শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
MENU
#
ভাষার লড়াই কখনও শেষ হয়?
daily-fulki

ভাষার লড়াই কখনও শেষ হয়?


স্টাফ রিপোর্টার : বাংলা ভাষার অধিকার অর্জনের ৭০ বছরে এসেও ভাষার প্রতি আমরা যতটা আবেগ দেখাই, ততটা দায়িত্বশীলতা দেখাতে পেরেছি কিনা—এ প্রশ্ন সামনে এসেছে বারবার। বিভিন্ন সময় বাংলা ভাষার ওপর আঘাত এসেছে। কখনও বলনে, কখনও ভাষা হিসেবে এর চলনে। বাংলা ভাষায় বিদেশি ভাষা প্রবেশ করবে কতটা, যথাযথ বাংলা আছে— এমন কোনও শব্দ অন্য ভাষা থেকে প্রবেশ করানো যাবে কিনা, সে নিয়ে তর্ক বহুদিনের। ভাষাতাত্ত্বিকরা বলছেন, ভাষার লড়াই সাধারণত কখনও পুরোপুরি শেষ হয় না, তার রূপ বদলায়। ভাষা মানুষের পরিচয়, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক অধিকারের সঙ্গে জড়িত। তাই স্বীকৃতি ও মর্যাদার প্রশ্নে দ্বন্দ্ব থেকে যায়। ফলে বিভিন্ন সময়ে এমন কিছু শব্দ বাংলায় প্রবেশ করানোর চেষ্টা হয়েছে—যা শঙ্কা তৈরি করেছে। কিন্তু ভাষা নিয়ে শঙ্কার কিছু নেই উল্লেখ করে ভাষাতাত্ত্বিকরা বলছেন, সতর্ক থাকার বিষয় আছে, কিন্তু সময়কে অস্বীকার করার উপায় নেই।

তবে ভাষার লড়াই চলতেই থাকবে কিনা, সে প্রশ্নে ভাষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কখনোই লড়াই সম্পূর্ণ শেষ না হলেও লড়াই শান্ত ও ন্যায্য সহাবস্থানে রূপ নিতে পারে। যদি বহুভাষিক নীতি গৃহীত হয়, শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে মাতৃভাষার স্থান নিশ্চিত হয়, সংখ্যালঘু ভাষার অধিকার আইনি সুরক্ষা পায়—তখন সেটা স্থিতিশীল অবস্থায় থাকে। এই লড়াইটা একটি চলমান প্রক্রিয়া।


বাংলার প্রাচীন শিকড় প্রাকৃত-অপভ্রংশ ধারা থেকে। পরে সংস্কৃতের প্রভাব গভীর হয়। ধর্মীয় ও সাহিত্যিক ভাষায় সংস্কৃত-ঘেঁষা শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়েছে। মধ্যযুগে মুসলিম শাসন ও সংস্কৃতির প্রভাবে প্রশাসন, বিচার, পোশাক, খাদ্য ও দৈনন্দিন জীবনে বহু আরবি-ফারসি শব্দ ঢোকে। বাংলায় পর্তুগিজ থেকেও বেশ কিছু শব্দ ঢুকেছে। বিভিন্ন ভাষা থেকে শব্দ আত্তীকরণে ভাষা সমৃদ্ধ হয় বলা হয়ে থাকলেও রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণে যখন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে শব্দ জোরপূর্বক প্রবেশের চেষ্টা করা হয়, সেখানে উৎপাদিত হয় সমস্যা।


‘ভাষার লড়াই শেষ হয় না’, উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৌমিত্র শেখর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বিভিন্ন সময়ে বাংলা ভাষায় বিভিন্ন শব্দ প্রবেশের যে চেষ্টা, সেটার বীজ বহু আগে বপন হয়েছে। আজাদি, হিস্যা, রামাদানের মতো শব্দগুলো গত কয়েকটা বছর আমাদের ভাষায় প্রবেশ করানো হয়েছে। অথচ এই শব্দগুলোর সুন্দর বাংলা রয়েছে। বহুজন এ ধরনের ভাষা তাদের লেখায় ও কথায় প্রয়োগ করেছেন। তাদের কথার মধ্য দিয়ে এই ভাষা মাঠে এসেছে। ভাষায় বিদেশি বা বাইরের বা নতুন নতুন শব্দ তো প্রবেশ করেই।’’ এই শব্দগুলো ভাষায় প্রবেশ করলে সমস্যা কী প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘এই শব্দগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসেনি। এগুলো চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে বাংলার বদলে। নতুন ভাবের জন্য ভাষায় নতুন শব্দ আসে, তাতে সমস্যার কিছু নেই। কিন্তু এগুলো চাপানোও বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’’

 

ভাষার লড়াই শেষ হয় কিনা, প্রশ্নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৌরভ শিকদার বলেন, ‘‘আমাদের ভাষার লড়াই অব্যাহত আছে। বাংলা ভাষাকে নিয়ে আবেগ যত, ততটা সম্মান আমরা এই ভাষাকে করি না। ভাষা প্রবহমান, এক জায়গায় স্থির থাকে না। চর্যাপদের বাংলা আর এখনকার বাংলার মধ্যে বিস্তর ফারাক। আকাশ সংস্কৃতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মধ্যে যে নতুন প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে, তাদের মাধ্যমে ভাষায় নতুন কিছু বিষয় প্রবেশ করবেই। এটা আটকানো যাবে না। এমন শব্দ ভাষায় প্রবেশ করানো উচিত না, যে শব্দগুলো বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা কোনও লক্ষ্য অর্জনের জন্য কাজ করে।

 সাম্প্রতিক সময় রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আমাদের ভাষার ওপর চাপ পড়েছে। কোনও বিশেষ মতাদর্শের মানুষ যখন কাজ করে, তখন সেই প্রভাব ভাষায় পড়ে। আওয়ামী লীগ আমলে সেই আদর্শের মানুষের মধ্য দিয়ে ভাষায় যে ভাব প্রবেশ করে, আরেক আমলে ভিন্ন আদর্শের ভাব প্রবেশ করবে, এটা স্বাভাবিক। তবে ভাষিক বলয়ে এই চাপ নিয়ে শঙ্কার কারণ নেই। কারণ এ ধরনের চাপের প্রভাব খুব বেশি পড়ে না। তবে এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে সতর্ক থাকার দরকার আছে। কারণ মানুষ এই মাধ্যমকে অনুসরণ করে এবং তার নিজের জীবনাচরণে পরিবর্তন ঘটায়।

সর্বাধিক পঠিত