ফুলকি ডেস্ক : পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী আবারও আফগানিস্তানে বিমান হামলা চালিয়েছে। তারা বলেছে, পাকিস্তানে সাম্প্রতিক একাধিক হামলার পেছনে থাকা আফগান সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ‘ক্যাম্প ও আস্তানা’ লক্ষ্য করে এই অভিযান চালানো হয়েছে। এসব হামলার মধ্যে ইসলামাবাদের এক শিয়া মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলায় বহু মুসল্লির মৃত্যু হয়।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানের তালেবান সরকার তাৎক্ষণিকভাবে এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে আফগান সূত্র আল জাজিরাকে জানিয়েছে, আজ রোববার চালানো এই হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল সীমান্তবর্তী দুটি প্রদেশের একাধিক স্থান। সূত্রগুলো জানায়, পাকতিকা প্রদেশের একটি ধর্মীয় বিদ্যালয়ে ড্রোন হামলা হয়েছে। পাশাপাশি নানগারহার প্রদেশেও হামলা চালানো হয়েছে।
পাকিস্তানের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে শেয়ার করা বিবৃতিতে জানায়, দেশটির সামরিক বাহিনী গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ‘নির্বাচিত অভিযান’ চালিয়েছে। এতে পাকিস্তান তালেবান, যা তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) নামেও পরিচিত, তাদের সাতটি ক্যাম্প ও আস্তানা এবং সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সীমান্ত অঞ্চলে আইএসের একটি সহযোগী গোষ্ঠীকেও লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, ইসলামাবাদসহ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বাজাউর ও বান্নু জেলায় সাম্প্রতিক হামলাগুলো আফগানিস্তানভিত্তিক নেতৃত্ব ও সমন্বয়কারীদের নির্দেশে চালানো হয়েছে—এমন ‘চূড়ান্ত প্রমাণ’ তাদের কাছে আছে।
তারা বলেছে, পাকিস্তান বারবার তালেবান সরকারকে আহ্বান জানিয়েছে যেন আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো অন্য দেশে হামলা চালাতে না পারে, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়। কিন্তু কাবুল এ ব্যাপারে কোনো ‘কার্যকর পদক্ষেপ’ নেয়নি। বিবৃতিতে বলা হয়, পাকিস্তান সব সময় অঞ্চলজুড়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। তবে পাকিস্তানি নাগরিকদের নিরাপত্তাই তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের বান্নু জেলায় একটি নিরাপত্তা বহরে আত্মঘাতী হামলার কয়েক ঘণ্টা পরই আফগানিস্তানে এই বিমান হামলা চালানো হয়। ওই হামলায় এক লেফটেন্যান্ট কর্নেলসহ দুই সেনাসদস্য নিহত হন।
সোমবার অস্ত্রধারীদের সহায়তায় এক আত্মঘাতী হামলাকারী বিস্ফোরকভর্তি একটি গাড়ি বাজাউরের একটি নিরাপত্তাচৌকির দেয়ালে আঘাত করে। এতে ১১ সেনাসদস্য ও এক শিশু নিহত হয়। পরে কর্তৃপক্ষ জানায়, হামলাকারী আফগান নাগরিক ছিল।
এর আগে ৬ ফেব্রুয়ারি ইসলামাবাদের তারলাই কালান এলাকায় খাদিজাতুল কুবরা মসজিদে জোহরের নামাজের সময় আরেক আত্মঘাতী হামলাকারী বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে অন্তত ৩১ জন মুসল্লি নিহত এবং ১৭০ জন আহত হন। আইএস এই হামলার দায় স্বীকার করে।
কড়া নিরাপত্তায় থাকা রাজধানীতে বোমা হামলা বিরল। তবে খাদিজাতুল কুবরা মসজিদে হামলাটি ছিল তিন মাসের মধ্যে দ্বিতীয় ঘটনা। এতে পাকিস্তানের বড় শহরগুলোতে আবারও সহিংসতা ফিরে আসার আশঙ্কা দেখা দেয়। সে সময় পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী জানায়, এই হামলার পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও উসকানি আফগানিস্তানেই হয়েছে।
রোববারের বিবৃতিতে পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানায়, তারা যেন তালেবানকে চাপ দেয়। ২০২০ সালে কাতারের রাজধানী দোহায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা চুক্তির প্রতিশ্রুতি তালেবান যেন রক্ষা করে। ওই চুক্তিতে বলা হয়েছিল, আফগান ভূখণ্ড অন্য দেশের বিরুদ্ধে হামলার জন্য ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। মন্ত্রণালয় বলেছে, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য এই পদক্ষেপ ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানে সহিংসতা বেড়েছে। এর বেশির ভাগের জন্য টিটিপি এবং নিষিদ্ধ বালুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করা হয়। ইসলামাবাদ অভিযোগ করে, টিটিপি আফগানিস্তানের ভেতর থেকে কার্যক্রম চালায়। তবে গোষ্ঠীটি এই অভিযোগ অস্বীকার করে।
তালেবান সরকারও ধারাবাহিকভাবে অস্বীকার করে আসছে যে তারা পাকিস্তানবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় দেয়। অক্টোবর থেকে দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ। ওই সময় সীমান্তে সংঘর্ষে বহু সেনাসদস্য, বেসামরিক নাগরিক এবং সন্দেহভাজন যোদ্ধা নিহত হন।
এর আগে কাবুলে বিস্ফোরণের ঘটনায় আফগান কর্মকর্তারা পাকিস্তানকে দায়ী করেন। ১৯ অক্টোবর কাতারের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় এবং তা মোটামুটি টিকে আছে। তবে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে পরবর্তী আলোচনা হলেও কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়নি।
