়, যারা গণনার আগে প্রতিটি খোলা ব্যালট পরীক্ষা করে দেখেন।

কখনো কখনো এসব প্রতিনিধি ফলাফল বা ভোটের বৈধতা নিয়ে আপত্তি তোলেন। এর ফলে আগে পুনরায় ভোট গণনার ঘটনাও ঘটেছে, যা পুরো প্রক্রিয়াকে আরো বিলম্বিত করে।

নেপালের নির্বাচনের প্রধান ইস্যুগুলো কী?

গত সেপ্টেম্বরের বিক্ষোভে ৭৭ জন নিহত হয়েছেন বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। নিহতদের অনেকেই পুলিশের গুলিতে নিহত বিক্ষোভকারী। বিক্ষুব্ধ জনতা সংসদ ভবন, সুপ্রিম কোর্ট এবং কেন্দ্রীয় সরকারি সচিবালয়সহ বহু স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ করে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত থেকে এই বিক্ষোভের সূচনা হলেও, দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতা নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ এতে আরও উসকে দেয়। ৫ মার্চের ভোটে এসব বিষয়ই প্রধান ইস্যু হিসেবে উঠে এসেছে।

বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। আগের সরকার পতনের পেছনে যে জনঅসন্তোষ কাজ করেছিল, তার প্রতিফলন হিসেবেই এসব প্রতিশ্রুতিকে দেখা হচ্ছে।

উদাহরণস্বরূপ, নেপালি কংগ্রেস ১৯৯০ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করা সরকারি পদধারীদের সম্পদের উচ্চপর্যায়ের তদন্তের প্রস্তাব দিয়েছে। এই নির্বাচনটির গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক প্রভাবও রয়েছে।

প্রতিবেশি ভারত, যারা ঐতিহাসিকভাবে নেপালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় ভূমিকা রেখেছে, পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। অতীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক টানাপোড়েনপূর্ণ ছিল। মূলত, ভারতের দৃষ্টিতে অলি তার একাধিক মেয়াদে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক জোরদার করার চেষ্টা করেছেন, যা ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী।

অন্যদিকে, চীন নেপালে উল্লেখযোগ্য প্রভাব রাখে এবং ভবিষ্যৎ যে কোনো সরকার যেন দেশটিতে তাদের স্বার্থের পক্ষে থাকে—বিশেষ করে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)—সেই প্রত্যাশাই করছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রও এই নির্বাচনে ভূমিকা রাখছে এবং কৌশলগত লক্ষ্যগুলোর ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থান নিয়েছে।
 

সর্বাধিক পঠিত