স্টাফ রিপোর্টার : জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন পেতে বিএনপিতে দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। এ ক্ষেত্রে মহিলা দলের পাশাপাশি অতীতে ছাত্রদল করা নেত্রীরা বেশ এগিয়ে আছেন।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের পর থেকেই সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তৎপরতা শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে অনেকে বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, দলীয় আনুগত্য ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার বিবরণ দিয়ে প্রোফাইল (বৃত্তান্ত) তৈরি করে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পাঠানো শুরু করেছেন। আবার অনেকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করে মনোনয়ন নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন।
যদিও বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, নারী আসনের বিষয়ে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এখন পর্যন্ত কার্যক্রম শুরু হয়নি।
জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন ৫০টি। প্রতি ছয়জন সাধারণ সদস্যের বিপরীতে একটি সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টন হবে। কোনো কারণে বণ্টন করা আসনসংখ্যা মোট আসনের চেয়ে বেড়ে গেলে ভগ্নাংশের হিসাবে হেরফের হতে পারে। আইনে কোনো কোনো ক্ষেত্রে লটারির বিধানও রয়েছে।
১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসনে জয় পায়। আসন অনুপাতে সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসনের মধ্যে দলটি পাবে ৩৫টি। এ ছাড়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ১১টি ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ১টি আসন পাবে। অন্য ৩টি আসন স্বতন্ত্র প্রার্থী ও নিজস্ব প্রতীকে জয়ী ছোট দলগুলোর মধ্যে বণ্টন করা হবে। দলগুলো হলো বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), গণ অধিকার পরিষদ ও খেলাফত মজলিস।
বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শনিবার বলেন, সংরক্ষিত মহিলা আসনের মনোনয়নের বিষয়টি ঈদের আগে চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার সংরক্ষিত নারী আসনগুলো হবে নবীন-প্রবীণের মিশ্রণে। তবে অপেক্ষাকৃত তরুণদের বড় একটা অংশকে দেখা যেতে পারে। পুরোনোদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শিরিন সুলতানা, রেহানা আক্তার (রানু), ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নিপুণ রায় চৌধুরী, সংগীতশিল্পী বেবী নাজনীন, নিলুফার চৌধুরী (মনি), বিলকিস ইসলাম, শাম্মী আখতার, সৈয়দা আসিফা আশরাফী (পাপিয়া), রাশেদা বেগম (হীরা), রোখসানা খানম, আয়েশা সিদ্দিকা, নেওয়াজ হালিমা, ফরিদা ইয়াসমীন, হেলেন জেরিন, আইনজীবী শাকিলা ফারজানা, স্বেচ্ছাসেবক দলের প্রয়াত সভাপতি শফিউল বারী বাবুর স্ত্রী বীথিকা বিনতে হোসাইন, চট্টগ্রাম মহিলা দলের মনোয়ারা বেগম (মনি) ও মহিলা দলের দক্ষিণের আহ্বায়ক রুমা আক্তার আলোচনায় আছেন।
বেবী নাজনীন সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব করার আগ্রহের কথা জানিয়ে বলেন, ‘আমরা দৌড়ঝাঁপ করছি না। তবে যাঁরা এ পদ দাবি করার যোগ্য, অবশ্যই তাঁদের নাম লিখবেন।
এবার ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী। তাঁদের মধ্যে মহিলা দলের সহ–স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক আসমা আজিজ, সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি সুলতানা জেসমিন (জুঁই), মহিলা দলের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্যসচিব নাসিমা আক্তার (কেয়া), খিলগাঁও মডেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক রোকেয়া চৌধুরী, ঢাকার কোতোয়ালি থানা বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক কাউন্সিলর সুরাইয়া বেগমসহ অনেকে প্রোফাইল (বৃত্তান্ত) তৈরি করে বিবেচনার জন্য বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নেতাদের কাছে পাঠিয়েছেন।
সাবেক ছাত্রদল নেত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা সুলতানা জেসমিন বলেন, ‘আমার মনে হয়, রাজনীতিতে শ্রম ও ঘামের সঙ্গে একাডেমিক কম্বিনেশন, অর্থাৎ পড়াশোনা ও যোগ্যতারও সংমিশ্রণ দরকার।’
