সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬
MENU
#
স্বর্ণের দামে মেগা উল্লম্ফন: অর্থনীতিতে কী সংকেত দিচ্ছে
daily-fulki

স্বর্ণের দামে মেগা উল্লম্ফন: অর্থনীতিতে কী সংকেত দিচ্ছে

স্বর্ণের দামে মেগা উল্লম্ফন: অর্থনীতিতে কী সংকেত দিচ্ছে

স্টাফ রিপোর্টার : দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম এখন গগনচুম্বী। ভালো মানের (২২ ক্যারেট) স্বর্ণের ভরি আড়াই লাখ টাকা ছাড়িয়ে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। এই নজিরবিহীন মূল্যবৃদ্ধি কেবল বিয়ের মৌসুমে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে না, বরং এর আড়ালে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির এক অস্বস্তিকর চিত্রও ফুটে উঠছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, সোনার দামের এই লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি দেশের মুদ্রার ওপর আস্থার সংকট এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার এক জোরালো ‘আগাম সতর্ক সংকেত’।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, স্বর্ণের বাজারের এই অস্থিরতা দেশের অর্থনীতির গভীরে থাকা উদ্বেগ এবং প্রত্যাশারই সম্মিলিত প্রতিফলন। টাকার মান কমে যাওয়া, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের প্রতিকূল পরিবেশ এবং বৈশ্বিক অস্থিরতা— সব মিলিয়ে স্বর্ণ এখন সাধারণ মানুষের কাছে এক ‘নিরাপদ আশ্রয়’ হয়ে উঠেছে।


তাদের মতে, এই সংকেতকে উপেক্ষা করার কোনও সুযোগ নেই। কারণ, সোনার দাম অনেক সময় এমন গভীর অর্থনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়, যা কেবল প্রবৃদ্ধি বা পরিসংখ্যানের গতানুগতিক খাতায় পুরোপুরি ধরা পড়ে না।

রেকর্ডের পাতায় স্বর্ণের দাম 
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২৫ বছরে দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম ৩ হাজার ৬২৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০০ সালে প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ছিল মাত্র ৬ হাজার ৯০০ টাকা। আজকের বাজারে সেই স্বর্ণের দাম দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৯১ টাকা। সবচেয়ে বড় লাফ দেখা গেছে গত এক বছরে; ২০২৫ সালের শুরুতে যা ১ লাখ ৩৮ হাজার টাকা ছিল, তা এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ১ লাখ ১৯ হাজার টাকা বেড়েছে।

কেন এই ঊর্ধ্বগতি?
অর্থনীতিবিদদের মতে, স্বর্ণের দাম বাড়ার পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ কাজ করছে—

টাকার ওপর আস্থার চাপ: মানুষ যখন মনে করে নগদ টাকা বা ব্যাংকে রাখা জমার মান ভবিষ্যতে কমে যাবে, তখন তারা নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণে বিনিয়োগ করে। একে বিশ্লেষকরা ‘নীরব ভোট’ হিসেবে দেখছেন।

মূল্যস্ফীতির প্রতিরক্ষা: নিত্যপণ্যের আকাশছোঁয়া দামের বিপরীতে সোনা হয়ে উঠছে ভবিষ্যৎ মূল্যস্ফীতির বিপক্ষে এক ধরনের ‘ইকোনমিক শিল্ড’ বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

বিকল্প বিনিয়োগের অভাব: শেয়ারবাজারে অস্থিরতা ও আবাসন খাতে মন্দার কারণে সঞ্চয়ের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে মানুষ স্বর্ণকে বেছে নিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন 
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “মূল্যস্ফীতি বাড়লে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এই অনিশ্চয়তার সময়ে মানুষ স্বর্ণকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ মনে করে এবং স্বর্ণ কেনার দিকে ঝুঁকে পড়ে। এ ছাড়া সুদের হার কমে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারেও স্বর্ণের চাহিদা বাড়ে।”

তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশে স্বর্ণ ব্যবসার কাঠামো ও মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া পুরোপুরি স্বচ্ছভাবে বোঝা কঠিন। তবে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ না থাকলেও মানুষ স্বর্ণ কিনে রাখে।” তার ভাষায়, “কারও কাছে অতিরিক্ত অর্থ থাকলে সাধারণত সে দুটি খাতে বিনিয়োগ করে— জমি ও স্বর্ণ। কারণ দীর্ঘমেয়াদে জমির দাম যেমন খুব একটা কমে না, তেমনি স্বর্ণের দামও সাধারণত নিম্নমুখী হয় না।”

