স্টাফ রিপোর্টার : সতেরো বছরেও সম্পন্ন হয়নি রাজধানীর পিলখানায় বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) সদরদপ্তরে ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে নৃশংসভাবে হত্যার বিচার। এই ঘটনায় হত্যা মামলার বিচার আপিল বিভাগে শুনানির জন্য অপেক্ষমাণ আছে। ২০১১ সালে শুরু হওয়া বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলার বিচার ঢাকার আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে আটকে আছে। এই মামলায় শেখ হাসিনাসহ কয়েকজনকে নতুন করে আসামি করার প্রক্রিয়া চলছে।
২০২৪ সালে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পুনঃতদন্তের দাবি ওঠে। ওই বছরের ২৩ ডিসেম্বর সাত সদস্যের জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। সাবেক বিডিআরের মহাপরিচালক আ ল ম ফজলুর রহমানকে কমিশনের প্রধান করা হয়। সেই কমিশন অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করেছে।
প্রতিবেদনে পিলখানা হত্যাকাণ্ডে ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম উঠে এসেছে। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন (প্রয়াত), সাবেক এমপি শেখ ফজলে নূর তাপস, মির্জা আজম, জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছে, শেখ হাসিনাসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলার স্পেশাল পিপি বোরহান উদ্দিন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে শেখ হাসিনা ও অন্যদের আসামি করা হবে। এ মামলায় বর্তমানে আসামি প্রায় সাড়ে ৮০০।
রাষ্ট্রপক্ষ থেকে জানানো হয়, মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের জবানবন্দিতে শেখ হাসিনা, ফজলে নূর তাপস, মির্জা আজম, জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ তৎকালীন প্রভাবশালী মন্ত্রী ও নেতাদের এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট তথ্য উঠে এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।
এদিকে বিডিআর হত্যাকাণ্ড মানবতাবিরোধী অপরাধের আওতায় পড়লে এর বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) হবে বলে জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম। গত সোমবার ট্রাইব্যুনাল থেকে বিদায়ের প্রাক্কালে তিনি বলেন, এ হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে অভিযোগ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের কাছে এসেছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখা হবে। এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
সদ্য বিদায় নেওয়া প্রধান উপদেষ্টার ফেসবুক পেজ থেকে ওই প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ পাওয়া গেছে। যদি মনে হয়, বিডিআর হত্যাকাণ্ড মানবতাবিরোধী অপরাধের মধ্যে পড়ে কিংবা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার করার উপযুক্ত, তাহলে এখানে (ট্রাইব্যুনালে) হবে। অন্যথায় দেশের প্রচলিত অন্যান্য আইনে বিচার হতে পারে।
ঢাকার আদালতে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে করা মামলায় এক হাজার ২০০ সাক্ষীর মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০২ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন সাক্ষীর জবানবন্দিতে শেখ হাসিনাসহ একাধিক ব্যক্তির সম্পৃক্ততার তথ্য এসেছে বলে দাবি করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এ মামলার ৪৬৮ আসামির মধ্যে প্রায় ৩০০ জন জামিন পেয়েছেন বলে জানা গেছে।
আসামি পক্ষের আইনজীবী পারভেজ হোসাইন বলেন, ‘হত্যা মামলায় যারা খালাস পেয়েছেন, তাদের অনেকে বিস্ফোরক মামলায়ও আসামি হওয়ায় এখনও জামিন পাননি। এটি আইনি জটিলতা আরও বাড়িয়েছে।’ চূড়ান্তভাবে মামলাগুলো কখন নিষ্পত্তি হবে, তা কেউ বলতে পারছেন না। তবে রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, নতুন চার্জশিটের মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হয়েছে।
প্রেক্ষাপট
২০০৯ সালের ২৪-২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানার হত্যাকাণ্ড নিয়ে করা হয় হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে দুটি মামলা। ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর হত্যা মামলায় ঢাকার বিচারিক আদালত ১৫২ জনের মৃত্যুদণ্ড দেন। ২০১৭ সালের ২৭ নভেম্বর হাইকোর্টে আপিলের রায়ে ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রাখা হয়। আটজনের মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন ও চারজনকে খালাস দেওয়া হয়। বিচারিক আদালতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ পাওয়া ১৬০ জনের মধ্যে ১৪৬ জনের সাজা বহাল রাখা হয়। হাইকোর্টে আপিল চলার সময় কারাগারে থাকা অবস্থায় দুজনের মৃত্যু হয়। খালাস পান ১২ আসামি।
আসামি পক্ষের আইনজীবী আমিনুল ইসলাম বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর। গতকাল তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘পিলখানা মামলায় আসামি পক্ষে আমি দীর্ঘদিন কাজ করেছি। দুটি মামলার মধ্যে বিস্ফোরক মামলা নিম্ন আদালতে বিচারাধীন। এই মামলাটি যে গতিতে চলছে আরও এক হাজার ৩০০ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হলে ২০ বছর লাগবে নিষ্পত্তি হতে। আমলার আসামিরা ১৬ বছর ধরে বিনা বিচারে আটক আছেন। বর্তমান সরকার যদি মনে করে এই মামলা নতুন করে তদন্ত হবে, প্রয়োজন হলে সেটা হতে পারে। তবে স্বাধীন তদন্ত কমিশন এখন পর্যন্ত তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি এবং আদালতে তা দাখিলও করেনি। হাইকোর্টে নিষ্পত্তি হওয়া হত্যা মামলাটি আপিল বিভাগে চূড়ান্ত শুনানির অপেক্ষায় আছে। সেটা যেন দ্রুত শুনানি হয় সে প্রত্যাশা করছি।’
কর্মসূচি
আজ বুধবার বনানীতে সামরিক কবরস্থানে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তিন বাহিনীর প্রধান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব ও বিজিবি মহাপরিচালক পিলখানায় নিহতদের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। এ ছাড়া পিলখানার কেন্দ্রীয় মসজিদে খতমে কোরআন, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল আয়োজন করা হয়েছে।
