সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ রাত
MENU
#
সাভার জুড়ে ফুটপাত দখল চলছে, বাড়ছে যানজট ও জনদুর্ভোগ
daily-fulki

সাভার জুড়ে ফুটপাত দখল চলছে, বাড়ছে যানজট ও জনদুর্ভোগ


স্টাফ রিপোর্টার : সাভারের বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড এবং ফুটওভার ব্রীজ হকারদের দখলে থাকায় পথচারীদের চলাচলে দারুণ বিঘ্ন ঘটছে। হকারদের পাশাপাশি ভিক্ষুকরাও ফুটপাত এবং ফুটওভার ব্রীজগুলো দখল করে ভিক্ষা করছে। ক্রমেই দখল হচ্ছে সড়ক মহাসড়ক ও ফুটপাত। ফলে চলাচলে মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ডে মহাসড়ক দখল করে হকার পসরা সাজিয়ে বসায় সীমাহীন যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। পবিত্র রমযান মাসে এ সমস্যা আরো তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। প্রশাসন মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলেও নিমিষের মধ্যেই আবার আগের মতো করেই দখলদাররা তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। কোন কোন স্থানে উচ্ছেদকারি ম্যাজিষ্ট্রেট বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। কিন্তু এ সমস্যা সমাধানে কার্যকর কোন পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না ।

সোমবার (২ মার্চ) সাভার উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ সাইফুল ইসলাম নবীনগর ও পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় ফুটপাতের অবৈধ দোকানপাট উঠিয়ে দিয়েছেন। এ উচ্ছেদ অভিযান চলমান থাকবে বলেও তিনি জানিয়েছেন। এর আগে সরকারী সাভার কলেজে মাঠে সাভার পৌর বিএনপি আয়োজিত ইফতার মাহফিলে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ডাক্তার দেওয়ান মো: সালাউদ্দিন বাবু প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাভারে অবৈধভাবে সড়ক-মহাসড়ক দখল করে ব্যবসা করা চলবে না এবং চাঁদাবাজ আর মাদক ব্যবসায়ীদের আস্তানা থাকবে না বলে জানিয়েছেন।

No description available.

সাভার বাসস্ট্যান্ডের উভয়পাশ এবং আশপাশের শাখা রোড, গেন্ডা বাসস্ট্যান্ডের পূর্বপাশ, উলাইল বাসস্ট্যান্ডের পশ্চিমপাশ, হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ডের উভয়পাশ, আমিনবাজার বাসস্ট্যান্ডের উভয়পাশ, জাতীয় স্মৃতি সৌধের সামনে, পল্লীবিদ্যুৎ বাসস্ট্যান্ড, বাইপাইল মোড় এলাকার উভয়পাশ, ডিইপিজেড’র সামনে উভয়পাশ, ভলিভদ্র বাজার, শ্রীপুর বাসস্ট্যান্ডের উভয়পাশ, জিরানী বাজার বাসস্ট্যান্ডের উভয়পাশ, জিরাবো বাসস্ট্যান্ডের উভয়পাশ, নয়ারহাট বাসস্ট্যান্ডের পশ্চিমপাশসহ ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক এবং নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়ক, বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে মানুষ অবৈধভাবে দখল করে তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। পথচারীরা ফুটপাত দিয়ে চলাফেরা করতে না পেরে বাধ্য হয়েই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মহাসড়ক দিয়ে চলাচল করে। ফুটপাত প্রায় বন্ধ ও মহাসড়ক অস্থায়ী দোকান ও দখলের চাপে সংকুচিত এক বিশৃঙ্খল জনপদে পরিণত হয়েছে।

No description available.

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সাভার বাসস্ট্যান্ডের সামনের ফুটপাত, সার্ভিস লেন এমনকি ফুটওভারব্রিজের বড় অংশ দখল করে হকার বসানো হয়েছে। ফলে পথচারীরা বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে মহাসড়ক দিয়ে চলাচল করছে। হকারদের পাশাপাশি ফুটওভারব্রিজ ভিক্ষুক নিরাপদ স্থান হওয়ায় প্রতিদিনই পথচারীদের তীব্র ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, বাসস্ট্যান্ড এলাকায় কোথাও দুই সারি, কোথাও চার সারি করে হকার বসানো হয়েছে। মহাসড়কের পাশের সার্ভিস লেন প্রায়ই যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। লোকাল বাস নির্ধারিত জায়গায় থামতে না পেরে সড়কের মূল লাইনে যাত্রী ওঠানামা করায় বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। অফিস সময় ও বিকেলের ব্যস্ত সময়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

No description available.

পবিত্র রমজান মাসকে কেন্দ্র করে এই চিত্র আরও ঘন হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় নতুন করে কয়েকশ অস্থায়ী দোকান বসানো হয়েছে। এতে সংকট আরও প্রকট হয়েছে। যারা নিয়মিত যাতায়াত করেন, তারা বলছেন, আগে যেখানে অন্তত চলাচলের কিছু ফাঁকা জায়গা ছিল, রমযান মাসে সেটুকুও নেই। সরকারি জায়গা দখল করে দোকানি সাভার সিটি সেন্টারের সামনে আলু পুড়ি ও চপ বিক্রেতা পারুল বেগম জানান আমার স্বামীর দুটি কিডনী নষ্ট। তার চিকিৎসা চালানোর জন্য দীর্ঘ দিন ধরে এখানে বসে দোকান করছি। একই স্থান সংলগ্ন ফুটওভার ব্রীজে দোকান বসিয়ে তেতুল,আমলকি,চিরুনী,আতর,টুপি বিক্রেতা জসিম উদ্দিন জানান আমরা কাহারও ক্ষতি করছি না। আমরা এখানে বসার কারনে ওভারব্রীজে কোন ছিনতাই হচ্ছে না।

No description available.

