মাসুম বাদশাহ, মানিকগঞ্জ : মানিকগঞ্জ-২ আসনের নির্বাচনী রাজনীতিতে এবার সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে আওয়ামী লীগের নীরব ভোটব্যাংক। মাঠে দলটির শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতি, দায়িত্বশীল অনেকের আত্মগোপন এবং প্রকাশ্যে প্রচারণাহীন অবস্থান নির্বাচনের ফলের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে কার ভোটের অংক কত, তা নির্ণয়ের প্রশ্নকে। এই নীরব ভোট কোন দিকে যাবে, নাকি আদৌ যাবে না—সেই হিসাবেই ঘুরছে পুরো নির্বাচনী সমীকরণ।
এই প্রেক্ষাপটে মানিকগঞ্জ-২ (সিংগাইর, হরিরামপুর ও মানিকগঞ্জ সদরের দুটি ইউনিয়ন) আসনে প্রচারণা এখন তুঙ্গে। পাড়ামহল্লা, হাট-বাজার ও চায়ের দোকানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ধানের শীষ, জোটের দেয়াল ঘড়ি, জাতীয় পার্টির লাঙ্গল ও ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখার শক্তি দুর্বলতার হিসাব।
এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিএনপির মনোনীত প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মঈনুল ইসলাম খান শান্ত ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে পূর্ণ শক্তির সংগঠিত প্রচারণা চালিয়ে তুলনামূলক এগিয়ে রয়েছেন। উঠান বৈঠক, পথসভা ও সরাসরি ভোটার সংযোগে তার উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। স্থানীয় নেতাকর্মীদের মতে, পরিচিতি, অভিজ্ঞতা ও দলীয় সংগঠনের সক্রিয়তা তাকে অন্য প্রার্থীদের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রেখেছে।
অন্যদিকে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও মানিকগঞ্জ ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসার প্রধান মুহাদ্দিস শেখ সালাহ উদ্দিন দেয়াল ঘড়ি প্রতীক নিয়ে নিয়মিত প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। জামায়াতে ইসলামীর সরাসরি প্রার্থী না থাকায় শুরু থেকেই জোটের ভোটের সমীকরণ ছিল পরিবর্তনশীল। মনোনয়ন না পাওয়ায় ছাত্রশিবির কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুর রহমানের সমর্থকদের মধ্যে হতাশা থাকলেও জোটের সিদ্ধান্ত মেনে মাঠে সক্রিয় রয়েছে জামায়াত নেতৃত্ব।
জাতীয় পার্টির প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য প্রকৌশলী এস এম আব্দুল মান্নান লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে প্রচারণা চালালেও মাঠপর্যায়ে তার উপস্থিতি তুলনামূলক দুর্বল বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনীতিকরা। পরিচিত মুখ হলেও সংগঠিত গণসংযোগ ও দৃশ্যমান কার্যক্রমের ঘাটতি তাকে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে কিছুটা পিছিয়ে রেখেছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মোহাম্মদ আলী হাতপাখা প্রতীক নিয়ে নিয়মিত মাঠে থাকলেও সামগ্রিক ভোটের হিসাবে তাকে এখনো নির্ণায়ক শক্তি হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা। ইসলামী ভোটব্যাংক বিভক্ত থাকায় এই ভোট কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা।
এদিকে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দীর্ঘদিনের কোন্দল অনেকটাই নিরসন হওয়ায় ধানের শীষের প্রচারণা নতুন গতি পেয়েছে। বর্তমানে দলটির একাধিক ধারা মাঠে সক্রিয় থাকলেও কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনী কার্যক্রম চালাচ্ছেন বলে নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আওয়ামী লীগের অবস্থান। দলটির দায়িত্বশীল নেতারা প্রকাশ্যে নেই, নেতাকর্মীরা নিরব, আর সমর্থকদের বড় একটি অংশ ভোট নিয়ে কৌশলী অবস্থানে রয়েছে। তৃণমূলের কিছু সমর্থক মামলা ও হয়রানি এড়াতে বিএনপিতে যোগ দিচ্ছেন—এমন আলোচনা থাকলেও অনেকেই এটিকে সাময়িক রাজনৈতিক কৌশল বলে মনে করছেন। নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রায় সব প্রার্থীর পক্ষ থেকেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে ভোট পাওয়ার চেষ্টা চলছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মানিকগঞ্জ-২ আসনে এবার নির্বাচন ফলের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে প্রতিটি দলের প্রকৃত ভোটের অংক নির্ধারণ। অতীতে ইসলামী ঘরানার দলগুলোর ভোট বিএনপির ঝুলিতে গেলেও এবার তারা আলাদা অবস্থানে থাকায় ভোটের প্রকৃত শক্তি পরিষ্কারভাবে বোঝা যাবে। নীরব আওয়ামী ভোট কোথায় দাঁড়ায়, সেটিই শেষ পর্যন্ত এই আসনের রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা দেবে।
