রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
MENU
#
সাহরির গুরুত্ব ও ফজিলত
daily-fulki

সাহরির গুরুত্ব ও ফজিলত


স্টাফ রিপোর্টার : সাহরি’ শব্দটি এসেছে ‘সাহর’ থেকে, যার অর্থ শেষ রাত বা ভোররাত। ফজরের আগমুহূর্তে রোজা পালনের নিয়তে যে খাবার গ্রহণ করা হয় তাকে সাহরি বলা হয়। ইসলামে সাহরির মূল উদ্দেশ্য হলো রোজাদারকে রোজা পালনে শক্তি জোগানো এবং আল্লাহর আদেশ পালনে প্রস্তুত করা। তবে এর তাৎপর্য শুধু শারীরিক নয়; বরং এটি একটি ইবাদত, যা বান্দাকে আল্লাহর নৈকট্য লাভে সহায়তা করে।


কোরআনের আলোকে সাহরির গুরুত্ব

আল্লাহ তাআলা কোরআনে রোজা সম্পর্কিত বিধান বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘আর তোমরা পানাহার করো যতক্ষণ না ফজরের সাদা সুতা কালো সুতা থেকে পৃথক হয়ে যায়।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৭)

এই আয়াতে স্পষ্টভাবে ফজরের আগ পর্যন্ত পানাহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যা সাহরির বৈধতা ও গুরুত্ব প্রমাণ করে। সাহরি রোজার প্রস্তুতির অংশ এবং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিশেষ সুযোগ। এটি আল্লাহর রহমত, যাতে বান্দা কষ্ট লাঘব করে ইবাদতে মনোনিবেশ করতে পারে।

হাদিসের আলোকে সাহরির ফজিলত

রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহরির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা সাহরি খাও; কেননা সাহরিতে রয়েছে বরকত।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

এই সংক্ষিপ্ত হাদিসে সাহরির ফজিলত অত্যন্ত সুস্পষ্ট। সাহরির মধ্যে এমন এক বরকত নিহিত, যা শুধু খাদ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা সময়, ইবাদত, স্বাস্থ্য ও জীবনের নানা ক্ষেত্রে বিস্তৃত।

অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমাদের রোজা ও আহলে কিতাবের রোজার মধ্যে পার্থক্য হলো সাহরি।’ (সহিহ মুসলিম)

এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, সাহরি ইসলামের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য এবং উম্মতে মুহাম্মদির জন্য বিশেষ সম্মান।

সাহরির বরকত ও কল্যাণ

সাহরির বরকত বহুমাত্রিক। প্রথমত, সাহরি রোজাদারকে দৈহিক শক্তি জোগায়, যা সারা দিন ইবাদত ও কর্মে সহায়ক। দ্বিতীয়ত, সাহরির সময় মানুষ ঘুম থেকে উঠে আল্লাহর স্মরণে মশগুল হয়, দোয়া করে, ইস্তিগফার করে।

আল্লাহ তাআলা শেষ রাতে বান্দার দোয়া কবুল করেন—এ কথা কোরআন ও হাদিসে বারবার উল্লেখ এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা শেষ রাতে ক্ষমা প্রার্থনা করে।’
(সুরা : জারিয়াত, আয়াত : ১৮)

সাহরির সময় মূলত সেই শেষ রাতের অন্তর্ভুক্ত, যখন ইস্তিগফার ও দোয়ার বিশেষ ফজিলত রয়েছে।

ফেরেশতাদের দোয়া ও রহমত

হাদিসে এসেছে, ‘আল্লাহ ও তার ফেরেশতারা সাহরি গ্রহণকারীদের জন্য দোয়া করেন।’ (মুসনাদে আহমাদ) এটি সাহরির এক অসাধারণ ফজিলত। যে ব্যক্তি সাহরি খায়, তার জন্য আল্লাহর রহমত ও ফেরেশতাদের দোয়া বর্ষিত হয়।

অল্প সাহরিও সুন্নত

অনেক মানুষ মনে করে, সাহরি না খেলেও রোজা রাখা যাবে। যদিও রোজা শুদ্ধ হয়, তবে সাহরি বর্জন করা সুন্নত পরিত্যাগের শামিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহরিতে অল্প কিছু হলেও গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এক ঢোক পানি দিয়ে হলেও সাহরি করো।’ এ থেকে বোঝা যায়, সাহরির মূল উদ্দেশ্য খাবারের পরিমাণ নয়; বরং আল্লাহ ও তার রাসুলের আদেশ পালন।

সাহরি ও তাকওয়া অর্জন

রমজানের মূল লক্ষ্য তাকওয়া অর্জন। সাহরি সেই তাকওয়ার পথে এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। ফজরের আগে ঘুম ত্যাগ করে সাহরি খাওয়া আত্মসংযম, নিয়মানুবর্তিতা ও আল্লাহভীতির বাস্তব প্রশিক্ষণ। এটি বান্দাকে আল্লাহর আদেশের প্রতি অনুগত হতে শেখায়।

স্বাস্থ্যগত উপকারিতা

ইসলামের প্রতিটি বিধানের মধ্যেই মানুষের কল্যাণ নিহিত। সাহরি স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও অত্যন্ত উপকারী। এটি শরীরকে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার জন্য প্রস্তুত করে, পানিশূন্যতা কমায় এবং দুর্বলতা থেকে রক্ষা করে। আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যার দৃষ্টিতেও সাহরি রোজাদারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

সাহরি অবহেলা করার কুফল

যারা নিয়মিত সাহরি পরিত্যাগ করে, তারা শুধু সুন্নতের সওয়াব থেকেই বঞ্চিত হয় না; বরং অনেক সময় রোজার মধ্যে ক্লান্তি, বিরক্তি ও অস্থিরতার সম্মুখীন হয়। এতে ইবাদতে মনোযোগ কমে যেতে পারে। অথচ সাহরি এই সমস্যাগুলো অনেকাংশে দূর করে।

বরকতময় সুন্নত

সাহরি রমজানের এক গুরুত্বপূর্ণ ও বরকতময় সুন্নত। এটি শুধু খাদ্য গ্রহণের বিষয় নয়; বরং একটি পূর্ণাঙ্গ ইবাদত, যার সঙ্গে জড়িত রয়েছে আল্লাহর রহমত, ফেরেশতাদের দোয়া, তাকওয়া অর্জন এবং শারীরিক-মানসিক কল্যাণ। কোরআন ও হাদিসে সাহরির যে গুরুত্ব ও ফজিলত বর্ণিত হয়েছে, তা আমাদের সাহরি পালনে আরো যত্নবান হতে উৎসাহিত করে। তাই প্রত্যেক রোজাদারের উচিত সাহরিকে অবহেলা না করে নিয়মিত পালন করা এবং এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি ও অফুরন্ত সওয়াব অর্জনের চেষ্টা করা।
 

সর্বাধিক পঠিত