শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
MENU
#
রংপুরে জাতীয় পার্টির ভরাডুবি
daily-fulki

রংপুরে জাতীয় পার্টির ভরাডুবি


রংপুর সংবাদদাতা : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনের একটিতেও জিততে পারেননি জাতীয় পার্টির (জাপা) মনোনীত প্রার্থী। দীর্ঘদিন ধরে রংপুরকে নিজেদের রাজনৈতিক ‘দুর্গ’ হিসেবে দাবি করা দলটি এবার চরম ভরাডুবির মুখে পড়েছে। এক সময় দলের প্রয়াত চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের হাত ধরে এই অঞ্চলে যে শক্ত ভিত গড়ে উঠেছিল, তা এবারের নির্বাচনে কার্যত তছনছ হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও দলটির প্রার্থীরা হারিয়েছেন জামানতও।


নির্বাচনের ফলাফলের পর বৃহস্পতিবার রাতেই লাঙ্গল সামনে রেখে ‘জাতীয় পার্টির জানাজা’ করে ব্যঙ্গাত্মক একটি ছবি কেউ শেয়ার করে সোশ্যাল মিডিয়ায়। মুহূর্তেই ছবিটি ভাইরাল হয়ে যায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষক, স্থানীয় নেতাকর্মী ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত তৃণমূলে নেতৃত্ব সংকট, বিভক্তি, ভোটারদের সঙ্গে দলীয় নেতাদের মৌসুমি সাক্ষাৎ, আস্থাহীনতা এবং জাতীয় রাজনীতির মেরুকরণ, রাজনীতিতে বিএনপি-জামায়াতের বাইরে তৃতীয় শক্তি হিসেবে টিকে থাকতে না পারা ও দীর্ঘ সময় আওয়ামী ঘনিষ্ঠতাই এমন পরাজয় ডেকে এনেছে দলটিতে।

বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচন শুধু একটি পরাজয় নয়, বরং এই অঞ্চলে জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক অস্তিত্বের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এ কারণে পুনরায় ঘুরে দাঁড়াতে হলে জাপাকে তৃণমূল সংগঠন পুনর্গঠন, তরুণ নেতৃত্ব তৈরি এবং স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করতে হবে। অন্যথায় ‘দুর্গ’ স্থায়ীভাবে হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ফলাফলে দেখা গেছে, রংপুর-২ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী আনিছুল ইসলাম মন্ডল পেয়েছেন পেয়েছেন মাত্র ৩৩ হাজার ৯৩০ ভোট। অথচ জামায়াতের প্রার্থী এটিএম আজহারুল ইসলাম ১ লাখ ৩৫ হাজার ৫৫৬ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন।


এই আসনে বিএনপির মোহাম্মদ আলী সরকার পেয়েছেন ৮০ হাজার ৫৩৮ ভোট।
রংপুর-৩ আসনে দলটির চেয়ারম্যান জিএম কাদের লাঙ্গল প্রতীকে পেয়েছেন ৪৩ হাজার ৭৯০ ভোট। জামায়াতের প্রার্থী মাহবুবুর রহমান বেলাল দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। বিএনপির প্রার্থী সামসুজ্জামান সামু পেয়েছেন ৮৫ হাজার ৪৯৮ ভোট।

রংপুর-৪ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী আবু নাসের শাহ মো. মাহবুবার রহমান পেয়েছেন ৩৩ হাজার ৬৬৪ ভোট।


১১ দলীয় জোটের প্রার্থী এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন ১ লাখ ৪৯ হাজার ৯৬৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। বিএনপি প্রার্থী এমদাদুল হক ভরসা পেয়েছেন ১ লাখ ৪০ হাজার ৫৬৪ ভোট।
রংপুর-৫ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী এসএম ফখর উজ-জামান জাহাঙ্গীর পেয়েছেন ১৬ হাজার ৪৯০ ভোট। জামায়াতের প্রার্থী গোলাম রব্বানী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৪১১ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থী অধ্যাপক মো. গোলাম রব্বানী পেয়েছেন ১ লাখ ১৫ হাজার ১১৬ ভোট।

রংপুর-৬ আসনে, জাতীয় পার্টির নুর আলম মিয়া ভোট পেয়েছেন ১ হাজার ২৮৭ টি। এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা মো. নুরুল আমিন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১ লাখ ২০ হাজার ১২৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। বিএনপির সাইফুল ইসলাম পেয়েছেন ১ লাখ ১৭ হাজার ৭০৩ ভোট। অথচ এই আসনে শেখ হাসিনা লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী নুর মোহাম্মদ মন্ডলের কাছে হেরেছিলেন। একইভাবে, কুড়িগ্রামের চারটি আসন, গাইবান্ধায় পাঁচটি, লালমনিরহাটে তিনটি, নীলফামারীতে চারটি, পঞ্চগড়ে দুটি, ঠাকুরগাঁওয়ে তিনটি ও দিনাজপুরের ছয়টি আসনেও একই চিত্র।

