শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬
MENU
#
সিংগাইরে গণপিটুনিতে দুই চোরের মৃত্যু, দুই দিনেও মামলা হয়নি
daily-fulki

সিংগাইরে গণপিটুনিতে দুই চোরের মৃত্যু, দুই দিনেও মামলা হয়নি


সিংগাইর (মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি : মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায় গরু চুরির অভিযোগে গণপিটুনিতে দুই ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনায় দুই দিন পার হলেও এখনো কোনো হত্যা মামলা দায়ের না হওয়ায় এলাকায় তীব্র প্রশ্ন ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। প্রকাশ্যে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডের পরও আইনি প্রক্রিয়া শুরু না হওয়ায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা নিয়েও জনমনে আলোচনা ও সমালোচনা বাড়ছে।


এমন প্রেক্ষাপটে ঘটনার পরদিন মানিকগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারওয়ার আলম ঘটনাস্থল সরেজমিনে পরিদর্শন করেন।
রবিবার (১৮ জানুয়ারি) দিবাগত রাত আনুমানিক ২টারদিকে সিংগাইর থানাধীন জয়মন্টপ ইউনিয়নের ইমামনগর গ্রামের একটি সরকারি কাঁচা রাস্তার ওপর স্থানীয় জনতার গণপিটুনিতে নিহত হন দুই ব্যক্তি। নিহতরা হলেন—দশানী গ্রামের তোতা মিয়ার ছেলে মজনু (২৭) এবং ছয়আনি গ্রামের বান্ধু মিয়ার ছেলে দীন ইসলাম (২২)।
ঘটনার পরদিন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারওয়ার আলম ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য মনোযোগ সহকারে শোনেন এবং তদন্ত সাপেক্ষে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন। 


এ সময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) মহরম আলী, সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সিংগাইর সার্কেল) ফাহিম আসজাদ, সিংগাইর থানার অফিসার ইনচার্জ মো. মাজহারুল ইসলামসহ বিভিন্ন পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তারা। তবে জেলা পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তার সরেজমিন উপস্থিতির পরও ঘটনার দুই দিন পেরিয়ে গেলেও কোনো হত্যা মামলা না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে।


স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রবিবার গভীর রাতে ইমামনগর গ্রামের ইউনুস মিয়ার বাড়িতে পাঁচ সদস্যের একটি চোরচক্র গরু চুরির উদ্দেশ্যে তালা ভাঙার চেষ্টা করে। বাড়ির লোকজন বিষয়টি টের পেয়ে চিৎকার করলে আশপাশের লোকজন ছুটে আসে। পরে এলাকাবাসী সংঘবদ্ধ হয়ে চোরচক্রের দুই সদস্যকে আটক করে গণপিটুনি দেয়। এতে তারা গুরুতর আহত হন এবং পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। অপর তিন সদস্য—জয়নাল, শামীম ও রানা—ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।


পরে পুলিশ চোরচক্রের সদস্য জয়নালকে আটক করে। সে স্থানীয় আয়নালের ছেলে। পুলিশ জানায়, তাকে সিংগাইর থানায় সম্প্রতি রেকর্ড হওয়া একটি ট্রান্সফরমার চুরির মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তবে গণপিটুনিতে দুইজন নিহত হলেও ওই ঘটনায় আলাদা কোনো হত্যা মামলা দায়ের করা হয়নি।


বুধবার (২১ জানুয়ারি) সরেজমিনে নিহতদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মঙ্গলবার রাত সাড়ে আটটারদিকে দীন ইসলামের জানাজা শেষে ছয়আনি কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন করা হয়। অপরদিকে রাত আটটার দিকে মজনুকে দশানী কবরস্থানে দাফন করা হয়। দুই পরিবারেই চলছে শোকের মাতম।


নিহত দীন ইসলামের মা জরিনা বেগম জানান, তার ছেলেকে স্থানীয় একটি চক্র জোরপূর্বক ইয়াবা বিক্রিতে বাধ্য করত। তিনি বলেন, তার ছেলের বিরুদ্ধে থানায় তিনটি মামলা রয়েছে। তা সত্ত্বেও তিনি তার ছেলের হত্যার বিচার দাবি করেন। নিহতের বাবা বান্ধু মুন্সি জানান, পুলিশের পরামর্শ অনুযায়ী তারা মামলা করবেন, তবে কারা বা কীভাবে তার ছেলেকে হত্যা করেছে সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত নন।


অন্যদিকে দশানী গ্রামে নিহত মজনুর বাড়িতে গিয়ে জানা যায়, তার বাবা-মা কেউই জীবিত নেই। মা ও বাবা দুজনই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে প্রায় দুই বছর আগে ছয় মাসের ব্যবধানে মারা যান। ভাই-বোন না থাকায় পরিবার বলতে কেবল স্ত্রী ও সন্তান। মজনুর স্ত্রী আসমা আক্তার বর্তমানে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তার চাচা সাদেক আলী জানান, মজনুর বিরুদ্ধে একাধিক মাদক মামলা থাকলেও সেগুলো থেকে সে খালাস পেয়েছে। আদালতে একটি মারামারির মামলা চলমান থাকলেও তার বিরুদ্ধে বর্তমানে কোনো সাজা কার্যকর নেই। তিনি আরও জানান, পুলিশ মজনুর স্ত্রীকে থানায় ডেকেছে বলে তিনি শুনেছেন।


এ বিষয়ে সিংগাইর থানার অফিসার ইনচার্জ মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, “মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। আজই মামলা হবে।”
 

সর্বাধিক পঠিত