শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
MENU
#
প্রধানমন্ত্রীর এক ঘোষণাতেই ঋণমুক্ত ১২ লাখ কৃষক
daily-fulki

প্রধানমন্ত্রীর এক ঘোষণাতেই ঋণমুক্ত ১২ লাখ কৃষক


স্টাফ রিপোর্টার : দেশের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের স্বস্তি দিতে বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। কৃষিঋণের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত (সুদসহ) মওকুফ করার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের প্রায় ১২ লাখ কৃষক মোট প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ থেকে মুক্তি পেতে যাচ্ছেন। নির্বাচনের আগে তারেক রহমান ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করার প্রতিশ্রুতি দেন। নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর সরকার গঠন করে সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ করছেন প্রধানমন্ত্রী। এর ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা ঋণের দায় থেকে মুক্ত হতে পারবেন, যা তাদের কর্মস্পৃহা বৃদ্ধি করবে এবং দেশের কৃষি খাতে উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ নিয়ে বৃহস্পতিবার সকালে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে নতুন মন্ত্রিসভার আনুষ্ঠানিক প্রথম বৈঠক হয়। সেই বৈঠকের পর ওই দিন বিকালেই সংবাদ সম্মেলন করে এ সিদ্ধান্ত জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ নেওয়ার পর যত সুদই হোক, সুদ-আসলসহ পুরোটা মওকুফ হবে। তিনি বলেন, সরকার তার নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী শস্য, ফসল, মৎস্য ও পশুপালন খাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলোÑদরিদ্র কৃষকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কৃষি খাতের মেরুদণ্ডকে শক্তিশালী করা।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, সরকারি বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংক এবং বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সুদসহ কৃষকদের কাছে পাওনা আছে প্রায় ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা, যা এই মওকুফের আওতাভুক্ত হবে। এই ঋণ মওকুফ করা হলে আনুমানিক ১২ লাখ কৃষক প্রত্যক্ষভাবে লাভবান হবেন। ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা ঋণের দায় থেকে মুক্ত হতে পারবেন, যা তাদের কর্মস্পৃহা বৃদ্ধি করবে এবং দেশের কৃষি খাতে উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

নাসিমুল গনি আরও বলেন, এখন ঋণের কিস্তি বাবদ যে অর্থ কৃষকের ব্যয় হতো, সেই অর্থ তারা উন্নতমানের বীজ বা আধুনিক সেচ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে পারবেন। মাথার ওপর ঋণের বোঝা না থাকায় কৃষক পরবর্তী মৌসুমে নতুন উদ্যমে চাষাবাদ শুরু করতে সক্ষম হবেন। এছাড়া এই মওকুফ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কৃষকদের ক্রেডিট রেকর্ড বা ঋণমান ভালো হবে। ফলে তারা ব্যাংক থেকে পুনরায় স্বল্পসুদে কৃষিঋণ গ্রহণ করতে পারবেন, যা তাদের স্থানীয় মহাজনী ঋণের উচ্চ সুদের হাত থেকে রক্ষা করবে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব আরও বলেন, ঋণের বোঝা কমে যাওয়ায় কৃষকরা শস্য, মৎস্য ও পশুপালন খাতে আরও উৎসাহিত হবেন। এতে জাতীয় কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে। ঋণ মওকুফের প্রায় তাৎক্ষণিক প্রভাব হিসেবে গ্রাম থেকে নগরমুখী অভিবাসন কমবে এবং গ্রামীণ মূল্যস্ফীতি হ্রাস পাবে।

তিনি আরও জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সরকারের ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ মেয়াদে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণের সুদ-আসল মওকুফ করা হয়েছিল, যা কৃষকদের কষ্ট লাঘব করে কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধি করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছিল।

তারেক রহমানের প্রতিশ্রুতি

চলতি মাসের ৭ ফেব্রুয়ারি ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় বড় মাঠে বিএনপি আয়োজিত জনসভায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছিলেন, বাংলাদেশের মানুষ ধানের শীষকে নির্বাচিত করলে, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করতে চাই। এনজিও থেকে দুস্থ মানুষ বিভিন্ন সময় যে ক্ষুদ্রঋণ গ্রহণ করেছেনÑতা জনগণের পক্ষ থেকে পরিশোধ করতে চাই। উত্তরাঞ্চল কৃষিপ্রধান এলাকা। আমরা চাই, এই এলাকার মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে। কৃষির সঙ্গে সম্পর্কিত যত শিল্প-কলকারখানা আছে, সেসব এই এলাকায় গড়ে তুলতে চাই।

কৃষিঋণ বিতরণ কার্যক্রম

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) কৃষিঋণ বিতরণ প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৮ কোটি টাকায়, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় বড় অগ্রগতি। একই সঙ্গে ঋণ আদায়েও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে, যা ব্যাংকিং খাতে কৃষিঋণের টেকসই ব্যবস্থাপনার ইঙ্গিত দেয়।

তথ্য অনুযায়ী, এ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে কৃষিঋণ আদায় হয়েছে ২১ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি। ফলে বকেয়া কৃষিঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬২ হাজার ৭২৩ কোটি টাকা, যা এক বছরে ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ঋণ বিতরণ ও আদায়- দুই সূচকেই একযোগে প্রবৃদ্ধি হওয়ায় কৃষি অর্থায়নে স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত মিলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিঋণ বিতরণ বৃদ্ধির পেছনে প্রধান কারণ হলোÑ কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি, চাষাবাদের আওতা সম্প্রসারণ এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় কৃষকদের বাড়তি বিনিয়োগের প্রয়োজন।

কৃষকদের ঋণ বরাদ্দ

২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক কৃষি ও পল্লী খাতে ৩৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যা পূর্ববর্তী বছরের (২০২৪-২৫) ৩৮ হাজার কোটি টাকার তুলনায় ২.৬৩ শতাংশ বেশি। এই ঋণের মূল লক্ষ্য উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রকৃত কৃষকদের সহায়তা করা।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ মনে করেন, কৃষিঋণ বিতরণ ও আদায়Ñ উভয় ক্ষেত্রেই প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত। সময়মতো ও কার্যকর ঋণপ্রবাহ কৃষকদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়তা করে এবং তাদের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সহজশর্তে ঋণ পেলে কৃষকরা উন্নত বীজ, সেচব্যবস্থা ও আধুনিক কৃষিযন্ত্রে বিনিয়োগ করতে পারেন, যা ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার করে।
 

সর্বাধিক পঠিত