তথ্য বলছে, ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে জাপা রংপুর অঞ্চল থেকে ১৭টি, ১৯৯৬’র নির্বাচনে ২১টি, ২০০১ সালের নির্বাচনে ১৪ আর ২০০৮ সালে রংপুর বিভাগ থেকে ১২টি আসন পায়। ২০১৮ নির্বাচনে রংপুর বিভাগে ৭, আর ২০২৪ সালের ডামি নির্বাচনে রংপুর বিভাগে মেলে ৩টি আসন। জোট-মহাজোটের খেলায় দিনে দিনে রাজনৈতিক জৌলুস হারালেও আসনগুলো দখলে নেয় আওয়ামী লীগ। কিন্তু আওয়ামী লীগের পতনের পর ‘দোসর’ কালিমা থাকায় লজ্জাজনকভাবে হেরেছে দলটি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থানীয় পর্যায়ে জাপার সাংগঠনিক কাঠামো আগের মতো সক্রিয় ছিল না । ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে কর্মী-সংকট, প্রচারণায় শিথিলতা এবং নির্বাচনী কৌশলে ঘাটতি ছিল স্পষ্ট। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের তুলনায় মাঠপর্যায়ে জাপার উপস্থিতি কম দেখা গেছে। এছাড়াও হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ-এর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা দলকে যে শক্ত ভিত্তি দিয়েছিল, তাঁর মৃত্যুর পর সেই আবেগভিত্তিক সমর্থন ধরে রাখতে পারেনি দলটি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর একমাত্র রংপুর ছাড়া এই অঞ্চলে জাতীয় পার্টির কোনো গ্রহণযোগ্য, ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্ব গড়ে ওঠেনি। তাঁর মৃত্যুও পর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে জিএম কাদের ও রওশনপন্থী বিভাজনে তৃণমূলে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। একই সঙ্গে তৃণমূল সংগঠন ভেঙে পড়া, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি নিষ্ক্রিয় হওয়ায়। নতুন প্রজন্মের ভোটারদের কাছে জাপার কোনো স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা নেই। সরকারে থেকেও বিরোধী-এই দ্বৈত ভূমিকা ভোটারদের বিভ্রান্ত করেছে। এই অবস্থায় বিএনপি ও জামায়াত সাংগঠনিকভাবে মাঠে ফেরায়, এই দুই দলের মাঝখানে জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক জায়গা সংকুচিত হয়ে গেছে।

এছাড়াও, জাতীয় পার্টির সাবেক ভোটব্যাংক কেউ আওয়ামী লীগে, কেউ বিএনপিতে, কেউ নতুন বা স্বতন্ত্র প্রার্থীর দিকে ঝুঁকছে। একাধিক নির্বাচনে অজনপ্রিয় ও বিতর্কিত প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার ফলে সংসদ নির্বাচনের বাইরে বিগত জেলা, উপজেলা, পৌর ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও জাতীয় পার্টি কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। মূলত এসব কারণে রাজনীতিক সংকটে পড়েছে দলটি।

রংপুর সিটি করপোরেশন এলাকার ভোটার রাশেদা বেগম বলেন, জাপা বহু বছর আমাদের এলাকার এমপি দিয়েছে। কিন্তু কর্মসংস্থান, শিল্পকারখানা এসব দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়নি। আওয়ামী লীগের সময় সরকারি দল, না বিরোধী দল তা কেউ বুঝতে পারতো না। কিন্তু এই এলাকার মানুষের জন্য কিছু করেনি। ভোটের সময় ভোট নেয়, তাই এবার মানুষ পরিবর্তন চেয়েছে মানুষ।

তরুণ ভোটার সোহেল রানা জানান, আমরা উন্নয়ন ও জাতীয় রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান দেখতে চাই। জাপা এখন আর বিকল্প শক্তি হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতে পারেনি।

এদিকে, রংপুর বিভাগে ৩৩টি আসনে সরাসরি ১৭টিতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী এবং ২টি আসনে জোট-সমর্থিত প্রার্থীরা জয়ী হওয়ায় এ অঞ্চলে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের বার্তা মিলছে। বিএনপির সঙ্গে লড়াইয়ে বড় ব্যবধানে জয় আর জাতীয় পার্টি আসনশুণ্য অবস্থান আগামীতে রংপুর অঞ্চলের রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফখরুল আনাম বেঞ্জুর মতে, এবারের নির্বাচনে মূল লড়াই বড় দুই ধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ফলে জাপা তৃতীয় শক্তি হিসেবে জায়গা হারিয়েছে। জাতীয় রাজনীতিতে মেরুকরণ তীব্র হয়েছে। রংপুরেও সেই প্রভাব পড়েছে। ভোটাররা কৌশলগত ভোট দিয়েছেন। এছাড়াও ভোটারদের কাছে টানতে পারার যে কৌশল সেটা ধরে রাখতে পারেনি। 
 

সর্বাধিক পঠিত