মনোনয়ন ঠিক করছে জামায়াত
জামায়াতে ইসলামীও সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন ঠিক করছে বলে জানা গেছে। এ জন্য মহিলা বিভাগ থেকে পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে। দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হবে।
দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক ও প্রকৌশলীদের মধ্য থেকে মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি নূরুন্নিসা সিদ্দীকা, আইন ও মানবসম্পদ বিভাগীয় সেক্রেটারি আইনজীবী সাবিকুন্নাহার, সহকারী সেক্রেটারি মার্জিয়া বেগম, মহিলা বিভাগের সদস্য ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রভাষক মারদিয়া মমতাজের নাম আলোচনায় আছে। এ ছাড়া ভিন্ন ধর্মাবলম্বী থেকেও একজনকে মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে বলে একজন দায়িত্বশীল নেতা জানিয়েছেন।
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, ‘আমরা মনোনয়ন ঠিক করছি। সংসদে যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারেন, এমন উপযুক্ত নারীদের মনোনয়ন দেব।
দলীয় সূত্র থেকে জানা গেছে, জামায়াতের মহিলা বিভাগ থেকে একটি খসড়া তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে তা চূড়ান্ত করা হবে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম মাছুম বলেন, মহিলা বিভাগ থেকে একটি খসড়া তালিকা চাওয়া হয়েছে। সেই তালিকা থেকে যাচাই-বাছাই করে মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হবে। সংসদের প্রথম অধিবেশনের আগেই সেটি চূড়ান্ত করে জানানো হবে।
জামায়াতে ইসলামী এর আগে ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন পায় দুটি ও ২০০১ সালে অষ্টম সংসদে পেয়েছিল চারটি আসন। এরপর দলটি তাদের ইতিহাসে এবার ত্রয়োদশ সংসদে সর্বোচ্চসংখ্যক নারী আসন পেতে যাচ্ছে।
আলোচনায় এনসিপির দুজন
এনসিপি সংরক্ষিত নারী আসনে একজনকে পাঠাতে পারবে। এই পদের জন্য আলোচনায় আছেন দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন ও দক্ষিণাঞ্চলের যুগ্ম মুখ্য সংগঠক মাহমুদা আলম (মিতু)।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের পাঁচ দিন পার হলো গতকাল। নতুন জাতীয় সংসদের অধিবেশন এখনো ডাকা হয়নি।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতিকে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন ডাকতে হয়। তিনি প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শ অনুযায়ী তা করেন। এবারের সংসদ নির্বাচনে বিজয়ীদের গেজেট প্রকাশিত হয় ১৩ ফেব্রুয়ারি। সে হিসাবে ১৪ মার্চের মধ্যে সংসদের প্রথম অধিবেশন বসার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
গেজেটের ৯০ দিনের মধ্যে করতে হবে
জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন অনুযায়ী, সাধারণ নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলের সরকারি গেজেট প্রকাশের ৯০ দিনের মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। নির্বাচন কমিশন প্রজ্ঞাপন জারি করে মনোনয়ন, বাছাই, প্রত্যাহার ও ভোটের তারিখ নির্ধারণ করবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন ও নির্বাচনপ্রক্রিয়া সম্পন্নের জন্য এখনো হাতে সময় আছে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ২৯৯টি আসনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নারী প্রার্থী ছিলেন ৮৬ জন। তাঁদের মধ্যে জয়ী হয়েছেন ৭ জন। এর মধ্যে ৬ জন বিএনপির, ১ জন স্বতন্ত্র। সংরক্ষিত ৫০টি আসন যুক্ত হলে সংসদে মোট নারী সদস্য হবেন ৫৭ জন, যা ৩৫০ সদস্যের সংসদে প্রায় ১৬ শতাংশ।
ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরী মনে করেন, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেক নারী নেতা সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীর ক্ষমতায়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় নারীর নেতৃত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও বিগত সময়ে মাঠের ভূমিকা—সবকিছু বিবেচনা করেই সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন চূড়ান্ত করবেন।
