স্টাফ রিপোর্টার : সাভারে মৃত্যু নিবন্ধন, ওয়ারিশ সনদ, জন্ম নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্রসহ (এনআইডি) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি জালিয়াতির অভিযোগে একটি সক্রিয়চক্রের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধভাবে এসব প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে চক্রটি। এসব ঘটনায় সাভার মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছে বলে জানায় সাভার পৌরসভা কর্তৃপক্ষ।
জানা যায়, সাভার পৌর এলাকার ইমান্দিপুর ও আশপাশের এলাকায় বসে এই চক্রটি সরকারি দপ্তরের নাম ব্যবহার করে দ্রুত কাজ করে দেওয়ার প্রলোভন দেখায়। অনেকেই অজ্ঞতাবশত তাদের মাধ্যমে আবেদন করে পরে জাল সনদের কারণে নানা ধরনের আইনি জটিলতায় পড়ছেন।
ভুক্তভোগীদের একজন স্থানীয় যুবক সাজু আহমেদ। তিনি জানান, ইমান্দিপুর প্রাইমারি স্কুল সংলগ্ন মুদি দোকানদার মনির নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে মৃত্যু নিবন্ধন করার বিষয়ে কথা বলেন। মনির দাবি করেন, তিনি এ ধরনের সব কাজ করিয়ে দেন। পরে মনিরের মাধ্যমে মিঠু নামের এক ব্যক্তির কাছে টাকা দিয়ে মৃত্যু নিবন্ধনের কাজ করানো হয়।
কিছুদিন পর ওয়ারিশ সনদের জন্য পৌরসভায় আবেদন করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সাজুকে মূল মৃত্যু নিবন্ধন নিয়ে আসতে বলেন। নথি জমা দেওয়ার পর কর্তৃপক্ষ সেটিকে ভুয়া বলে জানান।
অভিযোগ করা হয়, স্বাক্ষর জাল করে সনদটি তৈরি করা হয়েছে। এতে সাজুসহ তার পরিবারের সদস্যরা চরম বিপাকে পড়েন।
সাজু জানান, তিনি স্থানীয়ভাবে পরিচিত মনির ও মিঠুর মাধ্যমে কাজটি করিয়েছিলেন এবং ওই ব্যক্তি এলাকায় আরও অনেকের জন্য একইভাবে কাজ করে থাকেন। বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
এদিকে, এই জালিয়াতিচক্রের বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন এক স্থানীয় সাংবাদিক।
অভিযোগ রয়েছে, তিনি চক্রের মূল হোতা বলে অভিযুক্ত মিঠুর কাছে তথ্য জানতে চাইলে তাকে পরবর্তীতে দেখা করতে বলা হয়। পরে ফোন করে রাতে ইমান্দিপুর এলাকায় ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর কয়েকজন মিলে তার ওপর অতর্কিত হামলা চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়রা এগিয়ে আসলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায় এবং তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। এ হামলার ঘটনায় তিনি সাভার মডেল থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মিঠু সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকার একটি কম্পিউটার দোকানে চাকরি করেন। পাশাপাশি ইমান্দিপুর চৌরাস্তার একটি মুদি দোকানে বসে কম্পিউটারের মাধ্যমে জন্ম নিবন্ধন, মৃত্যু নিবন্ধন, এনআইডি সংশোধনসহ বিভিন্ন নথি তৈরির নামে অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
এছাড়া সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকার জাতীয় অন্ধ কল্যাণ সংস্থা মার্কেটেও টুটুল নামে আরেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে একই ধরনের প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। ধারণা, তারা পরস্পরের যোগসাজশে একটি সংঘবদ্ধচক্র হিসেবে কাজ করছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এই চক্রটি সরকারি দপ্তরের নাম ভাঙিয়ে সহজে কাজ করে দেওয়ার কথা বলে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করে। অনেক সময় আসল নথির মতো দেখতে জাল সনদ তৈরি করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে এসব সনদ জমা দিতে গিয়ে মানুষ বিপদে পড়ছেন। কেউ কেউ মামলা, জরিমানা কিংবা সেবাবঞ্চনার শিকার হচ্ছেন।
সচেতন মহল বলছেন, মৃত্যু নিবন্ধন, জন্ম নিবন্ধন ও এনআইডি সংক্রান্ত কাজগুলো এখন অনলাইনে হওয়ায় সাধারণ মানুষ দ্রুত সমাধানের আশায় মধ্যস্বত্বভোগীদের শরণাপন্ন হন। এই সুযোগে প্রতারক চক্রগুলো সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
তারা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, এ ধরনের জালিয়াতি শুধু আর্থিক প্রতারণাই নয়, জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও হুমকি। কারণ জাল পরিচয়পত্র বা নথি ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নাগরিক সেবা নিতে হলে সরাসরি সরকারি দপ্তরে যোগাযোগ করা উচিত। অচেনা বা অননুমোদিত ব্যক্তির মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ নথি তৈরি করালে প্রতারণার শিকার হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি।
এ বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
এসব ঘটনার বিষয় সাভার পৌর প্রশাসক এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: সাইফুল ইসলাম বলেন, সাভার পৌরসভার বিভিন্ন কাগজপত্রে স্বাক্ষর জালিয়াতি করে সরবরাহ হয়েছে এমন অভিযোগ আমরা পেয়েছি। সম্প্রতি দুইটা ডকুমেন্ট আমাদের সন্দেহ হয়েছে, যেখান স্বাক্ষরগুলো আমাদের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নায়। ওই ২টি বিষয়ে থানায় জিডি করতে বলা হয়েছে। পরে তদন্ত করে এই জালিয়াতি চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
