বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
MENU
#
হাদিসের কথা, জিন জাতি: প্রকারভেদ, রূপ ও নামকরণ
daily-fulki

হাদিসের কথা, জিন জাতি: প্রকারভেদ, রূপ ও নামকরণ


আল্লাহ তাআলা মানুষকে যেমন দৃশ্যমান জগতে বসবাসের জন্য সৃষ্টি করেছেন, তেমনি অদৃশ্য জগতের জন্য সৃষ্টি করেছেন জিন জাতিকে। জিন সম্পর্কে অজ্ঞতা, কল্পকাহিনি ও অতিরঞ্জন সমাজে বহুল প্রচলিত। অথচ ইসলাম জিন সম্পর্কে সুস্পষ্ট, ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবভিত্তিক ধারণা প্রদান করেছে। কোরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে জিন জাতির সৃষ্টি, প্রকারভেদ, রূপ ও কাজ সম্পর্কে জানলে ভীতি ও কুসংস্কার দূর হয় এবং ঈমান আরো সুদৃঢ় হয়।


নিম্নে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হাদীসসমূহের আলোকে জিন জাতি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত অথচ প্রামাণ্য আলোচনা উপস্থাপন করা হলো।

জিনের তিন প্রকার

মহানবী বলেছেন—

الحن ثلاثةُ أَصْنافِ فَصِنف لَهُمْ أَجْنِحَةً يَطِيرُونَ بِها في الهَوَاءِ وَصِنْفٌ حَيَّاتٌ وَكِلابٌ وَصِنْفٌ يَحِلُّونَ وَيَظْعَنُونَ

অর্থ: জিন তিন শ্রেণির। এক শ্রেণির ডানা আছে, তারা তার সাহায্যে বাতাসে উড়ে বেড়ায়, এক শ্রেণি সাপ-কুকুর আকারে বসবাস করে, আর এক শ্রেণি স্থায়ীভাবে বসবাস করে ও ভ্রমণ করে। (ত্বাবারানীর কাবীর, হাদিস ১৮০২০; হাকেম, হাদিস ৩৭০২; বাইহাক্বীর আসমা অস-সিফাত, সহীহুল জামে‘ ৩১১৪)

আবু সা‘লাবাহ আল-খুশানী (রা.) হতে বর্ণিত।


তিনি মারফু‘ সূত্রে (রাসূলুল্লাহ (সা.) হতে) বর্ণনা করেন— জিন জাতি তিন প্রকার। এক প্রকার জিনের ডানা আছে, তারা শূন্যে উড়ে বেড়ায়। দ্বিতীয় প্রকারের জিন সাপ ও কুকুরের আকৃতি ধারণ করে ও বসবাস করে। আর তৃতীয় প্রকারের জিন কোনো নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করে এবং সেখান থেকে অন্যত্র চলেও যায়।

(সহিহ শারহুস সুন্নাহ, হাদিস: ৩২৬৪; সহিহইবনু হিব্বান, হাদিস : ৬১৬৫; সহীহুল জামে‘ হাদিস : ৩১১৪; আল-মু‘জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী, হাদিস ১৮০২০; হাদিস সম্ভার, হাদিস: ৮৯)
জিনের রূপ ধারণ করার ক্ষমতা

জিন বিভিন্ন প্রাণীর রূপ ধারণ করতে পারে। তবে তাদের একটি গ্রুপ সর্বদা সাপ ও কুকুরের বেশ ধারণ করে মানব সমাজে চলাফেরা করে। এটি তাদের স্থায়ী রূপ।

জিনের লিঙ্গভেদ

জিন জাতি মানুষের মতো পুরুষ ও স্ত্রী জাতিতে বিভক্ত। একটি হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে— ‘যে এই আয়াত (আয়াতুল কুরসী) পড়বে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য একজন প্রহরী নিযুক্ত করে দেবেন এবং কোনো পুরুষ ও নারী জিন-শয়তান তার কাছে আসতে পারবে না।


” (সহিহ বুখারী, হাদিস: ৫০১০)
নাম ও কাজ অনুযায়ী জিন

ইবলিস: এই জিন আদম (আ.)-কে সিজদা করতে অস্বীকার করেছিল। কোরআনে তার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। সে মানুষকে পথভ্রষ্ট করে।

খানজাব: এই জিন সালাতে মানুষের মনে নানা চিন্তা ঢুকিয়ে নামাজে অমনোযোগী করে তোলে।

ওলহান: এরা একপ্রকার শয়তান জিন, যারা ওজুর সময় ওয়াসওয়াসা সৃষ্টি করে।

ক্বারীন : ক্বারীন অর্থ সংগী। প্রত্যেক মানুষের সাথেই এক শয়তান জিন লেগে থাকে, যে খারাপ কাজে প্ররোচিত করে।

আরবদের ভাষায় জিনদের নাম ও প্রকারভেদ

ইবনে আব্দিল বার (রহঃ) বলেন—

১. সাধারণ জিন: জিন্নী
২. মানুষের সাথে বসবাসকারী: আমের (বহুবচন: উম্মার)
৩. শিশুদের উত্যক্তকারী: আরওয়াহ
4. খবীস আকারে উত্যক্তকারী: শয়তান
৫. অধিক ক্ষতিকর: মারেদ
৬. অত্যন্ত দুর্ধর্ষ: ইফরীত (বহুবচন: আফারীত)

বিভিন্ন ভাষায় জিনের নাম

দৈত্য, দানব, অসুর, রাক্ষস, দেও-পরী, ভুত-প্রেত, প্রেতিনী, প্রেতাত্মা, পিশাচ—এসব মূলত জিন জাতিরই বিভিন্ন ভাষাগত বা গুণগত নাম। (ত্বাবারানীর কাবীর, মাশা. হা/৫৭৩; হাকেম, মাশা. হা/৩৭০২; বাইহাক্বীর আসমা অস-সিফাত; সহীহুল জামে‘ লিল আলবানী, মাশা. হা/৩১১৪)

জিনদের সাথে মানুষের আচরণ ও সহাবস্থানের শিক্ষা

ইসলাম মানুষ ও জিনের সম্পর্ককে ভয়ের নয়, বরং সীমা ও সচেতনতার সম্পর্ক হিসেবে নির্ধারণ করেছে। জিন মানুষকে ক্ষতি করতে পারে—এ কথা যেমন সত্য, তেমনি আল্লাহর হেফাজতে থাকলে তারা কোনো ক্ষতি করতে পারে না—এটিও সত্য।

জিনদের বিষয়ে ইসলামের শিক্ষা হলো; জিনকে অযথা ভয় করা যাবে না।  জিনকে ডাকা, তাবিজ-কবচ, যোগাযোগ বা সাহায্য চাওয়া হারাম। আল্লাহর যিকির, কোরআন তিলাওয়াত ও আয়াতুল কুরসী পাঠের মাধ্যমে আত্মরক্ষা করা।

কুসংস্কার, কল্পকাহিনি ও বাড়াবাড়ি থেকে বিরত থাকা

মানুষ ও জিন উভয়ই আল্লাহর সৃষ্টি এবং উভয়কেই আল্লাহর ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। তাই একজন মুমিনের কর্তব্য হলো; আকীদাহ ঠিক রাখা, সুন্নাহ অনুযায়ী চলা এবং অদৃশ্য জগত সম্পর্কে কোরআন ও সহীহ হাদীসের সীমার বাইরে না যাওয়া।

প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক

saifpas352@gmail.com

সর্বাধিক পঠিত