স্টাফ রিপোর্টার : শুরু হয়েছে মহিমান্বিত মাহে রমজান। হাদিসের ভাষ্য অনুসারে রমজানের প্রথম দশক রহমতের। তাই রমজানে আল্লাহর রহমত লাভের চেষ্টা করা এবং অন্তরে তা অর্জন করার আশা রাখা ঈমানের দাবি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বলে দাও, হে আমার বান্দারা! তোমরা যারা নিজেদের ওপর অবিচার করেছ আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হয়ো না...।
(সুরা : ঝুমার, আয়াত : ৫৩)
আল্লাহর রহমতের আশা ও শাস্তির ভয় যখন সমান্তরাল হয়, তখন মুমিনের জীবনে ভারসাম্য আসে। তবে আলেমরা বলেন, মুমিন সব সময় আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ লাভের প্রবল আকাঙ্ক্ষা পোষণ করবে। কেননা আল্লাহর রহমত তাঁর ক্রোধের চেয়ে প্রবল। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমার দয়া—তা সব বস্তুতে ব্যাপ্ত।
সুতরাং আমি তা তাদের জন্য নির্ধারিত করব, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, জাকাত দেয় এবং আমার নিদর্শনে বিশ্বাস করে।’(সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৫৬)
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ যখন সৃষ্টির কাজ শেষ করলেন, তখন তিনি তাঁর কিতাব লাওহে মাহফুজে লেখেন—যা আরশের ওপর তাঁর কাছে আছে। নিশ্চয়ই আমার রহমত আমার ক্রোধের ওপর প্রবল।’
(সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩১৯৪)
মুমিন শুধু আল্লাহর কাছে পরকালীন জীবন নয়, বরং পার্থিব জীবনেও সে আল্লাহর রহমত কামনা করে।
কেননা উভয় জগতের কল্যাণ আল্লাহর হাতে। আল্লাহ বলেন, ‘সেসব জনপদবাসী যদি ঈমান আনত এবং আল্লাহকে ভয় করত তাহলে আমি অবশ্যই তাদের জন্য আকাশ ও জমিনের সমূহ বরকত উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা অস্বীকার করেছে, তাই তাদের কৃতকর্মের কারণে আমি তাদের পাকড়াও করেছি।’
(সুরা : আরাফ, আয়াত : ৯৬-৯৯)
তবে আল্লাহর রহমতের আশা ও শাস্তির ভয়ের ভেতর ভারসাম্য রক্ষা করা আবশ্যক। নতুবা মুমিনের জীবনে আমলের ভারসাম্য নষ্ট হবে।
এ ছাড়া আল্লাহর দয়া ও কঠোরতা দুটিই বাস্তব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মুমিন যদি আল্লাহর শাস্তি সম্পর্কে জানত, তবে সে জান্নাতের আশা করত না আর অবিশ্বাসী যদি আল্লাহর রহমত সম্পর্কে জানত, তবে সে-ও জান্নাত থেকে নিরাশ হতো না।’
(সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৭৫৫)
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলতেন, ‘সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহ হচ্ছে আল্লাহ তাআলার সঙ্গে শিরক করা, আল্লাহর পাকড়াও থেকে নিশ্চিন্ত হয়ে যাওয়া আর আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে যাওয়া।’
(মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস : ১৯৭০১)
আলোচ্য হাদিসে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়াকে যেমন গুনাহ বলা হয়েছে, তেমনি এর একটি সীমাও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। তা হলো মুমিন আল্লাহর রহমত ও দয়ার ব্যাপারে এতটা আশা করবে না, যা তার ভেতর থেকে আল্লাহর শাস্তির ভয় দূর করে দেয়। আল্লামা আশরাফ আলী থানভি (রহ.) এমন অযাচিত আশাকে আত্মপ্রবঞ্চনা বলেছেন। তিনি বলেন, আল্লাহর প্রতি মুমিনের আশা দুই প্রকার : ক. আল্লাহর রহমত লাভের আশা, খ. আত্মপ্রবঞ্চনা। মানুষ যদি তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে, যথাযথ চেষ্টা করে এবং আমল করে, তবে মানুষ রহমতের আশা করতে পারে। আমল না করে শুধু আশার ওপর নির্ভর করা গুরুতর আত্মপ্রবঞ্চনা। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মানুষ! নিশ্চয়ই আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য; সুতরাং পার্থিব জীবন যেন তোমাদের কিছুতেই প্রতারিত না করে এবং সেই প্রবঞ্চক যেন কিছুতেই আল্লাহ সম্পর্কে তোমাদের প্রবঞ্চিত না করে।’