শুধু সাভার বাসস্ট্যান্ডেই নয়, একই চিত্র ছড়িয়ে পড়েছে আমিনবাজার, হেমায়েতপুর, গেন্ডা, নবীনগর, পল্লী বিদ্যুৎ, বাইপাইল, রপ্তানি, জিরানি ও জামগড়া এলাকাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের দুই পাশ ও সংযোগ সড়কের মুখে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী দোকান। অনেক জায়গায় শাখা সড়কের প্রবেশমুখেই বসানো হয়েছে দোকান ও অটোরিকশা স্ট্যান্ড, যার ফলে যানবাহন ঢোকা-বের হওয়া খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে।

এছাড়া, বাজার রোড, থানা রোড, ছায়াবিথী রোড, বিরুলিয়া রোড, চাপাইন রোড, সিআরপি রোড, জামসিং রোড গেন্ডা-সাধাপুর রোড, আশুলিয়া রোড, জামগড়া রোডসহ বিভিন্ন শাখা রোডগুলোও হকারদের দখলে। অনেক শাখা রোডে দুটি গাড়ী পাশাপাশি অতিক্রম করা খুবই কষ্টসাধ্য। তারপরও অবৈধভাবে সড়ক দখল করে নির্বিঘ্নে পসরা সাজিয়ে ব্যবসা করছে। এ যেন দেখার কেউ নেই।

স্থানীয়রা জানান, এই দখল প্রক্রিয়ার পেছনে একটি সংঘবদ্বদ্ধ চক্র সক্রিয় রয়েছে। তারা নির্দিষ্ট এলাকায় দোকান বসানোর অনুমতি দেওয়ার নামে প্রভাব বিস্তার করে এবং নিয়মিত অর্থ সংগ্রহ করে। রমজানকে কেন্দ্র করে নতুন দোকান বসানোর ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক হকারের দাবি, নির্দিষ্ট অঙ্ক পরিশোধ ছাড়া কোনো জায়গায় দোকান বসানো সম্ভব নয়। বড় বড় মার্কেটগুলোর সামনে হকার বসায় মার্কেটের ভেতরে ক্রেতা সাধারন প্রবেশ কম করছে বলে জানান এক মার্কেট মালিক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান হকারগন তাদের মার্কেটের পানি,বাথরুম টয়লেটসহ নানা সুবিধা জোর করেই ব্যবহার করছে। হকারদের কারনে তাদেরকে নিরাপত্তা কর্মী বাড়াতে হয়েছে। হকারগণ প্রায় বিভিন্ন ক্রেতা সাধারনের সাথে মারামারি তর্কে লিপ্ত হয়। তাদের কোন অন্যায় কাজের বাধা দিলে হকারগন মার্কেট কর্মীদের সাথে প্রায়ই ঝগড়ায় লিপ্ত হচ্ছে।

বাসস্ট্যান্ড ও ফুটওভারব্রিজ এলাকায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ চলাচল করেন। পৌর এলাকার মজিদ পুরের বাসিন্দা ফিরোজ কাশেম ও আলমগীর হোসেন জানান, ফুটওভারব্রিজ নির্মাণের উদ্দেশ্যই ছিল নিরাপদ পারাপার নিশ্চিত করা, কিন্তু দখলের কারণে সেই সুবিধা ভেস্তে গেছে।

সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অটোরিকশা ও ভ্যানও যানজট বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে বাসস্ট্যান্ড এলাকার  সংযোগ সড়ক যেমন বিরুলিয়া, চাঁপাইন রোড ও সাভার বাজারমুখী রাস্তায় প্রবেশমুখ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এতে বিকল্প সড়ক ব্যবহারের সুফলও মিলছে না।

এদিকে ফুটপাত দখল বিষয় নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে ফুটপাত দখলকারি হকারগন অনেক সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে  উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টির উদ্ধেশ্যে উচ্চ স্বরে হাক ডাক দিয়ে হৈচে করে।  স্থানীয়দের মতে, দখল ও অর্থ আদায়ের বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে প্রভাবশালী মহলের অস্বস্তি তৈরি হয়। তার জন্যেই সাংবাদিকদের উপর ক্ষিত হন চাঁদাবাজরা।

ঢাকা-১৯ আসনের সংসদ সদস্য দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবু তার নির্বাচনী ইশতেহারে মহাসড়ক দখল করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের ঘোষণা দিয়েছিলেন। নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি বিষয়টি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে। খুব শিগগিরই মহাসড়ক দখল করে বসানো স্থাপনা ও ভাসমান দোকান উচ্ছেদে অভিযান পরিচালনা করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

সাভার পৌর সভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও পৌর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুর রহমান জানান, সংসদ সদস্য খুব সহসাই আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করবেন। সংসদ সদস্য তার নির্বাচনী ওয়াদা অক্ষরে অক্ষরে রক্ষা করার চেষ্টা করছেন।

সাভার হাইওয়ে পুলিশের ওসি শাহজাহান শেখ জানান, ফুটপাত ও মহাসড়ক দখলমুক্ত করতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সাভার উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাইফুল ইসলাম জানান, সরকারী রাস্তা দখল করা ও ফুটপাত দখল করার অধিকার কারও নেই। দখলকারিদের খুব শীঘ্রই উচ্ছেদ করা হবে।

তবে স্থানীয়দের মতে, সমন্বিত ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। সাভারবাসী দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা দেখতে চান। তাদের প্রত্যাশা, ফুটপাত, ওভারব্রিজ ও মহাসড়ক দখলমুক্ত করে নিরাপদ ও স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করা হবে।

 

সর্বাধিক পঠিত