মাসুম বাদশাহ, মানিকগঞ্জ :
জাতীয় সংসদ নির্বাচন একেবারে দ্বারপ্রান্তে। প্রচারণা শেষ, নীরব এখন ভোটের মাঠ। তবে মানিকগঞ্জের গ্রাম-গঞ্জ, হাট-বাজার, চায়ের দোকান থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই ঘুরপাক খাচ্ছে এক প্রশ্ন: কোন আসনে কার পাল্লা ভারী?
একসময় মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার পর এবার সেই হারানো অবস্থান পুনর্দখলের প্রত্যয়ে মাঠে নেমেছেন দলটির নেতাকর্মীরা। তবে এবারের নির্বাচনী সমীকরণ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভিন্ন। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছে ইসলামি ঘরানার দল ও জোটগুলো। ফলে জেলার তিনটি সংসদীয় আসনে তৈরি হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক চিত্র—কোথাও ত্রিমুখী, কোথাও দ্বিমুখী, আবার কোথাও প্রায় একতরফা লড়াই।
# মানিকগঞ্জ-১: বিভাজনে চাপে বিএনপি, ত্রিমুখী লড়াইয়ে সক্রিয় জামায়াত
ঘিওর, দৌলতপুর ও শিবালয় উপজেলা নিয়ে গঠিত নদীবেষ্টিত মানিকগঞ্জ-১ আসন যোগাযোগগতভাবে চ্যালেঞ্জপূর্ণ। সাতজন প্রার্থী থাকলেও মূল লড়াই সীমাবদ্ধ তিন প্রার্থীর মধ্যে।
বিএনপির মনোনীত প্রার্থী এস এ জিন্নাহ কবীর দলীয় প্রতীক ও সাংগঠনিক শক্তিকে ভরসা করে মাঠে থাকলেও অভ্যন্তরীণ বিভাজন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী তোজাম্মেল হক তোজার অংশগ্রহণে দলীয় ভোট ভাগ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় প্রায় অর্ধশত নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করেছে জেলা বিএনপি—যা দলীয় টানাপোড়েনকে আরও স্পষ্ট করেছে।
এই সুযোগ কাজে লাগাতে তৎপর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আবু বকর সিদ্দিক। জেলার অন্য দুই আসনে জামায়াতের প্রার্থী না থাকায় কেন্দ্র ও জেলা নেতাকর্মীদের সমর্থনও এ আসনে বেশি কেন্দ্রীভূত। বিশ্লেষকদের মতে, এখানে ভোটার উপস্থিতি ও শেষ মুহূর্তের ভোট বিভাজনই ফল নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা রাখবে।
# মানিকগঞ্জ-২: ঐক্যবদ্ধ বিএনপি, তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থান
সিংগাইর, হরিরামপুর ও সদর উপজেলার দুটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত মানিকগঞ্জ-২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন চারজন প্রার্থী। স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিএনপির প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য মইনুল ইসলাম খান শান্ত তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন।
তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত-সমর্থিত ১১ দলীয় জোটের শরিক খেলাফত মজলিসের প্রার্থী শেখ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি এস এম আব্দুল মান্নান লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে মাঠে থাকলেও প্রচারণায় তার উপস্থিতি তুলনামূলক কম।
এ আসনে বিএনপির সাংগঠনিক ঐক্য ও প্রার্থীর পূর্ব পরিচিতি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত ভোটের দিন ভোটার উপস্থিতি ও গ্রামীণ ভোটব্যাংকের আচরণই নির্ধারণ করবে চূড়ান্ত ফল।
# মানিকগঞ্জ-৩: জনসমর্থনে এগিয়ে বিএনপি, প্রায় একতরফা লড়াই
সদর ও সাটুরিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত মানিকগঞ্জ-৩ আসনকে জেলার রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসন ধরা হয়। নয়জন প্রার্থী থাকলেও বাস্তবে প্রতিযোগিতা অনেকটাই একপেশে বলে মত স্থানীয়দের।
বিএনপির প্রার্থী আফরোজা খানম রিতা শুরু থেকেই ব্যাপক জনসমর্থন নিয়ে এগিয়ে আছেন। বড় সমাবেশ, তৃণমূলের সক্রিয়তা এবং শীর্ষ নেতাদের ঐক্যবদ্ধ প্রচারণা তার অবস্থানকে শক্ত করেছে।
১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাইদ নূর রিক্সা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিলেও স্থানীয়ভাবে তার পরিচিতি সীমিত। জামায়াতের সরাসরি প্রার্থী না থাকায় সমর্থনের প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এ আসনে নারী ভোটারের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। নারী ও তরুণ ভোটারদের লক্ষ্য করে উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচারণা চালিয়েছেন আফরোজা খানম রিতা। বিশ্লেষকদের মতে, বড় কোনো অঘটন না ঘটলে এখানে বিএনপির জয় প্রায় নিশ্চিত।
সব মিলিয়ে মানিকগঞ্জের তিনটি আসনে তিন রকম রাজনৈতিক বাস্তবতা স্পষ্ট। উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, আইনশৃঙ্খলা, নদীভাঙন, কৃষি ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন—এসব ইস্যুতে দেওয়া প্রতিশ্রুতির চূড়ান্ত মূল্যায়ন হবে ব্যালটের মাধ্যমে।