(সুরা : ফাতির, আয়াত : ৫)
আল্লামা ইবনুল কাইয়িম জাওজি (রহ.) বলেছেন, যেসব হাদিসে আল্লাহর রহমতের আশা ও তাঁর প্রতি ভালো ধারণা পোষণের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে তা মূলত আমল ও ইবাদতেরই তাগিদস্বরূপ। কেননা আমল ও ইবাদতের মাধ্যমেই আল্লাহর রহমতের আশা ত্বরান্বিত হয়।
রমজানে মানুষ আল্লাহর রহমতের আশায় নেক আমল করে। নেক আমলের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। যদিও রমজান আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহের মাস। তবু আল্লাহর রহমত রমজান মাসে সীমাবদ্ধ নয়, তাই রমজানে শুরু হওয়া নেক আমলগুলো ধরে রাখা আবশ্যক। কোনো ইবাদত শুরু করার পর তা ত্যাগ করা হতাশার প্রমাণ। এতে বোঝা যায় বান্দা আল্লাহর রহমতের আশা ত্যাগ করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন করতে নিষেধ করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.)-কে উদ্দেশ করে মহানবী (সা.) বলেন, ‘হে আবদুল্লাহ! তুমি অমুক ব্যক্তির মতো হয়ো না, সে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করত, অতঃপর তা ছেড়ে দিয়েছে।’
(সহিহ বুখারি, হাদিস : ১১৫২)
আমল শুরু করার পর যে ব্যক্তি তা ধরে রাখার চেষ্টা করে, কিন্তু অপারগতার জন্য তা পারে না, আল্লাহ তাকে পূর্ণ প্রতিদান দেবেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর বান্দা যখন অসুস্থ হয় বা সফর করে, তখন সুস্থ ও নিজ অবস্থানে থাকাকালীন যে পরিমাণ আমল করত, সে পরিমাণ আমলের সওয়াব তার আমলনামায় লেখা হয়।’
(সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৯৯৬)
আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ লাভের ক্ষেত্রে একটি মূলনীতি হলো তাড়াহুড়া না করা এবং আল্লাহর নির্ধারিত সময়ের জন্য অপেক্ষা করা। নিম্নোক্ত হাদিস থেকে সেই শিক্ষাই লাভ করা যায়। খাব্বাব ইবনে আরাত (রা.) বলেন, ‘একবার আমরা রাসুল (সা.)-এর কাছে অভিযোগ করতে গেলাম। তিনি তখন কাবার ছায়ায় একটা চাদর মুড়ি দিয়ে বসে আছেন। আমরা বললাম, আপনি কি আমাদের জন্য সাহায্যের আবেদন করবেন না? আমাদের জন্য দোয়া করবেন না? তিনি বলেন, তোমাদের পূর্ববর্তী সময়ে দাওয়াতের কাজ করা লোকদের ধরে নিয়ে যাওয়া হতো। জমিনে গর্ত করে তাঁদের সেখানে রাখা হতো। লম্বা করাত দিয়ে তাঁদের মাথা দ্বিখণ্ডিত করা হতো। লোহার চিরুনি দিয়ে তাঁদের হাড্ডি থেকে গোশত আলাদা করা হতো। এমন বিভীষিকাময় শাস্তি পর্যন্ত তাঁদের দ্বিন থেকে ফেরাতে পারত না। আল্লাহর কসম! এ দ্বিন একদিন পূর্ণতা পাবেই। এমনকি একজন মুসাফির সানা শহর থেকে হাজরামাউত শহর পর্যন্ত নির্ভয়ে সফর করবে। কাউকে ভয় পাবে না। শুধু তার ছাগলপালের ওপর বাঘের ভয় করবে। অথচ তোমরা অস্থির হচ্ছ! তড়িঘড়ি করছ!’
(সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৬১২)
আল্লাহ সবাইকে রমজান মাসে আল্লাহর রহমত লাভের তাওফিক দিন। আমিন।