অন্যদিকে, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সিনিয়র সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, “স্বর্ণের দাম বাড়া দেশের অর্থনীতির জন্য অশুভ ইঙ্গিত বহন করছে। বিয়ে ও অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে স্বর্ণ অপরিহার্য। দাম বৃদ্ধির কারণে অনেক দরিদ্র পরিবার বিয়ে-শাদিতে অর্থনৈতিক চাপে পড়েছে।”

তিনি জানান, যেহেতু স্বর্ণ আমদানি বৈধ নয়, তাই কিছু অসাধু সিন্ডিকেটও দাম বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। সরকার স্বর্ণ আমদানির বিষয়টি সহজ ও স্বচ্ছ করলে রাজস্ব যেমন বাড়তো, তেমনি সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কমতো।

সংকটে স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা
আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে দাম বাড়ানো হলেও দেশীয় ব্যবসায়ীরা আছেন চরম বিপাকে। জুয়েলার্স সমিতির কোষাধ্যক্ষ অমিত ঘোষ জানান, গত এক বছরে স্বর্ণের বেচাবিক্রি অন্তত ৩০ শতাংশ কমে গেছে। উচ্চ মূল্যের কারণে সাধারণ ক্রেতারা এখন নতুন গহনা কেনা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছেন। মানুষ এখন পুরনো স্বর্ণ দিয়ে কোনওমতে কাজ চালাচ্ছে। এর ফলে স্বর্ণ শিল্পের কারিগর ও ব্যবসায়ীরা দীর্ঘমেয়াদী মন্দার কবলে পড়ছেন।

অমিত ঘোষের মতে, বিদেশের অনেক দেশে স্বর্ণকে বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে দেখা হলেও বাংলাদেশে বিষয়টি তেমনভাবে কার্যকর নয়। বরং স্বর্ণের দাম যত বাড়ছে, দেশীয় স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা ততই সংকটে পড়ছেন। কারণ, উচ্চ দামের কারণে ক্রেতা কমে যাওয়ায় তাদের বেচাবিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাচ্ছে।

স্বর্ণের দামের বিবর্তন

বাংলাদেশের স্বর্ণবাজারে গত দুই দশকে যে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে, তা এক কথায় অভূতপূর্ব। একসময় যে স্বর্ণ ছিল মধ্যবিত্তের নাগালে, আজ তা পরিণত হয়েছে বিলাসী ও বিনিয়োগযোগ্য সম্পদে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০০০ সাল থেকে ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত স্বর্ণের দামে যে উল্লম্ফন ঘটেছে, তা দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন।

২০০০ সাল: প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ছিল মাত্র ছয় হাজার নয়শ টাকা।

২০১০ সাল: এক দশকের ব্যবধানে দাম বেড়ে দাঁড়ায় বিয়াল্লিশ হাজার একশত পঁয়ষট্টি টাকা।

২০২০ সাল: ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়লে স্বর্ণ নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে নতুন করে গুরুত্ব পায়। এর প্রভাব পড়ে দেশীয় বাজারেও স্বর্ণের দাম আরও বৃদ্ধি পেয়ে হয় সত্তর হাজার টাকা।

২০২৩ সাল: দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্বর্ণের দাম এক লাখের ঘর অতিক্রম করে এবং প্রতি ভরির মূল্য হয় এক লক্ষ টাকা।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে: দামের ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকায় প্রতি ভরির দাম দাঁড়ায় এক লক্ষ আটত্রিশ হাজার দুইশত আটাশি টাকা।

২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি: বর্তমানে স্বর্ণের দাম সব রেকর্ড ভেঙে পৌঁছেছে দুই লক্ষ ৫৭ হাজার একশত একানব্বই টাকায়।

বিশ্লেষকদের মতে, স্বর্ণের বাজার এখন যে সংকেত দিচ্ছে তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এটি মূলত মুদ্রাবাজার ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং স্থানীয় বাজার ব্যবস্থাপনার প্রতিফলন, যা আগামীর কঠিন সময়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। 

সর্বাধিক পঠিত